
রাজধানীর অভিজাত ও আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত উত্তরায় অভিনব কায়দায় ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ পেতে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সর্বস্বান্ত করছে একটি সংঘবদ্ধ ব্ল্যাকমেইলিং সিন্ডিকেট। চক্রের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ইতিমধ্যেই কোটি কোটি টাকা খুইয়েছেন বহু ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ চাকুরিজীবী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। ইজ্জত ও সামাজিক মান-সম্মানের ভয়ে ভুক্তভোগীদের অনেকেই বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে নীরবে লাখ লাখ টাকা দিয়ে আপস করছেন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনও পর্যন্ত এই চক্রের মূল হোতা বা কোনো সদস্যকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। ফলে দিন দিন এই চক্রের বেপরোয়া মনোভাব ও অপরাধের ব্যাপ্তি আরও বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের সদস্যরা মূলত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে জাল বিছায়। প্রথমে তারা টার্গেট করা ব্যক্তিদের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে। এরপর সুসম্পর্ক গড়ে তুলে কৌশলে তাদের উত্তরার বিভিন্ন বিলাসবহুল বা ছদ্মবেশী ফ্ল্যাটে ডেকে এনে জিম্মি করা হয়।
ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রটির অপরাধের ধরন অত্যন্ত পেশাদার ও সুপরিকল্পিত। পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
চক্রের তরুণী সদস্যরা প্রথমে ধনাঢ্য ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। এরপর নিয়মিত চ্যাটিং ও মিষ্টি কথার আড়ালে গভীর প্রেমের সম্পর্ক বা ব্যবসায়িক পার্টনারশিপের মায়াজাল তৈরি করে। সম্পর্ক কিছুটা গভীর হলে ডেটিং, কফি খাওয়া বা একান্ত সময় কাটানোর অজুহাতে ভুক্তভোগীকে উত্তরার কোনো নির্জন বা সাবলেট নেওয়া ফ্ল্যাটে নিয়ে আসা হয়। ফ্ল্যাটে প্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা চক্রের বাকি পুরুষ সদস্যরা সেখানে আচমকা হানা দেয়। তারা নিজেদের ‘ডিবি পুলিশ’, ‘ক্রাইম রিপোর্টার’ বা ওই তরুণীর ‘ভাই ও স্বজন’ পরিচয় দিয়ে ঘরে চড়াও হয় এবং ভুক্তভোগীকে মারধর শুরু করে।
এরপর অস্ত্রের মুখে ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক নগ্ন করে ওই তরুণীর সাথে আপত্তিকর পোজ দিতে বাধ্য করা হয় এবং মোবাইল ও প্রফেশনাল ক্যামেরায় ভিডিও ও ছবি ধারণ করা হয়।
মানসম্মানের ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই চক্রের শিকার হওয়া উত্তরা এলাকার এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ী কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন:
ফেসবুকে পরিচয়ের পর ওই মেয়েটি আমাকে উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে কফি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। একজন সাধারণ বন্ধু হিসেবে সরল বিশ্বাসে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফ্ল্যাটে ঢোকার ১০ মিনিটের মধ্যেই হঠাৎ ৩-৪ জন যুবক দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে এবং নিজেদের ডিবি পুলিশ বলে পরিচয় দেয়। তারা এসেই আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে পিস্তল ঠেকিয়ে জোর করে আমার সব কাপড় খুলে ফেলে। এরপর ওই মেয়ের সাথে আমাকে আপত্তিকর পোজ দিতে বাধ্য করে এবং মোবাইলে ভিডিও ও ছবি তুলে নেয়।
তিনি আরও বলেন,তারা আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এখনই ২০ লাখ টাকা না দিলে এই ভিডিও আমার স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। লোকলজ্জা ও সামাজিক সম্মানের ভয়ে আমি আমার এক বন্ধুকে জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে রাতেই বিকাশের মাধ্যমে ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তাৎক্ষণিক ১০ লাখ টাকা ওদের হাতে তুলে দিই। বাকি টাকার জন্য তারা প্রতিনিয়ত আমাকে ফোন দিয়ে নানা হুমকি দিচ্ছিল। আমি মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে, একপর্যায়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলাম। পরে পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ সদস্যের পরামর্শে সাহস করে পুলিশের দ্বারস্থ হই।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ভিডিও ধারণের পর শুরু হয় আসল খলনায়কদের দীর্ঘমেয়াদী খেলা। ধারণকৃত আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভুক্তভোগীর কর্মক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে প্রতিনিয়ত কিস্তিতে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। একবার টাকা দেওয়ার পরও ব্ল্যাকমেইল থামে না; বরং ভিডিও ডিলিট করার বাহানায় দফায় দফায় টাকা চাওয়া হয়। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী নিজের জমানো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে, এমনকি গাড়ি-জমি বন্ধক রেখে বা পানির দামে বিক্রি করেও এই চক্রকে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। চক্রটি এখনও অধরা থাকায় উত্তরা ও এর আশেপাশের এলাকায় নতুন নতুন ব্যক্তি প্রতিনিয়ত এই ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সম্প্রতি এই চক্রের শিকার এক ব্যবসায়ীর সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো সিন্ডিকেটের সন্ধানে এবং তাদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে মাঠে নেমেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অপরাধীদের প্রযুক্তিগত অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এই চক্রের গোপন তৎপরতা এবং পুলিশের বর্তমান পদক্ষেপ প্রসঙ্গে ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মির্জা তারেক আহমেদ বেগ বলেন:এটি একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং চতুর ব্ল্যাকমেইলিং চক্র। তারা দীর্ঘদিন ধরে উত্তরা এলাকার বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও গেস্ট হাউসকে কেন্দ্র করে এই ‘হানি ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। চক্রটির কয়েকজন সদস্যের সুনির্দিষ্ট প্রোফাইল এবং ব্যবহৃত কিছু মোবাইল নম্বর আমাদের হাতে এসেছে। অপরাধীদের বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের কয়েকটি বিশেষ টিম একযোগে কাজ করছে।
সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে কড়া সতর্কবার্তা ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন:সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত কারও ফাঁদে পা দেওয়ার আগে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে। সস্তা আবেগ বা কফি খাওয়া ও আড্ডার নামে হুট করে কারও দেওয়া ঠিকানায় বা অপরিচিত কোনো ফ্ল্যাটে চলে যাওয়া বড় ধরনের জীবননাশের কারণ হতে পারে। অপরাধী চক্র ভাবছে মান-সম্মানের ভয়ে কেউ মুখ খুলবে না, কিন্তু আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভুক্তভোগীদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে কাজ করছে। কাউকে এখনো গ্রেফতার করা না গেলেও, আমাদের জাল বিছানো রয়েছে; খুব দ্রুতই এই চক্রের সবাইকে গ্রেফতার করে কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।