• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৭ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline

আট দিন ধরে পাহাড়ে বন্দি, উদ্ধার জিম্মিদের বর্ণনায় নির্যাতনের চিত্র

Reporter Name / ১৬ Time View
Update : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জিম্মিকে টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করেছে যৌথবাহিনী। গতকাল শুক্রবার সকালে তাদের থানায় নেওয়া হয়। উদ্ধার ব্যক্তিদের কাছ থেকে মানব পাচারচক্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের কেউ জানিয়েছেন, তাদের আট দিন ধরে গহিন পাহাড়ে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। আবার কাউকে লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পাচারচক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে তদন্ত শুরু হয়েছে।এদিকে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় টেকনাফজুড়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। গতকাল জুমার নামাজের পর বিভিন্ন স্থানে ছাত্র প্রতিনিধিরা মানববন্ধনও করেন।আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকালে হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। এ সময় একটি পিস্তল, একটি দেশে তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। অভিযানে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন (রামু ক্যান্টনমেন্ট), বিজিবি ও পুলিশ অংশ নেয়।টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ে অভিযানের সময় গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।‘আট দিন পাহাড়ে বন্দি ছিলাম’টেকনাফ থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, মানব পাচারকারীরা তাকে টানা আট দিন পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।আসাদুজ্জামান বলেন, কক্সবাজারের একটি সেতুতে চাকরির সময় উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের ইমামুল নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে সম্পর্ক গড়ে উঠলে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাকে সেখানে ডেকে নেওয়া হয়।তিনি জানান, সেখানে পৌঁছানোর পর তার মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।আসাদুজ্জামান বলেন, পাহাড়ে গিয়ে তিনি দেখেন, তার মতো আরো অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।লাখ টাকায় বিক্রিপাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর বলেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূর আলী নামে এক দালাল তাদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তারা দুজনকে এক লাখ টাকায় কিনেছে। তারা আরো বলেন, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হচ্ছিল। কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে ব্যাপক মারধর করা হতো। আমরাও পালানোর চেষ্টা করায় মারধরের শিকার হয়েছি। পরে আমাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাদের ভাষায়, দিনে মাত্র দুবেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা লাউ আর ডাল। ক্ষুধায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়েছিল।বৃহস্পতিবার আমাদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের কথা ছিল। এর আগেই যৌথবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে। পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবিহ্নীলার স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন। না হলে মানব পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে সশস্ত্র অস্ত্রধারীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এসব আস্তানা নির্মূলে একযোগে সাঁড়াশি অভিযানের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিনদিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। তিনি বলেন, এখানে সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অসহায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান অত্যন্ত জরুরি। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারো পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা। টেকনাফে ৩ লাশ উদ্ধারের চেষ্টাকক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলায় সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথবাহিনীর গোলাগুলির ঘটনায় পাহাড়ে চলছে যৌথবাহিনীর টহল অভিযান। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।এদিকে হ্নীলা ইউনিয়নে নয়াপাড়া ও লেদা ক্যাম্পে পূর্বে পাহাড়ের ঝিরিতে অজ্ঞাত তিনজনের লাশ পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। লাশগুলো উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।টেকনাফ মডেল থানার ওসি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওই পাহাড়ে তিনজনের লাশ থাকার খবর পেয়েছেন তারা। লাশ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। রাতে সম্ভব না হলে সকালে উদ্ধার করা হবে। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল অব্যাহত রয়েছে।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!