
দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব যখন দিন দিন বাড়ছে, ঠিক তখনই এই খাতের মূল লক্ষ্য ব্যাহত করার এক আত্মঘাতী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কিছু নীতিনির্ধারক ও আমলাদের বিশেষ উদ্যোগে দেশের ঐতিহ্যবাহী সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোকে (টিএসসি) ধীরে ধীরে জেনারেল কলেজের আদলে রূপান্তরের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে টিএসসিগুলোতে ঢালাওভাবে ‘নন-টেকনিক্যাল’ পদ বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে, যা নিয়ে উত্তরা মডেল টাউনসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কারিগরি শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল অভিযোগ অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলো টেকনিক্যাল ট্রেড ও আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষা। অথচ প্রস্তাবিত নতুন নিয়োগবিধি ও অর্গানোগ্রামে বাংলা, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও হিসাববিজ্ঞানের মতো পিওর ‘নন-টেকনিক্যাল’ বিষয়গুলোকে অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে রহস্যজনকভাবে এই বিষয়ভিত্তিক একাধিক ‘চীফ ইন্সট্রাক্টর (নন-টেক)’ পদ সৃষ্টির জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
উত্তরা এলাকার জ্যেষ্ঠ কারিগরি শিক্ষক এমদাদুল হক এর সাথে কথা বলে জানা যায়:
একটি টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানে মূল মেরুদণ্ড হলেন টেকনিক্যাল শিক্ষকেরা। ইন্সট্রাক্টর ও চীফ ইন্সট্রাক্টরদের মূল দায়িত্বের মধ্যে থাকে ব্যবহারিক ল্যাব ও ওয়ার্কশপ পরিচালনা, টুলস-ইকুইপমেন্ট ও কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেয়াদি শর্ট কোর্স করানো এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করা। পক্ষান্তরে নন-টেকনিক্যাল শিক্ষকদের কাজ মূলত তাত্ত্বিক ক্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে এত বিপুল সংখ্যক নন-টেক পদ সৃষ্টি কারিগরি শিক্ষার মূল আত্মাকেই ধ্বংস করে দেবে।
প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের পুরাতন ৬৪টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩৪টিতে দ্বিতীয় শিফট চালু রয়েছে। বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ৬৪টি প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বমোট ৬৪টি ‘চীফ ইন্সট্রাক্টর (নন-টেক)’ পদ বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত আশঙ্কাজনক তথ্য হলো প্রস্তাবিত নতুন অর্গানোগ্রামে এই পদের সংখ্যা প্রায় ৩ গুণ বাড়িয়ে ২০৪টি করার প্রস্তাব করা হয়েছে!
সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যেখানে দ্বিতীয় শিফট পুরো মাত্রায় সচল নেই এবং সীমিত কার্যপরিধি রয়েছে, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক উচ্চ পদের সৃষ্টি সরকারের ওপর বিশাল ও অপ্রয়োজনীয় আর্থিক বোঝা চাপাবে। এটি স্পষ্টতই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের শামিল।
কারিগরি শিক্ষক ফোরামের কেন্দ্রীয় একজন নেতা জানান: আধুনিকায়নের অভাব: কারিগরি শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নের জন্য এখন প্রয়োজন আধুনিক কারিকুলাম, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব ও যুগোপযোগী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা।
মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি: শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এভাবে নন-টেকনিক্যাল পদ বৃদ্ধি করা হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মূল লক্ষ্য ভেস্তে যাবে।
জেনারেল কলেজে রূপান্তরের চেষ্টা এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে কারিগরি কলেজগুলো সাধারণ ডিগ্রি কলেজের মতো তাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি।
সুনির্দিষ্ট আহ্বান
উত্তরাজুড়ে কর্মরত এবং দেশের সর্বস্তরের কারিগরি শিক্ষক নেতারা এই বিষয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা জোর দাবি জানিয়েছেন যে:
প্রস্তাবিত ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগবিধি ও অর্গানোগ্রাম অনতিবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে তবেই নতুন পদ সৃষ্টির সি
দ্ধান্ত নিতে হবে।