
রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত একমাত্র দাতব্য হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী শাহ্ আলী জেনারেল হাসপাতাল। দাতব্য চিকিৎসায় পাঁচ টাকার টিকিটের বিনিময়ে হযরত শাহ্ আলী (রঃ) এর মাজার শরীফের আয়ের টাকায় বিনামূল্যে ঔষধ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। এক সময়ের জনসেবামূলক দাতব্য প্রতিষ্ঠান হলেও উর্ধ্বতন মহলের নজরদারির অভাব, সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতির যাঁকাকলে আজ তা যেন রূপ নিয়েছে একটি অব্যবস্থাপনার প্রতীকে। অযত্ন, অনাদর, অবহেলায় ধুঁকছে ঐতিহাসিক এই হাসপাতালটি।
জানা গেছে, মূলত মাজার শরীফে দূর-দরান্ত থেকে এসে অসুস্থ দর্শনার্থী, জিয়ারতী, স্থানীয় নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মাঝে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটিতে এখন রোগী আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাঁচ টাকায় টিকিটের বিনিময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন বহু মানুষ আসলেও প্রয়োজনীয় ডাক্তার, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাবে তারা চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, ল্যাবরেটরি—কোনো কিছুরই নেই কার্যকরী উপস্থিতি। হাসপাতালের প্রাঙ্গণ ও মূল ভবন প্রায়শই স্থানীয় প্রভাবশালীদের পারিবারিক-সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হচ্ছে—যা দাতব্য হাসপাতালের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের ভবনসহ মূল প্রাঙ্গণের বড় অংশ বাঁশ, খুঁটি ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে বিশালাকার প্যান্ডেলে ঘিরে রাখা হয়েছে পুরো প্রতিষ্ঠানটি। চিকিৎসা, জনসেবা নয়, ভাড়া-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে অর্থের বিনিময়ে কমিউনিটি সেন্টারের মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার লক্ষেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাসপাতালটি।
এসময় পুরো হাসপাতাল ভবনটিকে ঘিরে প্রাঙ্গণে অস্থায়ী প্যান্ডেল নির্মাণে বাঁশ-খুঁটি স্থাপনের কারণ জানতে কাজে নিয়োজিত একজন শ্রমিককে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এখানে সুন্নতে খাৎনার অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। মাজার শরীফের ম্যানেজার মোর্শেদ আলমের অনুমতি নিয়েই করা হচ্ছে এসব।
জলিল নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, আমার স্ত্রী গত কয়েকদিন যাবত ভীষণ জ্বর ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। আজ সকাল ১০ টার দিকে হাসপাতালে এসে পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে প্রায় ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর একজন ডাক্তার এসে তাকে কোনোভাবে দেখে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। এসময় আমি হতদরিদ্র ও আমার কাছে ওষুধ কেনার টাকা নেই উল্লেখ করে বিনামূল্যে ওষুধ প্রদানের দাবি জানাই। হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনো ওষুধ প্রদান না করে একজন মহিলা স্পষ্ট করে বলেন, হাসপাতালে বিনামূল্যের ওষুধ নেই। যান বাইরের কোনো ফার্মেসী থেকে কিনে নেন।
এসময় মোশারফ নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, বিশেষ করে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই হাসপাতালের ব্যয়ভার হযরত শাহ্ আলী (রঃ) মাজার শরীফের আয় থেকে বহন করার কথা থাকলেও এর কোনো কার্যকর নজরদারি নেই। ফলে ডাক্তার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা ও দায়িত্বহীনতা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, ঐতিহাসিক মিরপুর হযরত শাহ্ আলী মাজার শরীফ ঐতিহ্য রক্ষা, হতদরিদ্র জনবহুল বস্তি এলাকা অধ্যুষিত মিরপুর এলাকার স্থানীয় সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এই হাসপাতালটির উন্নয়নে সম্ভাবনা বিশাল। প্রয়োজন শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন। সঠিক উদ্যোগ, পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ সরবরাহ এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে শাহ্ আলী জেনারেল হাসপাতালটি ফিরে পেতে পারে তার হারানো সুনাম এবং মিরপুরের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাজার শরীফ কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেউই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।