• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

যে গল্পের নায়িকা আমার মা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

ঈদের ঠিক আগের দিন, যেদিন আমাদের বাবা মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়, তখন সালটা ২০১২, বাড়িতে আমরা তিন ভাই–বোন আর আমার মা।

আমি সেবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছি, আর আমার ছোট দুই বোনের একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী আর অন্যজন ক্লাস টুয়ের ছাত্রী।

গল্পটা যতটা না আমাদের নিয়ে, তার চেয়ে বেশি আমাদের মাকে নিয়ে। মায়ের বয়স তখন কত হবে, ৩৮ বা ৩৯ বছর। সঙ্গে সরকারি চাকরি করা আমার বাবার পেনশনের অল্প কিছু টাকা আর আমরা তিন ভাই–বোনকে নিয়ে আমাদের মায়ের নতুন করে জীবনের এক কঠিন যাত্রা শুরু।

গল্প বলতে গেলে অনেক কিছুই চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে, এরপর একটু একটু করে গুছিয়ে আমার বাবার বলা শেষ কথাটা, যেটা তিনি তাঁর সেক্টর কমান্ডারকে বলেছিলেন, ‘স্যার, আমার সন্তানদের দেখে রাখতে বলবেন আমার স্ত্রীকে।’ সেটাকে মূলমন্ত্র মেনে আমার মা এতগুলো বছর পাড়ি দিয়েছেন।

.

অনেক মানুষের কাছে থেকে অনেক ধরনের কথা শুনেও উনি দমে থাকেননি, আমার মা নিজের মহিমায় জীবনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

তাঁর দুই মেয়ের বড় মেয়ে মাস্টার্স শেষ করে এখন ঢাকায় পুরোদস্তুর সংসারী, স্বামী চাকরির কথা বললেও তাঁর দুই সন্তান ও সংসারের দিকেই মনোনিবেশ করেছেন। স্বামীও বাংলাদেশের একটা স্বনামধন্য প্রাইভেট কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে আছেন।

আর ছোট মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন এবং তাঁকেও যথারীতি বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর স্বামীও বাংলাদেশের একটা সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করছেন।

আর সব শেষে তাঁর বড় ছেলে আমি নিজে বস্ত্রপ্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে একটা বহুজাতিক কোম্পানির সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল ম্যানেজার হিসেবে চায়নায় কর্মরত আছি।

.

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

.

এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্যে হলো, আজকের এই জায়গায় আসতে মাঝখানে আমার মায়ের কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪টি বছর। একা একাই যুদ্ধ করেছেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের একটা সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে দিয়েছেন এবং সর্বপরি আমাদের ঘিরে আর আমাদের বাবার শেষ কথাটিকে আগলে রেখে জীবন পার করে দিচ্ছেন।

সফলতার কি সংজ্ঞা হয়, সেই বইয়ের ভাষা আমার মা না জানলেও আমার চোখে মনে হয়, আমার মা তাঁর যুদ্ধে জয়ী সফল একজন নারী।

বাবা মারা যাওয়ার পরে স্কুলে চাকরি করেছেন সংসার চালানোর জন্য। তিনি নিজে এবং আমার বোনেরাও কষ্ট করেছেন আমাকে পড়াশোনা করানোর জন্য, সেটা আসলে কখনোই ভোলার নয়।

প্রায় মাসখানেক আগে ভিসা পেয়ে আমার মা আমাদের কাছে চায়নায় বেড়াতে এলেন, জীবনের প্রথম বিমানযাত্রা; নতুন দেশ, অপরিচিত ভাষা, অপরিচিত মানুষ আর এই ভিড়ের মধ্যে কেবল পরিচিত তাঁর ছেলের মুখ।

.

আমার মাকে আমি এখানকার সমুদ্র দেখিয়েছি, পাহাড় দেখিয়েছি। তাঁর চোখমুখের আনন্দ দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, আমার মায়ের গত ১৪ বছরের কষ্টের পরের হাসি। আর আমার সফলতা ওইটুকুর মধ্যেই।

মধ্যবিত্তদের কাছে এতটুকুই স্বপ্নই হয়তো থাকে যে একদিন আমার মা কিংবা বাবাকে পৃথিবী দেখাব। ছোটবেলার সেই আজন্মলালিত স্বপ্ন, জানি যে আমার বাবাকে নিয়ে পূরণ করতে পারব না, কিংবা এত বড় পৃথিবীর সবটুকুও আমার মাকে হয়তো দেখানো সম্ভব নয়; কিন্তু এই যে স্রষ্টা এতটুকু করতে দিয়েছেন, এখানেই আমার জীবনের সার্থকতা। আমার প্রাপ্তি।

স্রষ্টা আমার মাকে শতবছরের আয়ু দিন, আর এই ভালোবাসায় যেন ভরে থাকে তাঁর বাকিটা জীবন।

*সাজ্জাদুল ইসলাম তুষার, সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল ম্যানেজার ,টিবি গ্রুপ

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!