• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

বিনা রক্তপাতে যুক্তরাষ্ট্রে ‘রেজিম চেঞ্জ’

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬

ইরানের সরকার পতনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনবরত কামান দেগে গেছেন। বোমাবাজিতে কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষ মারা হলো। হাজার দশেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করা হলো। ‘সব বোমার মা’, এমন এক মারণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকিও দেওয়া হলো। কিন্তু আট মাস পরও ইরানের সরকার বহাল তবিয়তে রয়েছে।

অথচ গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কোনো বোমা না ফেলে, একটি গুলি না ছুড়েই বিনা রক্তপাতে নিজের দেশে একধরনের ‘রেজিম চেঞ্জ’ ঘটিয়ে দিলেন। ট্রাম্পকে তাঁরা প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরাননি, তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতায় লাগাম পরিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেই সমর্থকদের বলেছিলেন, ব্যালটে তাঁর নাম না থাকলেও তাঁরা যেন ধরে নেন তাঁর নাম রয়েছে। ভোটাররা যেন তাঁর সেই কথাই রেখেছেন, ভোটের রায় দিয়েছেন ট্রাম্প ও ট্রাম্পবাদের বিরুদ্ধে। অনেকের ভাষায়, এটি শুধু নীল বা ডেমোক্রেটিক ঢেউ নয়, রীতিমতো সুনামি।

.

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কোনো বোমা না ফেলে, একটি গুলি না ছুড়েই বিনা রক্তপাতে নিজের দেশে একধরনের ‘রেজিম চেঞ্জ’ ঘটিয়ে দিলেন। ট্রাম্পকে তাঁরা প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরাননি, তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতায় লাগাম পরিয়েছেন।

.

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন বরাবরই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলের শাসনামলের ওপর একটি গণভোট। গত এক শ বছর মাত্র তিনবার ছাড়া প্রতিবারই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে ভোটারদের হাতে নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে। ২০১০ সালে বারাক ওবামার প্রথম দফার শাসনামলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দল ৬৩টি আসন হারিয়েছিল।

এবারের চূড়ান্ত আসনসংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বেসরকারি হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন। সিনেটে তাঁরা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে অন্তত সাতটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন। টেক্সাস, জর্জিয়া ও ওহাইওর মতো অতিরক্ষণশীল রাজ্যে রিপাবলিকানদের হাত থেকে গভর্নরের পদও গেছে ডেমোক্র্যাটদের কাছে। টেক্সাসে মাত্র দুই বছর আগেই ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জিতেছিলেন। সেখানেও এমন ফল হওয়ায় বোঝা যায়, ডেমোক্র্যাটদের ঢেউ কত দূর পৌঁছেছে।

ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান প্রশাসন বিস্তর আয়োজন করেছিল। প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে নির্বাচনী মানচিত্র নতুন করে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। কারচুপি হবে, এমন অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ গেছে। অবৈধ অভিবাসীদের ভোটার তালিকায় রাখা হয়েছে, এই অভিযোগে ভোটার তালিকা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক হাজারের বেশি ফেডারেল নির্বাচনী পরিদর্শক পাঠানো হয়েছে। দলীয় সমর্থকদের বলা হয়েছে, তাঁরা যেন কারচুপি ঠেকাতে নির্বাচনী বুথ আগলে রাখেন। এসবেও যদি কাজ না হয়, তাহলে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার পরিকল্পনা করা হয়েছে, এমন কথাও শোনা গেছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এই প্রশাসনের দুর্নীতি, অনাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার আর গ্রহণ করতে রাজি হননি।

.ট্রাম্পের দলের ঐতিহাসিক ভরাডুবির নেপথ্যে.

১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটনের নির্বাচনী কৌশলবিদ জেমস কারভিল প্রচারের মূল কথাটি ধরেছিলেন একবাক্যে, ‘ইটস দ্য ইকোনমি, স্টুপিড।’ এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সেই পুরোনো কথাটিই মনে রেখেছেন। তাঁদের প্রচারের কেন্দ্রে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়। বাজারের বিল আর পেট্রলপাম্পের দামেই ভোটাররা অর্থনীতির হাল বিচার করেছেন। বার্তা সংস্থা এপির ভোটার জরিপে অধিকাংশ ভোটার বলেছেন, ট্রাম্পের নীতিতে তাঁদের খরচ আরও বেড়েছে।

ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তার মানে প্রায় সব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। ভোটের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘আমাদের হারের কারণ যুদ্ধ।’ তাঁর এই স্বীকারোক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যে যুদ্ধের মূল্য ভোটারদের দিতে হয়েছে, সে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরই প্রেসিডেন্ট।

ইরান যুদ্ধ ছাড়াও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির অন্য কারণ বাণিজ্যযুদ্ধ। ক্ষমতা গ্রহণ করে ট্রাম্প আগপাছ বিবেচনা না করেই ঢালাও আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা শুল্ক থেকে ট্রিলিয়ন ডলার আয় করছি।’ সেই ট্রিলিয়ন ডলার যে আসলে কর হিসেবে দেশের সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে গেছে, সে কথা তিনি বোঝেননি।

জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষের ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, সে কথাও ট্রাম্প বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছেন, এটি ডেমোক্র্যাটদের বানানো একটি ‘হোক্স’ বা প্রতারণা। ভোটের আগের সপ্তাহেও তিনি স্বীকার করেননি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশে সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘দাম হয়তো একটু বেড়েছে, কিন্তু ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের জন্য এতটুকু ত্যাগ তো স্বীকার করাই যায়।’ এক নির্বাচনী সভায় তিনি এমন কথাও বলেছেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ায় আমরা দারুণ লাভবান হয়েছি।’ কথাটা ঠিক, কিন্তু এই ‘আমরা’ হচ্ছে তিনি, তাঁর পরিবার ও আমেরিকার মিলিয়নিয়ার শ্রেণি।

.

ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলনের মূল বক্তব্যই ছিল সব অশ্বেতকায়, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের বাদামি মানুষের প্রতি ঘৃণা। তাঁরা বহিরাগত, যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান ও শ্বেতসভ্যতার প্রতি হুমকি। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, বহিরাগতদের উপস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ‘সভ্যতাগত নিশ্চিহ্নকরণ’, তাঁর কথায় ‘সিভিলাইজেশনাল ইরেজারের’ মুখোমুখি।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে তাঁর শক্ত অবস্থান। মানতেই হবে, এই শক্ত অবস্থানের কারণে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের আগমন কার্যত বন্ধ হয়েছে, সে জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু অবৈধ অভিবাসন বন্ধের নামে তিনি দেশজুড়ে সামরিক কায়দায় যে অভিযান শুরু করেন, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষত মেক্সিকো থেকে আগত অভিবাসী। তাঁদের বহিষ্কারের নামে মুখোশ আঁটা অভিবাসন পুলিশ (আইস এজেন্ট) যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে রীতিমতো তাণ্ডব শুরু করে দেয়। শিশুপুত্রের সামনে মা-বাবাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। অবৈধ এই অভিযোগে পায়ে শিকল বেঁধে তাঁদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আইসের গোলাগুলিতে একাধিক মার্কিন নাগরিক নিহতও হন।

.

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ এই অভিবাসনবিরোধী অভিযান। ২০২৪ সালে টেক্সাস বা অ্যারিজোনার মেক্সিকান-আমেরিকানরা দলবেঁধে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরাই এবার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। টেক্সাসে এই হিস্পানিক ভোটের কারণেই সেখানে গত ৪০ বছরে এই প্রথম একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। গভর্নর হয়েছেন একজন হিস্পানিক নারী। টেক্সাসের প্রতিনিধি পরিষদও একইভাবে রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।

.যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়লেন যে ১০ প্রার্থী.

বহিরাগতদের একজন হলেন মিশিগানের সদ্য নির্বাচিত সিনেটর আবদুল আল-সাইদ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে জিহাদি, সন্ত্রাসী, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি, এমন কতভাবেই না বর্ণনা করেছেন। লক্ষ্য, মিশিগানের ভোটারদের মনে তাঁর ও তাঁর মতো বহিরাগতদের প্রতি ঘৃণার সঞ্চার। আল-সাইদ গাজায় গণহত্যার কারণে ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেছেন, এই কারণে তাঁকে ঠেকাতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। বলা হয়েছে, নির্বাচিত হলে মার্কিন সিনেটের আশপাশে তাঁকে যেতে দেওয়া হবে না। আর গেলেও সন্ত্রাস ঠেকানোর জন্য স্থাপিত মেটাল ডিটেক্টর পেরিয়ে সিনেটে ঢুকতে হবে।

আল-সাইদের কৃতিত্ব, তিনি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ছুড়ে দেওয়া টোপে পা দেননি। তিনি বলেছেন তাঁর লক্ষ্য, রাজনীতি থেকে অর্থ বন্ধ করে মানুষের পকেটে তা তুলে দেওয়া এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। জেডি ভ্যান্স, যে তাঁকে প্রতারক বলেছেন, নির্বাচনে জয়লাভের পর তাঁর উদ্দেশে আল-সাইদ বলেছেন, ‘হাবিবি, এখন তো আমাকে সিনেটর হিসেবে শপথ করাতে তুমি বাধ্য, সেটা তোমার শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব।’

.কংগ্রেস হাতছাড়া, বড়

ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প .

যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী, এ দেশের সব ক্ষমতা প্রশাসন, সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই সমবণ্টন মানেননি। তিনি নিউইয়র্ক টাইমস–এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এমন কথা বলেছিলেন, কোনো আইন তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তিনি যা খুশি করতে পারেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাজে একমাত্র বাধা হচ্ছে আমার নিজস্ব নৈতিকতা।’ অনুগত রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে তাঁকে কখনোই বাধা দেওয়ার সাহস দেখাননি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টও তাঁকে ছাড় দিয়েছেন।

এখন সে অবস্থা বদলাবে। নতুন কোনো আইন প্রণয়ন, অথবা বাজেট অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের জন্য ট্রাম্পকে কংগ্রেসের কাছে আসতেই হবে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় যুদ্ধ থেকে বাণিজ্যনীতি, অভিবাসনব্যবস্থা থেকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত, এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার ক্ষমতা আগামী কংগ্রেসের থাকবে।

প্রশ্ন, সে ক্ষমতা ব্যবহার করে ডেমোক্র্যাটরা কি ট্রাম্প প্রশাসনের তদন্তেই সব সময় ব্যয় করবেন? হাকিম জেফ্রিস স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তদন্ত নয়, তাঁদের লক্ষ্য হবে মানুষের জীবনযাত্রা কীভাবে সহনীয় করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া। এবারের নির্বাচন থেকে তাঁরা সে বার্তাই পেয়েছেন।

.

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের বড় পরাজয় ঘটেছে। তাঁদের সঙ্গে পরাজিত হয়েছেন ইলন মাস্ক। বিশ্বের এই সেরা ধনী সাবধান করে বলেছিলেন, এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের বারোটা বাজবে। তেমন আশঙ্কা ঠেকাতে তিনি একাই প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। সবই বৃথা গেল।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এজেন্ডার অন্যতম বিষয় ছিল স্থানীয় নাগরিকদের সম্মতি ছাড়া এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমর্থনে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাধা দেওয়া। সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টার নির্মিত হচ্ছে টেক্সাসে, যেখানে ক্ষমতার প্রতিটি কেন্দ্র এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

হতাশ ইলন মাস্ক সখেদে বলেছেন, ‘আমাকে তাহলে মঙ্গল গ্রহে গিয়েই ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতে হবে।’

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!