• বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

ইতিহাসের ট্রাম্প-অধ্যায় শেষ হতে চলেছে, ইরান যুদ্ধের কী হবে

Reporter Name / ১০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ইতিহাসে বহুবার অন্য দেশের নির্বাচন প্রকাশ্য বা গোপনে প্রভাবিত করেছে। এবার তাদের নির্বাচন প্রভাবিত হলো ইরানের সামরিক কৌশল দ্বারা। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আগ্রাসনে কোণঠাসা ইরান যখন হরমুজ প্রণালি খামচে ধরল, তখনই যুদ্ধের আসল ধাক্কা খেল বিশ্ব অর্থনীতি এবং সেই সুনামি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও আঘাত করল; যার পরিণতি আজকের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল।

গত ২০ বছরে এ রকম হয়েছে কম, যখন প্রেসিডেন্ট একজন রিপাবলিকান হওয়ার পরও সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। আবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে সচরাচর এত বেশি ভোট পড়ে না—এবার আগাম ভোটে যা ঘটছিল। নজির হিসেবে এটাও বেশ বিরল। এর কারণ বিপুল ক্রোধ।

অনেকে বলছেন, সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকার ভোটাররা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে রায় দিলেন, সেটা যতটা নীতিগত, তার চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক। কর্মসংস্থানের খারাপ অবস্থা এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়া নিয়ে মানুষ হতাশ ও অসুখী ছিল। বলা বাহুল্য, গত কয়েক মাসের জরিপগুলোও এটাই জানাচ্ছিল।

.নির্বাচন নয়, যেন ধর্মযুদ্ধে নেমেছেন রিপাবলিকানরা .

এটা অতীতেরও অভিজ্ঞতা, আমেরিকার সাধারণ সমাজের গণতান্ত্রিক বুঝ এবং নির্বাচনী সংস্কৃতি সচরাচর যতটা অর্থনীতি ও সমাজের জীবনযুদ্ধকে গুরুত্ব দেয়—ততটা দেয় না জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিগত বিষয়কে। যদি প্রকৃতিই তাদের সংবিধানে লেখা গণতন্ত্রের মহান নীতিমালাকে ভোট দেওয়ার সময় তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত, তাহলে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে জিততেন না এবং এবারও রিপাবলিকানদের পরাজয় হতো আরও ব্যাপক।

২০১৬ সাল থেকে গত এক দশকে ট্রাম্প শাস্তিযোগ্য অনেক নীতিগত অপকর্ম করেছেন। এই নির্বাচনে তথাকথিত ‘ট্রাম্প-দশকের’ কফিনে পেরেক বসছে বটে, কিন্তু সেই শাস্তি ইরান বা গাজার ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যাশার সামান্যই মেটাতে পারবে। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধেও রায় নয় এটা।

মূলত ইরানের যুদ্ধকৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক জীবনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তারই ফল ভোটের হেরফের। ভোটাররা মনে করেছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো তাঁদের অর্থনৈতিক জীবনকে বিবেচনায় নিয়ে নেওয়া হয়নি। শ্বেতাঙ্গ নিচুতলায় তাঁর প্রতি এভাবেই গত এক দশকের মোহ কেটে গেছে। অভ্যন্তরীণ অনেক সামাজিক খাত থেকে বরাদ্দ সরিয়ে তিনি যুদ্ধ খাতে নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ তাতে অবহেলিত বোধ করেছে। এসবেরই প্রতিদান মধ্যবর্তী নির্বাচনের রায়।

.

বিশ্বসমাজের জন্য এখন বিশেষভাবে দেখার পালা এই নির্বাচন ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব ফেলে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন: ‘সচেতনভাবে হোক বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে হোক, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ আসলে যুদ্ধের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।

.

তবে এই রায়, ভোটারদের দিক থেকে নীতিগত বা কৌশলগত যা–ই হোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য এই ফলাফল হয়েছে বিধ্বংসী। সিনেট ও হাউস দুই জায়গাতে তিনি ও তাঁর সহযোগীদের সিদ্ধান্ত প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জে পড়বে। ভোটাররা এটাই চেয়েছেন। নিজেদের প্রেসিডেন্টের হাতে-পায়ে শিকল পরাতে চেয়েছেন তাঁরা এবং সেটা ভালোভাবেই হবে। সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী হওয়ায় ট্রাম্পের ক্ষমতাচর্চার লাগাম টেনে ধরতে পারবে। তাঁর মন্ত্রীদের কাজের তদন্ত করতে পারবে।

রিপাবলিকান অনেক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও আটকানো যাবে। বিশেষ করে বিচারক নিয়োগগুলো পাল্টানো জরুরি। ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নানান পদক্ষেপের সহযোগী রক্ষণশীল বিচারকেরা। ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেক সমর্থকের প্রত্যাশা, ডেমোক্র্যাটরা এ রকম বিচারক নিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন। এ ছাড়া সিনেটের অনেক কমিটি আছে, যারা অস্ত্র বেচাকেনায় সিদ্ধান্ত দেয়, রাষ্ট্রদূত নিয়োগে নজর রাখে। এসব বিষয়ে এখন ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে।

ইতিমধ্যে এ–ও স্পষ্ট, নির্বাচনে সামরিক লবির বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে লড়া রাজনীতিবিদদের বড় অংশই জিতেছে। সামাজিক সুরক্ষার জন্য সংগ্রামরত অনেক ডেমোক্র্যাট জিতেছেন। যাঁরা ডেমোক্র্যাট দলে প্রগতিশীল উপদল হিসেবে খ্যাত। এদের উত্থান ডেমোক্র্যাট দলে একটা মেরুকরণ ঘটাবে সামনের দিনগুলোতে, যা আবার বিশ্বরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।

যেমন মিশিগানে মুসলিম-আমেরিকান সিনেটর হিসেবে আবদুল আল-সাইদের বিজয় ডেমোক্র্যাট দলের ভেতর ক্ষমতা-ভরকেন্দ্রে বড় ধরনের অদলবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, আবদুল সাইদের বিজয় ধর্ম বা বর্ণের জায়গার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর স্বাস্থ্যনীতিগত অবস্থানের কারণে। তিনি আমেরিকার ইসরায়েল নীতিরও বিরুদ্ধে ছিলেন। শেষোক্ত কারণে এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত যুদ্ধক্ষেত্র ছিল মিশিগান।

.

তাঁর বিজয় ডেমোক্র্যাট শিবিরের ইসরায়েলপন্থী অংশকে বেশ কোণঠাসা করল। নির্বাচনের আগে আগে এ রকম একদল আবদুল সাইদের বিপরীতে রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও এটা ডেমোক্র্যাটরা পেল। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এই নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে জোরালো প্রচার চালান এবং আবদুল সাইদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়কে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।

মিশিগান এমন একটা রাজ্য, যেখানে একজন প্রগতিমুখী ডেমোক্র্যাট সিনেটর হওয়া মানে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে এই দলটিতে বার্নি স্যান্ডার্স, ওকাসিও কর্টেজের মতো ডানবিরোধীরা প্রাইমারিতে এগিয়ে থাকবেন। 

সামগ্রিকভাবে এবারের নির্বাচনের ফল দুই বছর পর অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে একধরনের বাড়তি আশাবাদ তৈরি করবে বৈকি। এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের মোকাবিলা করতে গিয়ে ডেমোক্র্যাটরা তহবিল সংগ্রহেও বেশ সফলতা দেখিয়েছে, যেখানে সচরাচর তারা পিছিয়ে থাকে। আবার যেসব রাজ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে দোদুল্যমান বা সুইং স্টেট বলা হয়, সেগুলোতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভালো করতে দেখা যাচ্ছে।

অথচ দুই বছর আগে এসব রাজ্যে ট্রাম্প জিতেছিলেন। এ রকম এক রাজ্য জর্জিয়ায় গভর্নর হিসেবে জিতেছেন আফ্রিকান-আমেরিকান ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস। যাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ছিলেন একজন অতি ধনী প্রার্থী। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অর্থের বিশেষ প্রভাব থাকে। সে রকম প্রভাব অতিক্রম করে একজন আফ্রিকান-আমেরিকান নারীর গভর্নর হওয়া আমেরিকার নির্বাচনী ইতিহাসেই বড় এক ঘটনা।

কেইশা বিগত সময়ে আটলান্টার মেয়র হিসেবে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন শিবিরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এতে এমনও ইঙ্গিত মিলছে ডেমোক্র্যাট দলে সব উপদলের প্রার্থীরাই কমবেশি জিতেছে। 

.

সিনেট ও হাউসে এ রকম ডেমোক্র্যাটদের বাড়তি উপস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনিক নানান বিষয়ে মুশকিলে পড়বেন। আবার তাঁর জন্য এখন বিপদ আছে নিজ দলেও। রিপাবলিকান শিবিরে যাঁরা তাঁর বিরোধী হয়েও এত দিন মুখ বুজে ছিলেন, তাঁরা এখন ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহসী হয়ে উঠবেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফল ইউরোপে ট্রাম্পের ডানপন্থী মিত্রদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিকদের আন্দোলনও কিছু অক্সিজেন জোগাবে। বিশেষ করে ব্রাজিলে বলসোনারোর পরাজয় এবং আমেরিকার নির্বাচনে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট নেতাদের বিজয় ইউরোপের চলমান ডান-বাম মেরুকরণকে প্রভাবিত করবে। 

তবে এমন ভাবা বেশ উচ্চাভিলাষী হবে, দলের নির্বাচনী বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ট্রাম্প তাঁর নীতিকৌশল থেকে সরবেন। রিপাবলিকানদের সে রকম ঐতিহ্য কম। আর স্বৈরশাসকেরা সাধারণত সংশোধন-অযোগ্য অবস্থাতেই বিদায় নেন। ফলে তাঁর শাসনামলের আগামী দুই বছরও তিনি বিশ্বের কোথাও না কোথাও বিপর্যয় ঘটিয়ে যাবেন—কিন্তু ইরান স্পষ্টত দেখাল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতি মোকাবিলাযোগ্য।

.

বিশ্বসমাজের জন্য এখন বিশেষভাবে দেখার পালা এই নির্বাচন ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব ফেলে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন: ‘সচেতনভাবে হোক বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে হোক, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ আসলে যুদ্ধের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।

এই রায়ের পরও যদি ট্রাম্প যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন, সেটা হবে তাঁর জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’ ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে আজ সংবাদ শিরোনাম ছিল: ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ে প্রধান কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।’ 

কথাটা মিথ্যা নয়। জনজীবনে যুদ্ধ কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তার বড় প্রমাণ কানসাসে ১৯৩২–এর পর এই প্রথম একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হলেন। নিঃসন্দেহে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এটা সিদ্ধান্তসূচক এক বার্তা।

● আলতাফ পারভেজ লেখক ও গবেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!