
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদের দেশীয় ছোট মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির সংবাদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অব্যবস্থাপনার চিত্রও হাজির করেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় কাপ্তাই হ্রদের কাচকি, চাপিলা, ট্যাংরা, মলা ও ঢ্যালার মতো ছোট মাছে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বা সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ধরা পড়েছে। সংগৃহীত ৭৫টি নমুনা মাছের প্রতিটিতেই পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। হ্রদের তলদেশের কাদা ও বালু থেকে খাবার গ্রহণ করায় ট্যাংরা মাছে এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি—প্রতি গ্রামে গড়ে ০.৬৩টি কণা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মাছে পাওয়া প্লাস্টিক কণার ৮৫ শতাংশই ছিল ফাইবার বা সুতা আকৃতির এবং ৭১ শতাংশই পলিথিন। এগুলো মূলত ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল, প্যাকেজিং সামগ্রী, গৃহস্থালি বর্জ্য এবং মাছ ধরার পুরোনো পরিত্যক্ত জাল থেকে তৈরি।
.
এই তথ্যগুলোই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেলার কারণ স্পষ্ট করে তোলে। এই পরিবেশগত ট্র্যাজেডির মূলে রয়েছে পর্যটন বিকাশ ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। রাঙামাটি ও কাপ্তাই হ্রদের প্রকৃতিকে পুঁজি করে ব্যবসা ও বিনোদনের আয়োজন হলেও প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখার ন্যূনতম দায়িত্ব কেউ পালন করছে না। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বোতল, চিপসের প্যাকেট ও অপচনশীল পলিথিন ড্রেন ও বৃষ্টির পানির সঙ্গে অবাধে গিয়ে পড়ছে হ্রদে।
কাপ্তাই হ্রদের ছোট মাছের এই দূষণ কেবল পরিবেশের ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। যেহেতু মাছগুলো সাধারণত নাড়িভুঁড়িসহ পুরোটা রান্না করে খাওয়া হয়, সেহেতু মাছের পাকস্থলীতে জমে থাকা এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। গবেষকদের মতে, নিয়মিত এসব প্লাস্টিকযুক্ত মাছ খেলে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের শরীরে জটিলতা তৈরি হবে। অর্থাৎ অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও পরিবেশ ধ্বংসের খেসারত শেষ পর্যন্ত মানুষকেই তার জীবনের ঝুঁকি দিয়ে দিতে হচ্ছে।
.
এখনই এই মারাত্মক সংকট সামাল দিতে প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। কাপ্তাই হ্রদভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্লাস্টিকের ব্যবহার অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করতে হবে। পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য দায়িত্বশীল বর্জ্য ফেলার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হ্রদের পার্শ্ববর্তী বাজার ও বসতিগুলোয় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। তবে কেবল নীতি গ্রহণ করলেই হবে না, নিয়মিত তদারক করতে হবে।