
আজ ৫ আগস্ট, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহিদ রাসেল মাহমুদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ঠিক এক বছর আগে—২০২৩ সালের ৫ আগস্ট, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান গলাচিপার ছেলে রাসেল মাহমুদ (২১)। আজ তার না ফেরার এক বছর। কিন্তু তার ফেসবুক লেখা শেষ লাইনটা— ‘জন্ম ভাগ্যের, মৃত্যু সময়ের, আর মৃত্যুর পর বেঁচে থাকা কর্মের’— যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। মানুষ ভুলেনি তাকে, বরং দিন দিন সে হয়ে উঠছে একটি প্রতীকের নাম।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চরশিবা গ্রামের বাসিন্দা রাসেল। পিতা আবুল হোসেন দিনমজুর, মা রাসেদা বেগম গৃহিণী। ছেলের প্রয়োজনে বাবা কঠোর পরিশ্রম করেছেন ছেলের পড়াশোনার খরচ যোগাতে। রাসেল নিজেও টিউশনি, কখনো ফল, কখনো কাঁচাবাজারে সবজি বিক্রি করে চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনা। ২০২০ সালে চর শিবা আব্দুস ছালাম আকন আইডিয়াল স্কুল থেকে এসএসসি পাস ও ২০২২ সালে ঢাকার শ্যামপুর বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটিতে—বাংলা বিষয়ে অনার্স কোর্সে।
থাকতেন যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায়। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলনে যোগ দেয়, সেসময় আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল রাসেলও। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের দিন রাসেল মাহমুদ যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে নামলে পুলিশের এলোপাথারি গুলি তার মাথায় লাগে। বিকালের দিকে রাসেলের মায়ের কাছে ফোন আসে, ‘রাসেল আপনার কি হয়?’ তার মাথায় গুলি লেগেছে। সাথে সাথে মা রাসেলের বড় ভাই মিরাজের কাছে ফোন দেয়। তাকে বলে রাসেলের কোন এক বন্ধু ফোন দিয়ে বলেছিলো গুলি লেগেছে। সেসময় রাসেলের বুকে ইউনিভার্সিটির আইডি কার্ড ও মাথায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ছিল। রাসেলের বড় ভাই খবর পেয়ে খালাত ভাই আজিজুল, মামা আলমগীর হোসেনকে খবর দেয়। রাসেলকে বিভিন্ন স্থানে খুঁজতে থাকে তারা, বিভিন্ন হাসপাতাল খুঁজলেও কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। তার পরের দিন ৬ আগস্ট খুঁজতে খুঁজতে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে তার নিথরদেহ পায় পরিবার। রাসেলের মাথায় পিছন Mary গুলি লেগে কপাল দিয়ে ভেদ করে বের হয়ে যায়। ততক্ষণে মায়ের বুঝতে বাকি রইল না যে তার ছেলে আর বেঁচেই’ভে e
রাসেলের মা রাসেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে লেখা পড়া করার জন্য ঢাকা পাঠিয়েছিলাম। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য কিন্তু শয়তানরা মানুষ হতে দিল না। বাড়ীতে ফিরে আসলো লাশ হয়ে। বাবাকে কত কষ্ট করে টাকা পাঠাইতাম মানুষ করার জন্য। মানুষ হয়ে অভাবী সংসারে হাল ধরবে, তা আর হলো না। মৃত্যুর পর রাসেলকে বার বার দেখতে ইচ্ছে করে কিন্তু বাবারে কৈ পামু, কত মানুষ দেখতে পাই কিন্তু আমার বাবার মতো কাউকেও তো দেখতে পাই না। আমার রাসেলের সাথে মোবাইলে শেষ কথা হয় ৪ আগস্ট রাতে। আন্দোলনে নামার জন্য বাবা আমার কাছে দোয়া চেয়েছেন। রাসেল বলেছিল ‘মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী, মা তোমার তিন ছেলের মধ্যে আমি যদি দেশের জন্য চলে যাই, তুমি দুই ছেলেকে নিয়ে থাকবা, অনুমতি দাও মা।’ আমার ছেলে তো কোন দোষ করেনি, ওকে কেন মারা হলো, যারা আমার ছেলেকে মারছে তাদের যেন বিচার হয়। আমি যেন বিচার দেখে যেতে পারি। আমার বাবা তো বিজয়ের হাসি দেখতো পেলো না’—বলে বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা রাসেদা বেগম।
বাবা আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে অত্যন্ত ভদ্র ছিলো। আমরা তার কথা মতো চলতাম। সবসময় টাকা পাঠাতে পারতাম না। রাসেল একটি প্রাইভেট পড়াতো, নিজে ফল বিক্রি করতো, এমনকি কাঁচা বাজারের সবজিও বিক্রি করতো। মাঝে মাঝে টাকা দিলে নিতো, না পারলে বলতো আর লাগবে না। আমরা অন্যের বাড়ীতে কাজ করে সংসার চালাই। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করছে তাদের যেন বিচার হয়।’
রাসেলের বড় ভাই মিরাজ হাওলাদার বলেন, ‘ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ও চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল সাহস, দৃঢ়তা আর প্রতিবাদের ভাষা। তার স্বপ্ন ছিল দেশের জন্য কাজ করা, দুর্নীতি আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা।’
এক সময় যে চরশিবা ছিল নিঃসঙ্গ এক দ্বীপ, আজ তা হয়ে উঠেছে শহিদ রাসেলের জন্মভূমি। স্থানীয়রা চান, রাসেলের নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হোক। রাসেল মাহমুদ নেই, কিন্তু তার স্বপ্ন আজও তরুণদের পথে হাঁটতে শেখায়। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই শহিদ সন্তানকে এলাকাবাসী গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।