• রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

‘ওই যে আর ডি বর্মনের বাপ যাচ্ছে!’

Reporter Name / ১০ Time View
Update : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

ছেলেকে নিয়ে শচীনকর্তার নানা অভিযোগ। ছেলে নাকি শুয়ে-বসে সময় কাটায়! শরীরচর্চায় মন নেই। নিজে অবশ্য চলতেন কড়া নিয়ম মেনে। গোছানো জীবনযাপন ছিল। প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বেরোতেন। ছেলেকেও সেই অভ্যাসে আনতে চাইতেন। বকাঝকাও করতেন। এমনই এক সকালে জুহুতে হাঁটতে বেরিয়েছেন শচীনকর্তা। পথে তাঁকে দেখে একজন বলে উঠলেন, ‘ওই যে আর ডি বর্মনের বাপ যাচ্ছে!’

.

কথাটি শুনে আনন্দে ভরে উঠল বাবার মন। বাড়ি ফিরে ছেলেকে শোনালেন ঘটনাটি। এত দিন মানুষ তাঁকে চিনেছে এসডি বর্মন হিসেবে। আজ চিনেছে আর ডি বর্মনের বাবা বলে। ছেলের এই পরিচিতি তাঁকে গর্বিত করেছিল।

.

ছোট কর্তা রাহুল দেববর্মন নিজেই ঘটনাটি বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে। ১৯৮৪ সালের সংখ্যার ‘ফিল্মফেয়ার’-এ প্রকাশিত কথোপকথনেও পাওয়া যায় ছেলের পরিচয়ে বাবার আনন্দিত হওয়ার স্মৃতি। নিজের বিপুল খ্যাতির পাশে সন্তানের পরিচয়টিও সেদিন সানন্দে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

.

আজ আপনাদের শোনাব সেই মানুষটির কথা। বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে যিনি শচীনকর্তা। শচীন দেববর্মন। হিন্দি সিনেমার ‘দাদা বর্মন’। সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গায়ক—তিন পরিচয়েই রেখে গেছেন স্বতন্ত্র ছাপ। তাঁর সুরে ধরা দিয়েছে প্রেম ও বিরহ। মিশে থেকেছে বাংলার নদী আর মাটির টান।

.

আজ তাঁকে ফিরে দেখার বিশেষ উপলক্ষও আছে। আজ ৩১ অক্টোবর তাঁর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এই দিনে মুম্বাইয়ে মারা যান তিনি। বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।

.জন্মদিনে জানা–অজানা শচীন দেববর্মন.

রাজপরিবারের সন্তান, সুরে বাংলার মাটি
জন্ম রাজপরিবারে। কিন্তু তাঁর সুরের অনেকখানি জুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের জীবন। শচীন দেববর্মনের জন্ম ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর, কুমিল্লায়। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সদস্য। মা নির্মলা দেবী মণিপুরের রাজকন্যা। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে বিএ পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যান শচীন। তবে এমএ শেষ করেননি। সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা।
লোকগানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় শৈশবেই। সেই শিক্ষকদের সবাই নামকরা ওস্তাদ ছিলেন না। তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়, বাড়ির প্রবীণ সহায়ক মাধবের কণ্ঠে শুনতেন রামায়ণের কাহিনিনির্ভর গান। আর মাছ ধরার সঙ্গী আনোয়ার দোতারা বাজিয়ে গাইতেন ভাটিয়ালি। চারপাশের মানুষের মুখে শোনা এসব সুর তাঁর সংগীতবোধ গড়ে তুলেছিল।
পরে কৃষ্ণচন্দ্র দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ বাদল খাঁ ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো গুণীজনের কাছে তালিম নেন। লোকসুরের সহজ আবেদন আর শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষা এভাবেই মিলেছিল তাঁর মধ্যে।

.

সেই দুই ধারার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর প্রথম রেকর্ডেও। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে প্রকাশিত হয় ৭৮ আরপিএমের ডিস্কটি। এক পিঠে ছিল হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা ‘ডাকলে কোকিল রোজ বিহানে’। অন্য পিঠে শৈলেন রায়ের ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়’। একটি লোকসুরভিত্তিক, অন্যটি রাগপ্রধান। সুরকার ও গায়ক—দুই ভূমিকাতেই ছিলেন শচীন দেববর্মন। প্রথম রেকর্ডেই যেন ধরা পড়েছিল তাঁর পরবর্তী সংগীতজীবনের পথরেখা।

.

পরে হিন্দি চলচ্চিত্রের ব্যস্ত জগতে প্রতিষ্ঠা পেলেও এই শিকড় থেকে সরে যাননি। লোকগানকে নিজের সুরের ভাষায় মিশিয়ে নিয়েছিলেন। তাই তাঁর সৃষ্টিতে নদীর টান, বিচ্ছেদের আকুতি আর দূরের মানুষের জন্য অপেক্ষা এত স্বাভাবিকভাবে আসে। শহুরে প্রেমের দৃশ্যেও কখনো শোনা যায় বাংলার মেঠো সুরের প্রতিধ্বনি।

.সুরে–ছন্দে অপার বিস্ময় রাহুল দেববর্মন.

যে কণ্ঠ সহজেই চেনা যায়
শচীনকর্তার গান শুনে তাঁকে চিনতে বেশি সময় লাগে না। কণ্ঠের তীক্ষ্ণ টান, উচ্চারণে পূর্ববঙ্গের ছাপ আর সুরের বাঁকে লোকগানের রেশ তাঁকে আলাদা করে দেয়। তাঁর গায়কিতে শব্দগুলোও বিশেষ গুরুত্ব পায়। কখনো একটি শব্দ দীর্ঘ করে টানেন। কখনো ছোট্ট বিরতি দিয়ে পরের কথাটির আকুতি বাড়িয়ে তোলেন। শুনতে শুনতে মনে হয়, দূরের কেউ একান্ত মনের কথা জানাচ্ছেন।
‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’ গানটিতে এই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। কণ্ঠের টান আর সুরের ওঠানামায় ফুটে ওঠে মনের অস্থিরতা। বাঁশির প্রতি অনুযোগের মধ্যেও তার আকর্ষণ এড়াতে না পারার অসহায়ত্ব শোনা যায়। তাঁর গাওয়া গানটির আবেদন তাই সুরের মাধুর্যের পাশাপাশি কথার অভিব্যক্তিতেও। অভিমান, আকুলতা ও সমর্পণ একসঙ্গে ধরা দেয় সেই উচ্চারণে।

.

হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ প্রায়ই পেয়েছে গল্পের ভাষ্যকারের ভূমিকা। ১৯৬৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বন্দিনী’র শেষ পর্বে শোনা যায় ‘ও রে মাঝি, মেরে সাজন হ্যায় উস পার’। শৈলেন্দ্রর লেখা, শচীনকর্তার সুর করা ও গাওয়া গানটিতে ভাটিয়ালির আবহ প্রবল। মাঝির প্রতি ডাকের মধ্যে মিশে যায় প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর আকুতি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের টানাপোড়েনকে গানটি আরও গভীর করে তোলে। তাঁর কণ্ঠ যেন চরিত্রের না-বলা কথাগুলোই শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়।
আবার ১৯৬৫ সালের ‘গাইড’-এর শুরুতে ‘ওয়াহাঁ কৌন হ্যায় তেরা’ গানটি অন্য এক অনুভূতি তৈরি করে। শৈলেন্দ্রর কথায়, নিজের সুরে গানটি গেয়েছিলেন শচীনকর্তা। এখানে তাঁর কণ্ঠে আছে এক উদাস জিজ্ঞাসা। পথিককে সম্বোধন করলেও সেই প্রশ্ন যেন পৌঁছে যায় দর্শকের কাছেও। গল্পের শুরুতেই গানটি একাকিত্ব ও জীবনের অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করে দেয়।
এই গানগুলোয় বোঝা যায়, চলচ্চিত্রে শচীনকর্তার কণ্ঠ কেন এত কার্যকর। পর্দার দৃশ্যের সঙ্গে তাঁর গান চলে, আবার সেই দৃশ্যের বাইরেও ভাবনার জায়গা তৈরি করে। লোকগানের চেনা টান নিয়ে তিনি পৌঁছে যান মানুষের গভীর অনুভূতির কাছে। তাই গান শেষ হলেও কণ্ঠের সেই ডাক মনে থেকে যায়।

.

হিন্দি সিনেমায় সুরের বিস্তার
বাংলা গান ও চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে শচীনকর্তা পা রাখেন হিন্দি সিনেমায়। সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ‘শিকারি’ মুক্তি পায় ১৯৪৬ সালে। পরের বছর ‘দো ভাই’ তাঁকে বড় সাফল্য এনে দেয়। গীতা দত্তের গাওয়া ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বিত গয়া’ শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেয়।
এরপর একের পর এক স্মরণীয় কাজ। ‘পিয়াসা’, ‘চলতি কা নাম গাড়ি’, ‘গাইড’, ‘আরাধনা’, ‘অভিমান’—তাঁর সুরের বৈচিত্র্য বুঝতে এই কয়েকটি নামই যথেষ্ট। কোথাও বিষণ্নতা, কোথাও দুষ্টুমি। কোথাও প্রেমের উচ্ছ্বাস, আবার কোথাও অভিমান।

.

লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, আশা ভোসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দের মতো শিল্পীরা গেয়েছেন তাঁর সুরে। প্রত্যেকের কণ্ঠের নিজস্ব শক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। ফলে তাঁর সৃষ্টির ভুবনে এত ভিন্ন স্বরের সমাবেশ ঘটলেও সুরকারের নিজস্ব ছাপ হারায়নি।

.শচীন টেন্ডুলকারের নাম নেওয়া হয় শচীন দেববর্মন থেকেই.

ছেলের কড়া শিক্ষক
ছেলের সংগীতজীবন গড়ার ক্ষেত্রেও শচীনকর্তা ছিলেন যত্নবান। আর ডি বর্মনের কাছে বাবা ছিলেন কঠিন শিক্ষক। তাল বুঝতে হবে। যন্ত্র চিনতে হবে। নিজের সৃষ্টির ব্যাপারে সৎ থাকতে হবে।
১৯৯৩ সালে আর ডির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাংবাদিক মৃত্যুঞ্জয় কুমার ঝা। পরে পুরোনো নোট ও স্মৃতির ভিত্তিতে সেই কথোপকথনের বিবরণ প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে আর ডি জানিয়েছেন, তাঁর সংগীতজীবন গড়ে দেওয়ার পেছনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন বাবা।
ছোটবেলায় হারমোনিকায় সুর শোনানোর পর শচীনকর্তা তাঁকে মৌলিকতার গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন। তবলা শেখার নির্দেশও দিয়েছিলেন। একজন সুরকারের ছন্দবোধ তৈরি হওয়া জরুরি—এ ছিল তাঁর বিশ্বাস।
প্রতিদিন কয়েকটি করে সুর তৈরির পরামর্শ দিতেন ছেলেকে। নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়েই ভালো সুর খুঁজে নিতে হবে। আর ডির স্মৃতিতে বাবার আরেকটি শিক্ষা ছিল সরলতার মূল্য। সুর সাজাতে গিয়ে অনেক কিছু জুড়ে দিলে তার আবেদন কমেও যেতে পারে। তাই কোথায় থামতে হবে, সেটিও জানা চাই।

.শচীন দেববর্মন অনুপ্রেরণা.

অন্য ভুবনে শচীন
সংগীতের বাইরে শচীনকর্তার বড় আবেগ ছিল ফুটবল। প্রিয় দল ইস্টবেঙ্গল। দল বোম্বেতে খেলতে গেলে ফুটবলারদের কাছে পৌঁছে যেতেন তিনি।
ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষ উপলক্ষে আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া স্মৃতিচারণায় সুরজিৎ সেনগুপ্ত জানিয়েছিলেন, রোভার্স কাপের সময় শচীনকর্তা রেকর্ডিংয়ের কাজও বন্ধ রাখতেন। খেলোয়াড়দের খোঁজ নিতেন। মাঠে যাওয়ার আগে তাঁদের পিঠ চাপড়ে দিতেন।
সুরজিতের স্মৃতিতে আছে আরও মজার ঘটনা। কুপারেজ স্টেডিয়ামে শচীনকর্তার নামে দুটি চেয়ার দেখেছিলেন তিনি। প্রথমে ভেবেছিলেন, একটি হয়তো আর ডির জন্য। পরে জানলেন, দুটিই শচীনকর্তার। একটিতে বসতেন। অন্যটিতে পা রাখতেন।
ফুটবলার গৌতম সরকারও স্মরণ করেছিলেন তাঁদের প্রতি শচীনকর্তার আন্তরিকতা। তারকাখচিত বৈঠকখানায় খেলোয়াড়দের নিয়ে ঢুকতেন গর্ব করে। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। বাড়িতে আপ্যায়ন করতেন। খ্যাতিমান এই সুরকারের কাছে ফুটবলাররাও পেতেন তারকার সম্মান।
শচীনকর্তা বিদায় নিয়েছেন বহু বছর আগে। তবে তাঁর গান রয়ে গেছে মানুষের কণ্ঠে। পাড়া-মহল্লার গানের আসর থেকে বড় মঞ্চ—আজও ফিরে ফিরে আসে তাঁর সৃষ্টি। নবীন শিল্পীরাও তাঁর গানে খুঁজে নেন শেখার পথ, নিজেকে প্রকাশের ভাষা। সংগীত প্রতিযোগিতায় সেই গান গেয়েই মেলে ধরেন নিজেদের সামর্থ্য। কেউ রপ্ত করেন সুরের বাঁক, কেউ কণ্ঠে ধরতে চান তাঁর গায়কির দরদ। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নতুন কণ্ঠে বেঁচে আছেন শচীনকর্তা।
সূত্র: আর ডি বর্মনের সাক্ষাৎকার; ‘ফিল্মফেয়ার’, দ্য কুইন্ট, আনন্দবাজার পত্রিকা এবং শচীন দেববর্মনের জীবনীসংক্রান্ত প্রকাশনা।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!