• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

বরফ কীভাবে পানীয় ঠান্ডা করে

Reporter Name / ১৬ Time View
Update : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬

গরমের দিনে এক গ্লাস লেবুর শরবত সামনে রাখা আছে। তাতে কয়েক টুকরা বরফ ছেড়ে দিলে। একটু পর দেখা গেল, বরফগুলো ছোট হয়ে এসেছে, কিন্তু শরবত হয়েছে ঠান্ডা। বরফ তো ঠান্ডাই, কিন্তু শরবত ঠান্ডা করতে গিয়ে বরফের কী লাভ হলো? আর বরফ গলে পানিতে বা পরিণত হয় কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের যেতে হবে একটু তাপ ও শক্তির গল্পে। বরফ শরবতকে ঠান্ডা করতে শুধু নিজের ঠান্ডা ভাব ছড়িয়ে দেয় না, বরং শরবত থেকেই শক্তি শুষে নেয়। এই শক্তি আদান-প্রদানের কারণেই পানীয় ঠান্ডা হয়, আর বরফ ধীরে ধীরে গলে যায়।

বরফের তাপ কোন দিকে যায়

প্রথমে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। তাপ আর তাপমাত্রা এক জিনিস নয়। তাপমাত্রা দিয়ে বোঝা যায় কোন বস্তু কতটা গরম বা ঠান্ডা। আর তাপ হলো এমন শক্তি, যা তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে যায়।

যেমন চুলায় বসানো পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে ফ্রিজ থেকে বের করা বরফের তাপমাত্রা পানির চেয়ে অনেক কম। তাহলে গরম পানিতে বরফ দিলে কী হবে?

গরম পানি থেকে বরফের দিকে শক্তি যেতে শুরু করবে। কারণ, স্বাভাবিকভাবে বেশি তাপমাত্রার বস্তু থেকে কম তাপমাত্রার বস্তুর দিকে তাপ প্রবাহিত হয়। তাই গরম চা বরফকে শক্তি দেয় আর বরফ সেই শক্তি গ্রহণ করে। চায়ের তাপমাত্রা কমে যায়, বরফ গলতে থাকে।

এই ঘটনাকে বলে তাপ সঞ্চালন। সহজ করে বললে, গরম বস্তু ঠান্ডা হয় আর ঠান্ডা বস্তু গরম হতে থাকে। দুটির তাপমাত্রা সমান না হওয়া পর্যন্ত এই আদান-প্রদান চলতে পারে।

তবে একটা কথা মনে রেখো, সব সময় বরফ গললেই পানীয়ের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে না। কতটা বরফ দেওয়া হয়েছে, পানীয় কতটা গরম ছিল; এসবের ওপর ফল নির্ভর করে। বরফ যথেষ্ট থাকলে এবং কিছু বরফ গলে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকলে, স্বাভাবিক চাপে মিশ্রণটি প্রায় শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকতে পারে।

.কাজাখস্তানের নদীতে বরফ ভাঙতে ডিনামাইট লাগছে.

তাপমাত্রা আর শক্তি কি একই জিনিস

এক কাপ গরম চায়ের কথা ভাবো। ধরো চায়ের কাপটা বিশাল এক হিমবাহের ওপর রাখা। চায়ের তাপমাত্রা অনেক বেশি, আর হিমবাহের তাপমাত্রা অনেক কম। কিন্তু হিমবাহে থাকা মোট শক্তির পরিমাণ এক কাপ চায়ের চেয়ে অনেক বেশি।

কেন? কারণ, হিমবাহে পানির কণার সংখ্যা অসংখ্য। প্রতিটি কণার কিছু শক্তি আছে। সব কণার শক্তি মিলিয়ে মোট শক্তির পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে যায়। অন্যদিকে এক কাপ চায়ে কণার সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

পানি বা অন্য কোনো পদার্থ আসলে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি। এই কণাগুলো সব সময় নড়াচড়া করে। সাধারণভাবে, কোনো পদার্থের তাপমাত্রা যত বেশি, তার কণাগুলোর গড় গতিশক্তিও তত বেশি হয়। গরম চায়ের কণাগুলো তাই বরফের কণার তুলনায় গড়ে বেশি শক্তি নিয়ে নড়াচড়া করে।

চায়ের সঙ্গে বরফের সংস্পর্শ ঘটলে চায়ের কণা আর বরফের পৃষ্ঠের কণার মধ্যে শক্তির আদান-প্রদান হয়। চায়ের কণাগুলো শক্তি হারায়, বরফের কণাগুলো শক্তি পায়। এই কারণেই চায়ের তাপমাত্রা কমে এবং বরফের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।

বরফ গলতে বাড়তি শক্তি লাগে কেন

এখানেই আসল মজা। বরফের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পরও যদি সেটি আরও শক্তি পায়, তাহলে সেই শক্তি দিয়ে তাপমাত্রা যে আরও বাড়তেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং শক্তির একটা বড় অংশ বরফকে কঠিন অবস্থা থেকে তরল পানিতে পরিণত করতে কাজে লাগে।

বরফের ভেতরে পানির অণুগুলো একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে থাকে। তাই বরফ শক্ত। বরফ গলতে শুরু করলে অণুগুলোর এই বিন্যাস বদলায়। বরফকে তরল পানিতে পরিণত করতে যে শক্তি লাগে, সেটি পদার্থের অবস্থা পরিবর্তনে ব্যবহৃত হয়। এ সময় বরফের তাপমাত্রা প্রায় একই থাকে।

একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। বরফের টুকরো যদি শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকে, তাহলে সেটিকে আরও শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের পানিতে পরিণত করতেও শক্তি দিতে হবে। শক্তি পাওয়া মানেই যে তাপমাত্রা বাড়বে, তা নয়। মাঝেমধ্যে সেই শক্তি পদার্থের অবস্থা বদলাতেও কাজে লাগে।

এ জন্যই বরফ গলতে গলতে অনেক তাপ শুষে নিতে পারে। পানীয় থেকে এই শক্তি চলে যায় বলে পানীয় ঠান্ডা হয়।

.অ্যান্টার্কটিকা থেকে সব বরফ সরিয়ে ফেললে কেমন দেখাবে পৃথিবী.

শক্তি কি হারিয়ে যায়

না। শক্তি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে, আবার একধরনের শক্তি থেকে অন্য ধরনের শক্তিতেও বদলে যেতে পারে। কিন্তু মোট শক্তি তৈরি বা ধ্বংস হয়ে যায় না। প্রকৃতির এই নিয়মকে বলে শক্তির নিত্যতা সূত্র।

একটা পাথর পাহাড়ের ওপর পড়ে আছে। সেখান থেকে গড়িয়ে নিচে নামতে শুরু করলে তার অবস্থানের কারণে শক্তি গতিশক্তিতে রূপ নেয়। পাথরটি মাটিতে আঘাত করলে সেই শক্তির কিছু অংশ শব্দ ও তাপ তৈরি করতে পারে। শক্তি হারিয়ে যায়নি; তার রূপ বদলেছে।

বরফ আর পানীয়ের ক্ষেত্রেও শক্তির হিসাবটা এমনই। গরম পানীয় যে শক্তি হারায়, বরফ সেই শক্তির কিছুটা গ্রহণ করে। সেই শক্তির এক অংশ বরফের তাপমাত্রা বাড়ায়, আর বরফ গলতে শুরু করলে শক্তির বড় অংশ বরফকে পানিতে পরিণত করতে কাজে লাগে।

ঠান্ডা পানীয় বেশিক্ষণ ঠান্ডা থাকে না কেন

বরফ দেওয়া শরবত টেবিলে রেখে দিলে কিছুক্ষণ পর সেটি আবার গরম হতে শুরু করে। কক্ষের বাতাস শরবতের চেয়ে উষ্ণ থাকে। গ্লাসটা হাতে ধরলেও হাত থেকে তাপ শরবতে যেতে পারে। ফলে চারপাশ থেকে শক্তি পেয়ে বরফ আরও গলে যায়। বরফ শেষ হয়ে গেলে পানীয়ের তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

তাই গরমের দিনে ঠান্ডা পানীয়ের স্বাদ নিতে চাইলে বরফ দিয়ে বেশিক্ষণ ফেলে রেখো না। আর গ্লাসে বরফের টুকরা ঘুরতে দেখলে বুঝবে, বরফ পানীয় থেকে শক্তি শুষে নিচ্ছে।

সূত্র: দ্য কনভার্সেশন

.বৃষ্টির মতো আকাশ থেকে কুয়াশা পড়ছে, এরপর কি বরফ পড়বে

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!