• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline

কেরানীগঞ্জে দুই খাল খননে অনিয়ম, মাটি বিক্রিতেও কোটি টাকার কারবার

Reporter Name / ২১ Time View
Update : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

ঢাকার কেরানীগঞ্জে সরকারি কর্মসূচির আওতায় দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও মাটি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের দীঘিরপাড় এবং রুহিতপুর ইউনিয়নের খারাকান্দি খাল খনন প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ ব্যয়, কাজের পরিমাণ ও ব্যাংক থেকে বিল উত্তোলনের হিসাব নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।নির্ধারিত অংশ খনন না করেই বিল উত্তোলন এবং দুই তীরের মাটি বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুটি খাল খননে মোট বরাদ্দ ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৭ হাজার ৩৬৬ টাকা। এর মধ্যে খারাকান্দি খাল খননে ১ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৪৭ টাকা এবং দীঘিরপাড় খালের জন্য ২ কোটি ১৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে খাল খননের শুরুতেই গত ৩০ জুলাই ১ কোটি ৬৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৯৭ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত জমা দেওয়া হয়েছে। দুটি খালের খননকাজের জন্য অবশিষ্ট থাকে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৬০ হাজার ৬৬৯ টাকা।কিন্তু খননকাজ শেষ হওয়ার আগেই গত ২৩ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত ১৩টি ভাউচারের মাধ্যমে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫৭ টাকা উত্তোলন করা হয়। সোনালী ব্যাংকের কেরানীগঞ্জ উপজেলা শাখা থেকে রিনভী এন্টারপ্রাইজের নামে এসব টাকা তোলা হয় বলে প্রাপ্ত নথিতে দেখা গেছে।তথ্য অনুযায়ী, খারাকান্দি খাল খনন কমিটির সভাপতি আউয়াল শিকদার পেয়েছেন ৫৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে দীঘিরপাড় খালে ভেকু, এক্সকাভেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ভাড়াবাবদ এন জাহান ট্রেডের মালিক জাহিদ হোসেন পেয়েছেন ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই দুই খাতে ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে ১ কোটি ৭ লাখ টাকার। অথচ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫৭ টাকা। ফলে অবশিষ্ট ৪৮ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫৭ টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।খারাকান্দি খালটি কেরানীগঞ্জ মডেল থানার রুহিতপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। গুয়াডুরি-আকছাইল-নিলটেক-খারাকান্দি-বেলনা-ইস্পাহানি কলেজ হয়ে গোয়ালখালী পর্যন্ত খালটির খননকাজের উদ্বোধন হয় গত ১৬ মার্চ। সরকারি হিসাবে খালটির ৪.৬৩ কিলোমিটার খনন সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে খালের বিভিন্ন অংশে প্রত্যাশিত খননকাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। রামের কান্দা কালভার্টের দক্ষিণ দিকে রুহিতপুরকাঁচা পর্যন্ত ৫ হাজার ট্রাক মাটি বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি ১০০ ঘনফুট ধারণক্ষমতার মাহিন্দ্র ট্রাকের মাটির দাম ১,২০০ টাকা হিসাবে এখান থেকে ৬০ লাখ টাকার মাটি বিক্রি করা হয়েছে। যেখানে মাটি নেই, সেখানে খননকাজে হাত দেওয়া হয়নি।খালের সীমানায় ইস্পাহানি কলেজের পশ্চিম পাশে সাততলা ভবন এবং মোহাম্মদ আলীর একতলা ভবনের মার্কেট উচ্ছেদ করা হয়নি। টাকার বিনিময়ে ভবন দুটি এখনো খালের সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয়দের দাবি, খাল খননের পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে দুই তীরের মাটি কেটে বিক্রি করা হয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, খারাকান্দি খালের মাটি বিক্রি করে ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।খারাকান্দি খাল খনন কমিটির সভাপতি ও কলাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আউয়াল শিকদার দাবি করেন, তিনি খননকাজ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কাজের পরিমাণ ছিল চার কিলোমিটার, কিন্তু তিনি পাঁচ কিলোমিটার খনন করেছেন। তিনি ৫৯ লাখ টাকা বিল নিয়েছেন।দুটি খালের খনন প্রকল্পে দেড় কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করা হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে আউয়াল শিকদার বলেন, বিলের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তার নিজের কোনো কোম্পানি নেই। পাঁচ সদস্যের কমিটিতে তিনি শুধু সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি কার্যাদেশ, কার্যসম্পাদন সনদ, ঠিকাদারি চুক্তি, মাপবই এবং বিল পরিশোধের নথি—কোনো কিছুই তার কাছে নেই।অন্যদিকে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের দীঘিরপাড় খালের নির্ধারিত দৈর্ঘ্য ৭.৫০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬.৪০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে বলে দাবি করছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। তবে এই খাল থেকেও ২০ লাখ টাকার মাটি বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে খেজুরবাগ কবরস্থান কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, কবরস্থান উঁচু করার জন্য তারা দীঘিরপাড় খালের মাটি কিনেছেন। প্রতি ১০০ ঘনফুট ধারণক্ষমতার মাহিন্দ্র ট্রাকের মাটির দাম দিয়েছেন ১,২০০ টাকা। একটি সূত্রের দাবি, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি লিয়াকত হোসেন রিপন প্রায় ১৪ লাখ টাকার মাটি কিনেছেন।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুটি খাল খননের সরকারি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রিনভী এন্টারপ্রাইজকে। এর মালিক নাজিমুদ্দিন ভাসানী সানি জানান, তার প্রতিষ্ঠানের নামে খাল খনন ও মাটি বিক্রির দরপত্র করা হয়েছে। কিন্তু তাকে খননকাজ দেওয়া হয়নি। প্রকৃতপক্ষে কাজ করেছেন এন জাহান ট্রেডার্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহিদ হাসান, কলাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আউয়াল শিকদার এবং অনিক নামের এক ভেকুচালক।তিনি অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাশেদ খান তার কাছ থেকে বিভিন্ন তারিখে ১৩টি ভাউচারের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫৭ টাকার বিল-সংক্রান্ত ভাউচার নিয়ে খাল খননের টাকা উত্তোলন করেছেন।মাটি বিক্রিতেও অনিয়মের অভিযোগমাটি বিক্রির দরপত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত ৬ আগস্ট ইউএনও স্বাক্ষরিত দরপত্রে খাল দুটির অতিরিক্ত মাটি অপসারণের জন্য কোটেশন আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পিআইও রাশেদ খান এন জাহান ট্রেড ও রিনভী এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে গোপনে তিনটি করে কোটেশন সংগ্রহ করেন। পরে খারাকান্দি খালের অতিরিক্ত মাটি অপসারণের কাজ ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকায় এবং দীঘিরপাড় খালের কাজ ৩ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেখানো হয়। ভ্যাট ও আয়করসহ এ বাবদ যথাক্রমে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫০ ও ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।এ ব্যাপারে রিনভী এন্টারপ্রাইজের মালিক নাজিমুদ্দিন ভাসানী জানান, তার প্রতিষ্ঠানের নামে খারাকান্দি খাল খনন ও মাটি বিক্রির দরপত্র আহ্বান করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। ২ লাখ টাকার দরপত্র দেখিয়ে ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকার মাটি বিক্রি করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার দাবি, ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি এবং তাকেও কোনো টাকা দেওয়া হয়নি।এন জাহান ট্রেডের মালিক জাহিদ হোসেন জানান, তিনি দীঘিরপাড় খাল খননে এক্সকাভেটর, ভেকু ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ভাড়াবাবদ ৪৮ লাখ টাকার বিল পেয়েছেন। তার নামে মাটি বিক্রির দরপত্রের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তার নামে দরপত্র কিনে শিডিউল জমা দিয়েছেন। কত টাকার মাটি বিক্রি হয়েছে, তা তার জানা নেই।এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রাশেদ খান আমার দেশকে বলেন, ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা টাকা থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাদ দিলে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা থাকে। এছাড়া তিনি ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সরকারি দরপত্র অনুযায়ী মাটি বিক্রি হয়েছে এবং মাটি বিক্রির টাকা খাল খননের ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উমর ফারুক জানান, খাল খননে অনিয়মের বিষয়ে এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তি তার কাছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তিনি বিষয়টি ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমকে জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!