
ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হতে পাঠ দিই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখাই। কিন্তু আজ যখন চোখের সামনে প্রতিদিনের নরকযন্ত্রণা দেখি, তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। কলম ছেড়ে আজ বিবেকের তাড়নায় রাজপথে নামতে হয়েছে। ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে এভাবেই নিজের প্রতিবাদের কারণ ব্যাখ্যা করছিলেন উত্তরখান মাজার রোড এলাকার এক স্থানীয় শিক্ষক।
প্রতিদিনের তীব্র যানজট, গণপরিবহনে সীমাহীন ভাড়া নৈরাজ্য এবং চালক-হেলপারদের অরাজকতার বিরুদ্ধে এবার সোচ্চার হয়েছেন সচেতন নাগরিক ও শিক্ষকরা। আজ সকালে উত্তরখান মাজার রোড এলাকায় হাতে প্ল্যাকার্ড ও মাইক নিয়ে এই অরাজকতার প্রতিবাদে রাজপথে অবস্থান নেন ওই শিক্ষক। তাঁর এই প্রতিবাদী কণ্ঠে ধীরে ধীরে যোগ দেন ভোগান্তির শিকার সাধারণ যাত্রী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তরখান মাজার রোড এলাকায় প্রতিদিনের যানজট এখন নিত্যদিনের সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। তার ওপর যোগ হয়েছে পরিবহন খাতের লাগামহীন ভাড়া নৈরাজ্য। কিলোমিটারের হিসাব না মেনে ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকানো হলেও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ কিংবা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ যাত্রীদের। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা।
প্রতিবাদকারী শিক্ষক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন,
আমরা প্রতিদিন ক্লাসরুমে তরুণ প্রজন্মকে সুনাগরিক হওয়ার নৈতিক শিক্ষা দিই। কিন্তু চোখের সামনে যখন প্রতিদিন শত শত মানুষ ভাড়ার নামে পকেট কাটার শিকার হচ্ছেন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকছেন, তখন চুপ থাকাটা নিজের বিবেকের কাছে অপরাধ মনে হয়। অন্যায় সহ্য করাও তো অপরাধের শামিল! আজ শিক্ষক হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি, এবার প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীলদের জেগে ওঠার পালা।
প্রতিবাদের খবর পেয়ে রাজপথে সংহতি জানাতে আসেন ক্ষুব্ধ সাধারণ যাত্রীরাও। নিয়মিত যাতায়াতকারী এক ভুক্তভোগী যাত্রী বলেন,
“মাজার রোডে যাতায়াত করা এখন যেন এক ধরনের শাস্তি! কিলোমিটারের হিসাব অনুযায়ী যেখানে ভাড়া হওয়া উচিত ১০-১৫ টাকা, সেখানে ইচ্ছেমতো ২০-৩০ টাকা হাঁকানো হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে চালক ও হেলপারদের অশালীন আচরণ সহ্য করতে হয়। কোনো তালিকা বা স্টপেজ নেই, যার যেমন ইচ্ছা ভাড়া নিচ্ছে। আমরা এই অরাজকতার অবসান চাই।
স্থানীয় এক স্থায়ী বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন,আমরা উত্তরখানের বাসিন্দা, কিন্তু বাসা থেকে বের হলেই মাজার রোডের মুখে এসে আটকে যেতে হয়। একদিকে অমূল্য সময় নষ্ট, অন্যদিকে পকেটের টাকা খালি। সিটি কর্পোরেশনকে সব ধরনের ট্যাক্স দিচ্ছি, অথচ যাতায়াতের ন্যুনতম সুব্যবস্থা নেই। একজন শিক্ষকের এমন রাজপথে নামা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, এখন থেকে আমরাও চুপ থাকব না।
নীরবতা ভাঙার তাগিদ ও সুশীল সমাজের সুর
আন্দোলনস্থল থেকে সকল নাগরিককে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান প্রতিবাদী শিক্ষক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আজ যদি আমরা চুপ থাকি, তবে এই নৈরাজ্য আরও বাড়বে। আমাদের নীরবতাই অসৎ পরিবহন কর্মীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই নিজের অধিকার আদায়ে আমাদের সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। ন্যায্য ভাড়ার দাবি কোনো অন্যায় দাবি নয়, এটি আমাদের নাগরিক অধিকার।
শিক্ষকের এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ডিএনসিসি ও ট্রাফিক কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। সংহতি জানিয়ে এক সচেতন নাগরিক বলেন,একজন শিক্ষক যখন মাইক আর প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে নামেন, তখন বুঝতে হবে সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। উত্তরখান মাজার রোডের যানজট নিরসনে অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করা উচিত। নির্দিষ্ট ভাড়ার চার্ট টাঙানো ও ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
উত্তরখান মাজার রোডের যানজট নিরসনে অবিলম্বে সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক অভিযানের দাবি জানান। শিক্ষক হিসেবে তিনি সঠিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন উল্লেখ করে বিক্ষোভকারীরা বলেন, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আগামীতে আরও বড় পরিসরে রাজপথ অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এলেন বিশ্বাস