
মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নিরীহ মানুষকে ভয়ভীতি, ফাঁদ ও ঘুষ বাণিজ্যের নির্মম এক কারখানায় পরিণত হয়েছিল কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগ, সাজানো ফিটিং নাটক, মাদকের চালান ভাগ-বাটোয়ারা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের টার্গেট করে মামলায় জড়ানোর অসংখ্য প্রমাণের পর দৈনিক মেহেদী-তে ধারাবাহিক অনুসন্ধান প্রকাশ হলে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে উপ-পরিদর্শক তন্তুমণি চাকমা, তায়েরিফুল ইসলাম ও সানোয়ার হোসেন- এই তিন চিহ্নিত কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (প্রশাসন) রাজীব মিনা স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। আদেশে বলা হয়েছে, তন্তুমণিকে কুমিল্লায়, তায়েরিফুল ইসলামকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ও সানোয়ার হোসেনকে লক্ষ্মীপুরে বদলি করা হয়েছে।
তবে বদলির আদেশে শাস্তি বা তদন্তের কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন- এই বদলি আদৌ কোনো শাস্তি, নাকি দুর্নীতিকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার ছক।
ঘটনার সূচনা খোরশেদ আলম নামে এক প্রবাস ফেরত নিরীহ নাগরিককে ঘিরে। অভিযোগ উঠেছে, গত ১২ মে সকালে খুনিয়াপালং ইউনিয়নের দারিয়ারদিঘি গ্রামে অভিযান চালায় ডিএনসির একটি দল। দুই মোটরসাইকেল ধাওয়া করে পাহাড়ে নিয়ে ২ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের নাটক সাজায় তারা। এরপর স্থানীয়দের সাক্ষী বানিয়ে খোরশেদের বাড়িতে হানা দেয় এবং দেয়াল টপকে তার পার্কিংয়ে রাখা মোটরসাইকেলটি জব্দের চেষ্টা চালায়। বাধা দিলে হুমকি দিয়ে চলে যায় তারা।
পরে সেই বাইকের সঙ্গেই ৬ হাজার ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে মামলা দেওয়া হয় খোরশেদের নামে। অথচ ঘটনাস্থলে ছিলেন না খোরশেদ, তার কোনো সম্পৃক্ততারও প্রমাণ নেই। স্থানীয় সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শীরাও তদন্ত কর্মকর্তাকে স্পষ্টভাবে বলেন- এটি একটি সাজানো নাটক, পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফাঁসানো।
অভিযোগ আরও গুরুতর হয়, যখন জানা যায়- ডিএনসি সদস্যরা ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে খোরশেদের ভাগিনার মাধ্যমে। টাকা না দেওয়ায় তাকে ‘পালাতক আসামি’ বানিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর ভেঙে পড়েন খোরশেদের ৮০ বছরের মা ফিরোজা খাতুন। অপমানে, ক্ষোভে, এবং সন্তানকে হেনস্তা দেখার বেদনায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। গত ১৮ জুন সকালে স্ট্রোকে মৃত্যু হয় তার। এরপর ভুক্তভোগী পরিবারটি প্রতিকার চেয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ কয়েকটি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন।
খোরশেদ আলম, তার ভাই ফরিদুল, স্থানীয় বাসিন্দারা এবং মামলার সাক্ষীরা স্পষ্ট করে বলেন, তন্তুমণি চাকমা ও তায়েরিফুল ইসলাম এই অপকর্মের মূল হোতা। তাদের আশ্রয়ে কক্সবাজারে গড়ে উঠেছে একটি মাদক-ভিত্তিক চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট, যারা প্রতি অভিযানে নতুন নাটক লিখে নিরীহ মানুষকে ফাঁসায়, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গোপন আঁতাতে লিপ্ত থাকে এবং ক্ষমতার দম্ভে দুর্নীতিকে শুদ্ধি হিসেবে চালিয়ে দেয়।
ভুক্তভোগী খোরশেদের পরিবারের সদস্যরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তন্তুমনি ও তায়েরিফুল- এরা যেন মাদকের কালসাপ, কক্সবাজারে দ্বিতীয় প্রদীপ হয়ে উঠেছিল। আজ তারা বদলি হলেও আমাদের জীবনে নামিয়েছে চিরস্থায়ী অন্ধকার। মিথ্যা মামলায় আমাদের মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে দিয়েছে, সমাজের সামনে অপমানিত করেছে। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে- মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক আর লজ্জায় আমরা দম বন্ধ করে বেঁচে আছি। শুধু বদলি নয়, এদের বিচার না হলে এমন ভোগান্তি চলতেই থাকবে।
২০২০ সালের শেষদিকে কক্সবাজারে যোগ দেওয়া তন্তুমণি চাকমা টানা প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই জেলায় বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন- যা সরকারি নীতিমালার সম্পূর্ণ বরখেলাপ। তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিপুল মাদকের চালান আত্মসাৎ, সাজানো মামলা, নিরীহ ব্যক্তিদের ভয়ভীতি ও মাসোয়ারা আদায়ের অসংখ্য অভিযোগ।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বেতনের বাইরে তন্তুমণি আজ কোটিপতি। নিজের গ্রামে তৈরি করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি টাকা, যার উৎস অজানা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে- তার অনেক অভিযানে জব্দ মাদক ও মামলার মাদক সংখ্যায় গরমিল ছিল। ২০ ফেব্রুয়ারি, আরফা বেগমের ঘটনায় ৪ হাজার ইয়াবা ও ২.৫ লাখ টাকা জব্দ হলেও কেসে দেখানো হয় ২ হাজার ইয়াবা। ২৩ ফেব্রুয়ারি, রামুতে ২০ হাজার ইয়াবা ও ২ লাখ টাকা উদ্ধার হলেও মামলা দেখানো হয় ১৫ হাজার পিস। ২ মার্চ, ইসমাইল ড্রাইভারকে আটক করে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ, মামলায় উল্লেখ মাত্র ৮ হাজার।
এই ‘ঘাটতির’ পেছনে আছে ব্যবসা ও ভাগবাটোয়ারা- এমনটাই জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে দায়িত্বে থাকলেও এই কর্মকর্তারা আসলে ছিলেন মাদক কারবারের ছায়াচালক। অভিযান নয়, বরং মাদক গায়েব করাই ছিল তাদের পছন্দ। সরকারি ইউনিফর্মকে ঢাল বানিয়ে নিজেরাই বানাতেন সাজানো মামলা, চালাতেন মামলা বাণিজ্য। কক্সবাজারে দীর্ঘদিন চাকরির সুযোগ নিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আইন প্রয়োগের মুখোশ পরে অপরাধের রাজত্ব গড়ে তোলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
সচেতন নাগরিক সমাজ বলছেন, এখন কক্সবাজারে ডিএনসি মানেই আতঙ্ক। মানবাধিকার, প্রমাণ, তদন্ত- এসব যেন তামাশা। টাকা দিলে মুক্তি, না দিলে ফাঁসানো। নিরীহ মানুষ থেকে প্রবাসফেরতরা, এমনকি নারী পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছেন না।
স্থানীয় এক যুবক বলেন, তন্তুমণির ব্যাংক হিসাব, লাইফস্টাইল আর গ্রামে বিলাসী বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়, এই অফিসার কতটা অর্থবিত্তে ডুবে আছেন। অথচ তার বেতন সরকারি নিয়মে খুব সীমিত।
সুশীল সমাজ বলছে, এই বদলি যথেষ্ট নয়। যারা আইনের ছায়ায় অপরাধ করছে, তাদের শুধু বদলি নয়- শাস্তি, মামলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে কক্সবাজারে মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে ‘মাদক-অধিদপ্তরীয় মাফিয়া’ চক্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট কীভাবে নড়েচড়ে বসাতে পারে পুরো একটি দপ্তরকে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ ‘কয়েকটি গণমাধ্যমে’র ধারাবাহিক প্রতিবেদন। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না। প্রশাসনকে এখন সাহস দেখাতে হবে- দুর্নীতির শিকড় ছেঁটে, অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। না হলে বদলির পর্ব শেষ হলেও, অপরাধের যাত্রা থামবে না- শুধু নাম আর চেহারা বদলাবে। এমনটাই মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত দৈনিক মেহেদীর অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর ও সময়ের কন্ঠস্বরের কক্সবাজারস্থ স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক শাহীন মাহমুদ রাসেলকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টার অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (এডি) এ.কে.এম দিদারুল আলমকে তাৎক্ষণিকভাবে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল।
৯ মার্চ লিংকরোড থেকে এক অটোরিকশাচালককে আটক করে ডিএনসি। চালকের স্ত্রীর অনুরোধে সাংবাদিক রাসেল ফোনে জানতে চাইলে এডি দিদার অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কিছুক্ষণ পর ইয়াবাসহ এক যুবককে হাজির করে সেটিকে সাংবাদিক রাসেলের সঙ্গে জড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হয়।
এ ঘটনায় ১০ মার্চ সাংবাদিকরা মানববন্ধন করেন। এরপর ১১ ও ১৫ মার্চ তদন্ত টিম কক্সবাজারে এসে সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে দিদারকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়।