
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই বড় দুর্ঘটনার পরও দৃশ্যপটে কোনো পরিবর্তন আসেনি; রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জারি করা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নির্দেশনার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় শত শত সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এখনও বহাল রয়েছে।
রাজউকের নথি, বিভিন্ন সভার কার্যবরণী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং নগর পরিকল্পনাবিদ, বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এক বছরেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর এক বছরে একাধিক আন্তঃসংস্থার বৈঠক, সুপারিশ ও আলোচনা হলেও বিমানবন্দরসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম রিজু জানান, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চিহ্নিত ৬৩০টি সমস্যাযুক্ত ভবনের তালিকা রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়া ও উচ্ছেদ কার্যক্রম এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
রাজউক-বেবিচকের মতবিরোধ ও প্রশাসনিক বাধা
বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু জটিলতা কাজ করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ:
মতপার্থক্যে বিলম্ব: ভবনের উচ্চতা-সংক্রান্ত তথ্য ও কারিগরি বিষয়ে রাজউক এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে কার্যক্রম পেছাচ্ছে। যৌথ জরিপের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিনিধি না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ে ভবনের উচ্চতা পরিমাপের কাজও শুরু করা যায়নি।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ: রাজউক চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন যে, কিছু উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্যেষ্ঠ এক প্রতিমন্ত্রী এবং একটি বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর অংশগ্রহণে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
যে সাতটি নির্দেশনা আজও বাস্তবায়িত হয়নি
২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুর্ঘটনার পর জরুরি ভিত্তিতে সাতটি নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
বিমান বিধ্বস্ত হওয়া ভবন অপসারণ: আংশিক অপসারণ ও কিছু জরুরি অবকাঠামো যুক্ত করা হলেও বহু ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এখনো বহাল।
মেট্রোরেলের নিরাপত্তা বাফার জোন: মেট্রোরেল ডিপোর চারপাশে নির্ধারিত ৩০০ ফুট নিরাপত্তা বাফার জোনের ভেতরের (ইউ-আকৃতির টিনশেড ও তিন তলা ইংলিশ ভার্সন একাডেমি ভবন) স্থাপনা অপসারণের পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি।
অনুমোদিত ভূমি শ্রেণি ও হোস্টেল কার্যক্রম: অনুমোদিত ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং অননুমোদিত হোস্টেল কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বিএনবিসি-২০২০ অনুসরণ: অগ্নি ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে।
উচ্চতা সীমা অতিক্রমকারী ভবন শনাক্তকরণ: উত্তরার ৫, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টরে বেবিচকের উচ্চতা সীমা অতিক্রমকারী ভবনগুলো শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ ধীরগতির।
এয়ার ফানেল জোন নীতিমালা: বিমান ওঠানামার করিডোরে উচ্চঘনত্বের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে এয়ার ফানেল জোন নীতিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
যৌথ উচ্চতা জরিপ: রাজউক ও বেবিচকের যৌথ উচ্চতা জরিপের কাজ এখনও শুরুই করা যায়নি।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও ক্ষোভ
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। সাত-আটটি বৈঠক হলেও কোনো কার্যকর অপারেশনাল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ—গত এক বছরে একের পর এক কমিটি ও বৈঠক হলেও বাস্তবে হয়েছে কেবল কাগুজে অগ্রগতি। ঝুঁকিগুলো প্রায় আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী বিমানবন্দরের এয়ার ফানেল জোন কঠোরভাবে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তায় অবহেলা করলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক এস কে মেহেদী হাসান বলেন, বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশ আসে, কিছুদিন সংস্থাগুলো সক্রিয় থাকে—এরপর ধীরে ধীরে সব থেমে যায়। এই পুরোনো চক্র ভাঙতে হলে সুপারিশ বাস্তবায়নের নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সবমিলিয়ে, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পরও এয়ার ফানেল জোন নীতিমালা, যৌথ উচ্চতা জরিপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো ঝুলে থাকায় রাজধানীর ওই এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
এলেন বিশ্বাস