• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

আশাশুনির আশা তামান্নারা

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬

আশাশুনির কোনো আশা নেই। এমনটাই বলেন প্রায়–হতাশ জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা। সাতক্ষীরায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাগুলোর মধ্যে আশাশুনি অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়ন তার ২৩টি গ্রাম নিয়ে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। আশাশুনির শিশু–কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, হারিয়ে যাচ্ছে মানে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে এমন নয়। ওখানকার মানুষেরা চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও।

২৩ গ্রামের এক গ্রাম হাওলাদার পাড়ায় থাকেন তামান্না সুলতানা। সেখানে কত দিন থাকা যাবে, সেটা কেউ বলতে পারে না। হাওলাদার পাড়ার লাগোয়া হরিশখালী, কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, বনতলা, দিঘলারাইট আস্তে আস্তে খালি হয়ে যাচ্ছে। এসব গ্রামের পুরুষেরা কাজের খোঁজে খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ চলে যাচ্ছে। মেয়েরা যাচ্ছে যশোর। মেয়েরা কেন যশোর যাচ্ছে?—এ প্রশ্নে তামান্না, শাকিব, সুচনা, হালিম পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। পেছন থেকে কেউ একজন বলে, ‘ওখানে মেলা তেল।’ তামান্না বলে, মেয়েরা যায়, আবার ফিরে আসে। পুরুষেরা গেলে ফিরে আসে কম।

.

বাঘের চেয়ে দুষ্ট মানুষের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা বেশি কঠিন। বড়রা চলে গেল শিশু পাচার বেড়ে যায়।

.

অন্য শিশু–কিশোর–কিশোরীরা যখন নিরাপদ পানির সংকট, স্কুলে যাতায়াতের সমস্যা, খোসপাঁচড়া, ডায়রিয়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ইত্যাদি সমস্যার কথা বলে, তখন তামান্না আয়রোজগারের সন্ধানে পরিবারপ্রধানদের দূরদেশে চলে যাওয়াকে বড় সমস্যা বলে তুলে ধরে। তার মনে হচ্ছে মানুষের চলে যাওয়াই মূল সমস্যা। বড়রা চলে গেলে শিশুরা অরক্ষিত হয়ে যায়। বাঘের চেয়ে দুষ্ট মানুষের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা বেশি কঠিন। বড়রা চলে গেল শিশু পাচার বেড়ে যায়।

.

মেয়েরা কেন যশোর যাচ্ছে?—এ প্রশ্নে তামান্না, শাকিব, সুচনা, হালিম পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। পেছন থেকে কেউ একজন বলে, ‘ওখানে মেলা তেল।’ তামান্না বলে, মেয়েরা যায়, আবার ফিরে আসে। পুরুষেরা গেলে ফিরে আসে কম।

.

সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের শিশুরা খুলনায় একসঙ্গে বসেছিল আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ করতে। সেখানেই আলাপ হয় তামান্নাদের সঙ্গে। তামান্না হাওলাদার পাড়া ‘বাবুই পাখি’ কমিউনিটি শিশু দলের প্রধান। পাড়া বা গ্রামভিত্তিক শিশু–কিশোর দল তারা গড়ে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন তাদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে এবং তা মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তারা কী উদ্যোগ নিয়েছে—সেসবের হিসাব-নিকাশই ছিল খুলনার এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য। তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠেয় জলবায়ু সম্মেলনে খুলনার শিশুদের প্রতিনিধিরাও যাবে।

.

তামান্না হাওলাদার পাড়া ‘বাবুই পাখি’ কমিউনিটি শিশু দলের প্রধান। পাড়া বা গ্রামভিত্তিক শিশু–কিশোর দল তারা গড়ে তুলেছে।

.

তামান্না পড়ে প্রতাপনগর এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ইউনাইটেড একাডেমিতে। তাদের স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৬২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৬ জন। তিন–চার বছর আগেও এত শিক্ষার্থী ফেল করত না। ২০২৩ সালে কেউই ফেল করেনি। ২০২৫ ফেল করেছিল ১৫ জন।

শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ২০২১–২০২২ সালে প্রায় ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে যায়। এর একটা কারণ হতে পারে কোভিড–১৯ অতিমারি। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের সংখ্যা বেশি। ছেলেরা কার্তিক মাসে ইটভাটায় কাজ করতে চলে যায়; তাদের আর বার্ষিক পরীক্ষা দেওয়া হয় না। কাজ শেষ করে বৈশাখ মাসে ফিরে এলে স্কুল আর তাদের নেয় না।

.

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের ‘বাংলাদেশের ইটভাটায় শিশুশ্রমের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ইটভাটায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের প্রায় ৮৪ শতাংশ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত।

.

উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে কত শিশু ইটভাটায় কাজ করতে, কতজন স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে, এ বিষয়ে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের ‘বাংলাদেশের ইটভাটায় শিশুশ্রমের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ইটভাটায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের প্রায় ৮৪ শতাংশ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত।

সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ইটভাটার মৌসুমে রিজার্ভ বাস যায় কমপক্ষে ১০টি জেলায়। ইটভাটার মালিকের দালালেরা পরিবারগুলোকে অগ্রিম টাকা দিয়ে শিশুদের কাজ করতে নিয়ে যায়। বছর কয়েক আগে আমি কুমিল্লা অঞ্চলে গেলে আলাপ হয়েছিল ইটভাটার কর্মী বারো–তেরো বছরের আব্বাসের সঙ্গে। তার বাবা কাজের সন্ধানে গিয়ে আর ফেরেনি; তাদের মা তিন সন্তান নিয়ে বড় বিপদে পড়ে যায়। আব্বাস বলেছিল, ‘মা অনেক কষ্ট করে আমার পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছিল। গ্রামে এখন তেমন কাজ নাই। বর্ষাকালে মা সংসার চালানোর জন্য সরদারের কাছ থেকে সাত হাজার টাকা দাদন (ঋণ) নিয়েছিল। আমি এখানে কাজ করে সেই টাকা শোধ করব।’

.

ইটভাটার আরেক শিশু কর্মীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। এক ইটভাটার মালিক তার পরিবারকে অগ্রিম টাকা দিয়ে তাকে কাজ করার জন্য নিয়ে গিয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল, ‘আমি যদি এখান থেকে পালায়ে যাই, তারা আমার বাড়ি গিয়া আমাকে ধরে আনবে। না হলে আমার মায়ের কাছ থেকে টাকা আদায় করবে।’

২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছিল সাতক্ষীরার শিশু জাহিদুলের খবর। তার বাবা বাক্‌প্রতিবন্ধী, মানসিক ভারসাম্যহীন। ভিক্ষা করেও তাদের দিন চলে না; তাই জাহিদুল সাতক্ষীরার গ্রামের বাড়ি থেকে কুমিল্লায় ইটভাটার কাজ করতে যায়। কাজের কষ্ট সইতে না পেরে সে বাড়ি ফিরে যেতে চেয়েছিল; কিন্তু শ্রমিক সরদার ও ইটভাটার মালিক তাকে ছাড়েনি। শেষে তার লাশ ফিরে যায়। বলা হয়, সে দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

.

এক কিশোরী ব্যাগ থেকে একটা সাঁকোর ছবি বের করে দেখিয়ে বলল, ‘এটা আমরা বানাইছি।’ এটাই শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি।

.

মেয়েশিশুরা তো ইটভাটায় কাজ করতে যায় না, কিন্তু তারা কেন পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে? কিশোরীদের বক্তব্য, বাপ–চাচারা কাজের খোঁজে দূরদেশে গেলে মেয়েশিশুদের বিয়ে দেওয়া হয়। এই বাল্যবিবাহই তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। কিছু মেয়ে বিয়ের পরে স্কুলে ফিরতে চায়; কিন্তু স্কুলগুলো তাদের আর নেয় না। বলা হয়, এই মেয়েরা ফিরে এলে অন্য মেয়েদের লেখাপড়া হবে না। এটা এখন সারা দেশে একটা অলিখিত আচারে পরিণত হয়েছে। অবশ্য বিবাহিত ছেলেদের স্কুলে পড়তে কোনো বাধা নেই।

প্রতাপনগরের কিশোরীরা বলল তাদের এলাকায় কী প্রয়োজন:

১. প্রতিটি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা (বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও লবণমুক্ত পানি);

২. উঁচু ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু স্কুল ও টয়লেট;

৩. শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার নিরাপদ স্থান;

৪. অপুষ্টি শনাক্তকরণ ও পুষ্টিসহায়তা;

৫. বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি।

আমি বলি, শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি কী বিষয়? এক কিশোরী ব্যাগ থেকে একটা সাঁকোর ছবি বের করে দেখিয়ে বলল, ‘এটা আমরা বানাইছি।’ এটাই শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি।

.

সেতু যখন করতে পেরেছি, তখন অন্য কাজগুলোও করতে পারব। আপনারা আমাদের কিশোর গ্যাং না বলে কিশোর শক্তি বলুন; পারলে পাশে থাকুন।

তামান্না

.

একসময় হাওলাদার পাড়ার সঙ্গে আশপাশের এলাকার সড়ক যোগাযোগ ছিল। একটি সড়ক দিয়ে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ সবাই স্কুলে যেত, বাজারে যেত। কিন্তু নদীর পাড় ভাঙতে ভাঙতে সড়কটি নষ্ট হয়ে যায়; ওই জায়গাটি খালে পরিণত হয়। লোকজন বাঁশ দিয়ে একটি সাঁকো তৈরি করেছিল। কিন্তু কিছুদিন পর সেটি নড়বড়ে হয়ে যায়। সাঁকো পার হওয়ার সময় কয়েকজন শিশু বই–খাতাসহ পানিতে পড়ে যায়। শিশু–কিশোরেরা দল বেঁধে ছুটে যায় ইউনিয়ন পরিষদে। ইউনিয়ন পরিষদ আগে কখনো শিশুদের এমন সংগঠিত আচরণ দেখেনি। শিশুদের চাপে শেষ পর্যন্ত একটি ভাসমান সেতু তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ১৪০ জন শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়ার একটি নিরাপদ পথ পেয়েছে। এতে বড়রাও উপকৃত হয়েছে।

কিশোরী তামান্না বলল, ‘সেতু যখন করতে পেরেছি, তখন অন্য কাজগুলোও করতে পারব। আপনারা আমাদের কিশোর গ্যাং না বলে কিশোর শক্তি বলুন; পারলে পাশে থাকুন।’ l

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!