
রাজধানীর কোলঘেঁষে অবস্থিত হলেও যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ! যাতায়াতের প্রধান সড়কটি রূপ নিয়েছে কাদার সাগরে। জরুরি অবস্থায় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ তো দূরের কথা, সাধারণ একটা রিকশা পর্যন্ত চলতে চায় না। রাজধানী ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলির চরম বেহাল দশায় কাদা-পানিতে পুরোপুরি বন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন। মাসের পর মাস ধরে এমন নরকযন্ত্রণা সহ্য করলেও নগর কর্তৃপক্ষের কোনো হেলদোল নেই। অথচ নিয়ম মেনে প্রতি মাসেই সরকারকে কর ও ট্যাক্স গুনে যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, দক্ষিণখানের রাস্তাগুলোর অধিকাংশ স্থানজুড়ে হাঁটু সমান কাদা ও বিষাক্ত ড্রেনের পানি জমে আছে। এই পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক পথ মাড়িয়েই প্রতিদিন কোমলমতি শিশুদের স্কুলে যেতে হচ্ছে। কাদা পানিতে জামাকাপড় নষ্ট হওয়া এবং আছাড় খেয়ে আহত হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। কেবল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীই নয়, চরম কষ্টে পড়েছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরাও। বাড়ির কাছে মসজিদ থাকলেও কাদা-পানি টপকে নামাজে যেতে তাদের নাভিশ্বাস উঠছে।
“আমরা কি সত্যি ঢাকা শহরে থাকি? একটা জরুরি রোগী হলে হাসপাতালে নেওয়ার কোনো পথ নেই। অ্যাম্বুলেন্সকে ফোন দিলে এই রাস্তার নাম শুনেই আসতে চায় না। রিকশাওয়ালাদের হাত-পা ধরেও রাজি করানো যায় না। আর কতকাল আমরা এভাবে বন্দি জীবন কাটাব?” মোরসালিন স্থানীয় বাসিন্দা
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদ ও বক্তব্য
জনভোগান্তির চরমে পৌঁছে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ তাদের হাহাকার ও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন:
হাজী আবদুল জলিল (৭২, স্থানীয় বাসিন্দা):
“আমার বয়সে এত খারাপ অবস্থা আমি দেখিনি। মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার মতো পরিবেশটুকুও নেই। কাদা আর ড্রেনের পানি টপকে মসজিদে ঢুকতে হয়। সরকারের খাতায় তো ট্যাক্স ঠিকই জমা হচ্ছে, কিন্তু আমরা নাগরিক সেবা হিসেবে পেলাম এই হাঁটু কাদা?”
মোছা. সুলতানা বেগম (গৃহিণী) “গত সপ্তাহে আমার ছোট মেয়েটা স্কুলে যাওয়ার সময় কাদায় পিছলে পড়ে পুরো ইউনিফর্ম নষ্ট করে ফেলে, হাতেও ব্যথা পায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হয়। কর্তৃপক্ষ শুধু মুখের আশ্বাস দেয়, বাস্তবে কোনো কাজ করে না।
মো. সাখাওয়াত হোসেন (চাকরিজীবী) সকালে অফিসে যাওয়ার সময় মনে হয় কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছি। প্যান্ট গুটিয়ে, জুতো হাতে নিয়ে মূল সড়কে গিয়ে বাস ধরতে হয়। কোনো মেহমান আমাদের এলাকায় আসতে চায় না। ঢাকার নাম আছে, কিন্তু সুবিধার দিক দিয়ে আমরা গ্রামের চেয়েও পিছিয়ে আছি।
সুমন আহমেদ (জরুরি সেবাপ্রার্থী) “কয়েকদিন আগে আমার এক বয়স্ক আত্মীয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স তো আসেইনি, পরে চারজন মিলে পাইপ ও খাটিয়া দিয়ে তাকে মেইন রোড পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। এই আধুনিক যুগে এটা কোনো কথা হলো?”
নিয়মিত ট্যাক্স দিলেও শূন্য নাগরিক সুবিধা
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দক্ষিণখানকে সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নাগরিাক সুবিধার দিক থেকে এলাকাটি একেবারে বঞ্চিত। ড্রেণেজ ব্যবস্থার চরম ত্রুটি এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা কাদার স্তূপে পরিণত হয়। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে শিথিলতা না থাকলেও রাস্তাঘাট মেরামতের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের এমন নীরবতায় চরম হতাশ স্থানীয় জনগণ।
দক্ষিণখানের অবরুদ্ধ হাজারো মানুষের এখন একটাই জোর দাবি মিথ্যা আশ্বাস বন্ধ করে অবিলম্বে টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও রাস্তা পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করা হোক। অবর্ণনীয় এই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে তারা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
এলেন বিশ্বাস