• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৯ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন: কোন থাপ্পড়ে মিলবে শিশুর সুরক্ষা?

Reporter Name / ১১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে একটি থাপ্পড়। থাপ্পড়টির নৈর্ব্যক্তিক ও রূপক শক্তির দিকটি ঝড় তোলার মতোই। কিন্তু শিশুসুরক্ষা থাপ্পড়ে-থাপ্পড়ে মিলবে না। তাই শিশুসুরক্ষার বাস্তবানুগ পথ খোঁজা খুবই দরকার।

২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় আট বছরের এক শিশু বোনের শ্বশুর দ্বারা ধর্ষিত হয়। দ্রুত বিচারে মে মাসেই অভিযুক্ত হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হয়। উদাহরণটি তুললাম কয়েকটি কারণে। এক, এই শাস্তি যৌন নিপীড়কদের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করার কথা। শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা পরিসংখ্যানের একেবারেই তলানিতে নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু আদৌ হয়েছে কি?

হিটু শেখের ফাঁসির রায়ের দিন পর্যন্ত ২০০–এর কাছাকাছি অপরাধ ঘটেছিল। রায়ের পর আর একটিও না বাড়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বছর শেষে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭৪। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝবেন সমস্যা আসলে আরও কতটা গভীরে।

হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড সাম্প্রতিক থাপ্পড় ঘটনার চেয়ে কম আলোচিত হওয়ার মতো বিষয়ও ছিল না। পক্ষে-বিপক্ষে যাই-ই হোক, রায়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে তোলপাড় চলার কথা। হয়েছে কী? কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আমরা?

.

উত্তর: ‘রাজনীতি’ নিয়ে, ক্ষমতার পালাবদল ও হালুয়া-রুটির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে। ফলাফল, একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও নির্যাতকদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারল না।

আরও আগেই, ২০১৯ সালের পরপরই পরিবর্তন আসার কথা ছিল। এল না কেন? ২০১৯ সালে ফেনীর সোনাগাজীর এক মাদ্রাসাছাত্রী অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করেছিলেন। মামলা তুলে না নেওয়ায় তাঁকে গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটির প্রথম শিক্ষা ছিল, মুখ খোলার পর ভুক্তভোগীর সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকিতে পড়ে সে-ই।

দ্বিতীয় শিক্ষা হচ্ছে, সাত মাসের মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও নির্যাতকদের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরি করা যায়নি। মানে, আমরা এখনো সমস্যার তিমিরেই রয়ে গেছি। (যদিও ২০২৬ সালে পরিবর্তিত রায়ে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, ৪ জনের যাবজ্জীবন ও ১০ জনের খালাস মেলে—বিশ্লেষণটি এ–সংক্রান্ত নয়।)

আরও আছে, টাঙ্গাইলের এক আবাসিক মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে ৯ বছরের ছাত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ; গ্রেপ্তার, দুই মাস পর জামিন। ছয় মাসের মধ্যে একই ভবনে নতুন নামে নতুন মাদ্রাসা। পুলিশ জামিনপ্রাপ্ত অভিযুক্ত ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে নজরদারি চালু রাখেনি।

.শিশু যৌন নির্যাতন যখন নীরব মহামারি.মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের দায় শুধুই কি শিক্ষকদের?.

বহিষ্কৃত শিক্ষকের কোনো কেন্দ্রীয় তালিকাও নেই। কেন্দ্রীয় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-বেফাক) মহাপরিচালক নিজেই স্বীকার করেছেন, এক মাদ্রাসা থেকে বাদ পড়লে অন্য নামে আবার খোলা যায় (নেত্র নিউজ)। অভিযুক্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিচার চলছে, তবু প্রশ্নটা ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায়: যে দেশে সাইনবোর্ড বদলালেই অতীত মুছে যায়, সেখানে শিশুর নিরাপত্তা বা সুরক্ষার বিষয়টি কে দেখে?

উদাহরণের শেষ নেই। ২০২০ সালে ধর্ষণে মৃত্যুদণ্ড আইন হলো। তারপরও পুলিশের ধর্ষণ মামলা ২০২৪ সালের ৫ হাজার ৫৬৬ থেকে ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৬৮তে উঠেছে। অপরাধবিজ্ঞানের পুরোনো সত্যটি আবারও প্রমাণিত, শাস্তির কঠোরতা নয়, ধরা পড়ার নিশ্চয়তাই অপরাধ ঠেকায়।

দ্য অ্যাডভোকেটস ফর হিউম্যান রাইটস সতর্ক করেছিল, মৃত্যুদণ্ড আসলে ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেয় না। ঘরেই শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে ফাঁসির ভয় উল্টো ফল দেয়। পরিবার আরও চুপ করে যায়। কেউ নিজের ভাই বা বাবাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চায় না।

.

আমাদের রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০। শিশুসুরক্ষার প্রধান ফৌজদারি আইন এটিই। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিচারের জন্য এটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে, ২০০৩ ও ২০২০ সালে সংশোধিত হয়েছে, ২০২০ সালে ধর্ষণে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত হয়েছে।

২০২৫ সালের সংশোধনে তদন্তের সময় ১৫ দিন ও বিচারের সময় ৯০ দিন বেঁধে দেওয়া হয়েছে, শিশুধর্ষণের জন্য পৃথক ট্রাইবুনালের বিধান এসেছে, ডিএনএ সনদ ছাড়াও বিচার চালানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, আর ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলাৎকার যুক্ত হয়ে ছেলেশিশু স্পষ্টভাবে সুরক্ষার আওতায় এসেছে। (প্রথম আলো, ১৭ মার্চ, ২০২৫)। মাগুরার মতো আলোচিত মামলায় দ্রুত রায় এসবের সাফল্যের উদাহরণও তৈরি করেছে।

তবু সামগ্রিক চিত্র এখনো হতাশার কেন? দণ্ডহার মাত্র ৩ শতাংশ কেন? কেন তদন্তে লাগে গড়ে ১৫২ দিন, বিচারে গড়ে ১ হাজার ৩৭০ দিন, আর মৃত্যুদণ্ড যুক্ত হওয়ার পরও কেন অপরাধটি সংখ্যায় বেড়েছে?

.মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং শিশুর প্রতি সহিংসতায় রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা.বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি, ক্ষমতার নেক্সাস ও যৌন নিপীড়ন.

হাইকোর্টের ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নির্দেশনা ২০০৯’ ভালো উদ্যোগ। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) রিট মামলায় আসা এই নির্দেশনা প্রতিটি কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করেছে এবং আইন না হওয়া পর্যন্ত একে আইনের মর্যাদা দিয়েছে। অথচ ১০ বছর পরও প্রায় ৬০ শতাংশ স্কুল-কলেজে এমন কমিটিই ছিল না, আর নির্দেশনাটি আজও পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়নি। যদিও ২০১৯ সালেই একটি পত্রিকা সমস্যাটি তুলে ধরেছিল (দ্য ডেইলি স্টার, ২০১৯)।

বাংলাদেশে বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী ও আধুনিক দর্শন শিশুসুরক্ষা আইন আছে। কিন্তু একটি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানযুক্ত আইন বা আইনের কাছাকাছি প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তিযোগ্য নীতিমালা—যেটি সারা বিশ্বের অনেকগুলো দেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হয়—সেটিই নেই।

এই আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী, কিন্ডারগার্টেন, স্কুল, ছাত্রাবাস, পিকনিক, খেলার মাঠ, স্কাউটিং কোনো জায়গায় কোনো অবস্থাতেই শিশুর সঙ্গে কোনো শিক্ষক বা খেলাধুলা বা জিমের প্রশিক্ষক একা কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তৃতীয় কাউকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। শিক্ষক ছাত্রকে তার ফলাফল বিবরণী ও পরামর্শ দিতে হলেও তৃতীয় দায়িত্ববান কাউকে উপস্থিত রাখতে হবে।

.

ধনী ও উন্নত দেশে সব রকম প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকার পরও যৌন নির্যাতনের যন্ত্রণা গোপন রেখে আমরণ বয়ে বেড়ানোর ঘটনা অসংখ্য। সেখানে বাংলাদেশের বেলায় এটি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গোপন রাখা হয়।

.

সাধারণ্যে নীতিমালাগুলোকে টু-অ্যাডাল্ট রুল (দুই প্রাপ্তবয়স্কের নিয়ম), রুল অব থ্রি (তিনজনের উপস্থিতির নিয়ম) অথবা নো-ওয়ান-অন-ওয়ান কন্টাক্ট পলিসি (শিশুর সঙ্গে একান্তে যোগাযোগ নিষিদ্ধকরণ নীতি) বলা হয়।

নীতিমালাটি ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা প্রথম চর্চাকারী। ইসলাম ধর্মে খালওয়াত নিষেধের নীতি অনুযায়ী অনাত্মীয় দুজনের নির্জনে একান্তে থাকা নিষেধ। পুরুষ-নারী বলে কথা নেই। হাদিসে বলা হয়েছে, একই ঘরে দুজন অনাত্মীয়ের উপস্থিতি হলে তাতে আদেখা তৃতীয় একজন যুক্ত হয়। সেই তৃতীয়জন শয়তান (তিরমিজি, হাদিস ১১৭১)।

ইসলাম ধর্মকে চর্চায় নিলে প্রাপ্তবয়স্কদের বেলাতেই যেখানে কড়াকড়ি, সেখানে ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একজন শিশুর সঙ্গে একান্ততা বিষয়ে সতর্কতার মাত্রা আরও বহুগুণ বেশি করাই ছিল স্বাভাবিক। অথচ চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। মাদ্রাসায় ‘হুজুররা উনাদের সেবা করার জন্য,’, ‘গা টিপে দেওয়ার জন্য’ শিশু ছাত্র–ছাত্রীদের একাকী ডেকে নেন—এমন তথ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরপুর।

শিশুশিক্ষার্থীদের একান্তে ডেকে ‘ওস্তাদের সেবায় সওয়াব ও বেহেশত লাভ’ ধারণা তৈরিকে তাই স্পষ্ট প্রতারণা অথবা নিতান্তই ধর্মাচরণের লোভ দেখানো বানোয়াট অপব্যাখ্যা হিসেবে দেখা যায়। কারণ, আচরণটি খালওয়াত নীতিমালারও স্পষ্ট পরিপন্থী। শিশুদের দ্বারা শিক্ষকদের সেবা গ্রহণের চেষ্টাও আইনত কঠিন দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা শিশুসুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। কেন বিষয়টি এত দিনেও উত্থাপিত হয়নি?

.

থাপ্পড় কি শিশুদের সুরক্ষা দেবে, নাকি কেবল আমাদের ক্ষোভের সাময়িক নিষ্কৃতি দেবে?

হাততালি পাওয়া থাপ্পড়টি আসলে আগুন লাগার পর বালতি নিয়ে দৌড়ানোর মতো। আগুন বহুতল ভবনে লাগলে বালতির জল অর্থহীন। তবু আমরা দায়িত্ব পালন করছি ভেবে বালতি টেনে শান্তি পাই। দরকার এমন ভবন, যেখানে আগুন না লাগারই সব ব্যবস্থা আছে। যেখানে ধোঁয়ার গন্ধেই অ্যালার্ম বাজবে।

থাপ্পড় দেওয়ার জন্য মানুষ লাগে। মানুষ না থাকলে থাপ্পড় দেব কাকে? যখন নির্যাতক মাদ্রাসার সিঁড়িতে নয়, শিশুর হাতের মোবাইলে লুকিয়ে থাকে, তাকে থাপ্পড় দেবেন কীভাবে? যার মুখ নেই, নাম নেই, দেশও হয়তো আলাদা, তাকে কীভাবে থাপড়াব? ১২ বছরের সন্তানের যে গোপন ‘বন্ধু’টি গেমের চ্যাটে মাসের পর মাস গল্প করে, তারপর একটা গোপন ছবি চায়, অথবা ছবি বিনিময় করে, তারপর সেই ছবি-ভিডিওর ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেল করে অনলাইনের যৌনদাস হতে বাধ্য করে, তখন? শিশুরা এসব ট্রমার কথা তো বাবা–মাকে জানায়ই না নিজেরই অপরাধ ভেবে।

.ছেলেরা যৌন সহিংসতার শিকার হলে আমরা কেন নীরব থাকি.মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে.

নিরীহ স্কুল ড্রেসে থাকা বালক-বালিকার মাত্র মুখচ্ছবিগুলো নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন একটি ছবিকে কয়েক সেকেন্ডে অশ্লীল ছবিতে বদলে দিতে পারে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বা তার ব্যবহারকারী দুর্বৃত্তকে কীভাবে থাপ্পড় দেব? পর্দার ওপাশের শিকারি—এআই, অনলাইন আর সেক্টর বিষয়ে বাংলাদেশ কি আদৌ কিছু ভাবছে?

প্রশ্নটি রাখছি একটি ভয়াবহ তথ্যের কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত শিশু যৌন নিপীড়ন উপকরণের ২৪ লাখ ৯১ হাজারের বেশি রিপোর্ট পেয়েছে, যা পাকিস্তান (১৯ লাখ) বা ইন্দোনেশিয়ার (১৯ লাখ) চেয়ে বেশি (এনসিএমইসি, ২০২৩)। এনসিএমইসি নিজেই বাংলাদেশকে সতর্ক করে। এই সংখ্যা আপলোডের অবস্থান বোঝায়, নির্যাতনের প্রকৃত মাত্রা নয়। তবু এটুকু পরিষ্কার: আমাদের দেশের ইন্টারনেট শিশুদের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়।

এদিকে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারীর সাহায্যের আবেদন পেয়েছে। একশনএইডের জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার (দ্য ডেইলি স্টার, মার্চ ২০২৬)। শিশুদের আলাদা কোনো জাতীয় হিসাব কেউ কি কখনো চোখেও দেখেছেন? এই অনুল্লেখ শিশু যৌন নির্যাতন বিষয়ে আমাদের নির্বিকারত্বের ও দায়হীনতার অন্যতম লক্ষণ।

.মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে .ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যৌন নির্যাতন, ন্যায়বিচার হবে তো?.

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি শিশু যৌন নির্যাতন ঘটে ঘরেই। প্রতিবেশী আর আত্মীয়ের হাতে। বাবা-মায়ের বন্ধুরবান্ধবের হাতে। সেখানে থাপ্পড়টা কার গালে পড়বে? চাচার? মামার? নিজের বাবার?

ঢাকায় ছয় বছরের এক শিশুর বিরুদ্ধে অভিযুক্ত তার নিজের বাবা। দাদি মামলা করলেন, বাবা গ্রেপ্তার হলেন আর সংসার ডুবল অভাবে। মা ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) আইনজীবীর কাছে গিয়েছিলেন মামলা তুলে নিতে, যাতে স্বামী জামিন পান। কক্সবাজারে এক পরিবার মুখই খোলেনি। কারণ, অভিযুক্ত জামাইয়ের কাছে তাদের অনেক দেনা (দ্য ডেইলি স্টার, ১১ অক্টোবর ২০২৬)। এসব ঘটনায় থাপ্পড় দেবে কে? যে হাত থাপ্পড় দেওয়ার কথা, সেই হাতই তো অভিযুক্ত।

আমাদের থাপ্পড় দরকার বিদ্যমান অপব্যবস্থার গালে, ব্যক্তির গালে নয়।

.

মাদ্রাসার প্রশ্নটি এড়ানো যাবে না, আবার মাদ্রাসাকে একমাত্র সমস্যাগারও বানানো যাবে না। সমস্যা টুপিতে বা আলেম পদবাচ্যদের নৈতিকতায় নয়; বরং বিদ্যমান সুরক্ষা কাঠামোর দুর্বলতার ভেতরে লুকানো।

.

শিশু নিবর্তন ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। শিশুদের প্রতি যৌন-অসদাচরণ শিশু নিবর্তনের একটিমাত্র দিক। বিষয়টি অত্যন্ত নাজুক, পুরোনো, অস্বস্তিকর, এবং অপ্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন থাকায় সমস্যার গভীরে ঢোকাও যথেষ্ট কঠিন ও সংবেদনশীল।

২০১১ সালে জাতীয় শিশুনীতি প্রণীত হয়েছে। শিশুসুরক্ষায় রাষ্ট্রের নীতিগত অঙ্গীকার ও দিকনির্দেশনা এখানে আছে। কিন্তু এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আজও নেই। বাজেটে তার ছায়াও কখনো পড়তে দেখিনি গত দেড় দশকে।

থাপ্পড়কাণ্ডের আগে গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়ার একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির সাত বছরের ছাত্রীটি আর মাদ্রাসায় যেতে চাইছিল না। কারণও বলছিল না। মা-বাবা জিজ্ঞেস করতে থাকায় একসময় শিশুটি জানায়, শিক্ষক তাকে সিঁড়িতে আটকে অশালীন আচরণ করেছেন এবং কাউকে বললে মারবেন বলে ভয় দেখিয়েছেন (দ্য ডেইলি স্টার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬)।

পরিবার কিন্তু নিয়ম মেনে ঠিকই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল। তিন দিন অপেক্ষার পরও কোনো প্রতিকার মেলেনি (প্রথম আলো, ২৪ অক্টোবর ২০২৬)। স্বাভাবিকভাবেই এবার স্বজনদের গন্তব্য সরাসরি মাদ্রাসা।

.

আলেম সমাজের একাংশের ভিডিওর ভাষ্য দেখছিলাম। তাঁরা বলছিলেন, আইন আছে, প্রতিটি মাদ্রাসার গভর্নিং বডি আছে, তাঁদের সঙ্গে বসে সুরাহা না করায় থাপ্পড়দাতা অপরাধ করেছেন। কিন্তু সব ভাষ্যেই স্পষ্ট, সংক্ষুব্ধ পক্ষ যথাযথ নিয়মতান্ত্রিক পথেই হেঁটেছিলেন। তিন দিন দীর্ঘ সময়। বিপন্ন সন্তানের ততোধিক বিপর্যস্ত বাবা-মায়ের কাছে তিন দিন ৩০০ বছরের অপেক্ষার সমান। স্বাভাবিকভাবেই আমজনতার ক্ষোভ আরও বারুদে আগুন হয়েছে অভিযুক্ত মহলের ঘটনাপূর্ব নির্বিকারত্বে; আর ঘটনাপরবর্তী আকস্মিক শুভবুদ্ধি ও আইন-ভাবনায়।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়ার বদলে মামলায় নেমে আরও বেশি গণক্ষুব্ধতা তৈরি করেছে। জনগণ বিশ্বাস করছে না তাদের প্রতিষ্ঠাতার মামলায় উল্লিখিত টাকা ও মুঠোফোন লুটের বয়ান। শিশুটির বাবা দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার দাবি করেছেন এবং নিজে প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন জানিয়েছেন।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। কোনো অভিযুক্ত পক্ষই এখনো আইনের চোখে দোষী সাব্যস্ত হননি। কিন্তু সমাজের মন-মননের এক্স-রে যা হওয়ার হয়ে গেছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদী বাবার খেতাব হয়েছে ‘থাপ্পড়ম্যান’।

সমস্যার কথা, জনমানসের আগুনে প্রতিদিনই নতুন করে বারুদ পড়ছে। টঙ্গীর রেশ কাটার আগেই একই জেলার গাছায় একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় আট বছরের এক শিশুকে টানা তিন রাত নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছে, দুজন গ্রেপ্তার হয়েছেন (টিওবি নিউজ বাংলা, ২৪ অক্টোবর ২০২৬)। আবার পাবনায় একটি আবাসিক মহিলা মাদ্রাসায় যৌন হয়রানির অভিযোগে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

.

আমরা এখনো শুধু হিমশৈলের চূড়াটিই দেখছি। নিচে আর কতটুকুই–বা দেখি? তবু যেটুকু দেখি, আলাপ করা যাক।

ধনী ও উন্নত দেশে সব রকম প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকার পরও যৌন নির্যাতনের যন্ত্রণা গোপন রেখে আমরণ বয়ে বেড়ানোর ঘটনা অসংখ্য। সেখানে বাংলাদেশের বেলায় এটি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গোপন রাখা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন বলেছিল, প্রতিষ্ঠানে নির্যাতিত মানুষেরা গড়ে প্রায় ২২ বছর পর মুখ খুলেছেন, নির্যাতনের সময় গড় বয়স ছিল মাত্র ১০ (ইটার্নিটি নিউজ); অর্থাৎ ২২ বছর লেগেছে মুখ খুলতে।

২০০৬ সালে তারানা ব্যর্ক যুক্তরাষ্ট্রে ‘মিটু’ আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিলেন, যাতে যৌন আক্রমণের শিকার নারীরা মন খুলে সত্য বলতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ ১১টি বছরেও কেউ মুখ খুলছিলেন না। ১১ বছর পর ২০১৭ সালে এসে হলিউডের হার্ভি ওয়েন্সটাইনের বিরুদ্ধে অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানের মুখ খোলানোর আমন্ত্রণ জানানোর পরই আন্দোলনটি গতি ও পরিচিতি পায়। উঠে আসতে শুরু করে নামকরা মানুষের শিশু-কিশোরী সন্তানেরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

.কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা: জবাবদিহির পথে হাঁটব কীভাবে.যৌন হয়রানি ঠেকানোর পথে বাধা দুর্বল আইনি কাঠামো.

মুখ খুলতে পারাদের অনেকেই চার-পাঁচ দশক ধরে নিজেদের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন শৈশব ও কৈশোরের যৌন নির্যাতনের দগদগে ঘা। চলতি সময়ে এপস্টিন কেলেঙ্কারি বিশ্ব মিডিয়ার নজরে আসার পর যখন অনেক নারীই মুখ খুলছেন—তখনো দেখতে পাই, ঘটনার সময় তাঁরা ছিলেন শিশু বা কিশোরী।

যে দেশগুলোতে নির্যাতিতের কথা শোনার ব্যবস্থা আছে, সেখানেও মুখ খুলতেই পেরিয়ে যেতে হয় এক প্রজন্ম সময়। বাংলাদেশে কতজন ক্ষতবিক্ষত মন নিয়েই কবরে চলে যান, পরিসংখ্যানের সাধ্য কি সত্যটি তুলে আনার? তবু আমরা কয়েকটি পরিসংখ্যান দেখব।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৬ বছরে ৩ হাজার ৪৮৭ শিশুধর্ষণের শিকার হয়েছে (প্রথম আলো, ১০ অক্টোবর ২০২৬)।

২০২১ সালে সংবাদপত্রে শিশুধর্ষণের সংবাদ ছিল ১ হাজার ৪৭টি। ২০২২ সালে ৭৩২, ২০২৩ সালে ৫৫৮, ২০২৪ সালে ২৮৪, ২০২৫ সালে ৪৭৪; আর ২০২৬ সালের অক্টোবর নাগাদই ৩৯২টি। মনে রাখা দরকার, এগুলো মাত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার হিসাব, প্রকৃত সংখ্যা নয়। আসল সংখ্যা কত গুণ বেশি, অনুমান করাও কষ্টসাধ্য। কারণ লোকলজ্জা, ঝামেলা, বিবাদ, মামলা-হামলা-আইনি জটিলতা।

.

শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে বড় সহযোগী নির্যাতক নয়, নীরবতা। অযৌক্তিক বিবেচনায় ‘নীরবতা’কেও দোষ দেওয়ার উপায় নেই। পরিবারগুলো ভাবে, ‘মেয়েটার বিয়ে হবে না,’, ‘ছেলেটা স্কুলে মুখ দেখাতে পারবে না’। সমস্যাটা তাদের অনুমানে নয়, সমাজে।

.

২০২৪ সালে সংখ্যাটা সবচেয়ে কম। ২৮৭টি। কিন্তু সংখ্যা দেখে স্বস্তির কিছু নেই। অভ্যুত্থানের বছরে সংবাদপত্রের পাতা ভর্তি ছিল রাজনীতিতে। থানাগুলো ছিল অকার্যকর। নথিবদ্ধতা ছিল সামান্য। থার্মোমিটার ভাঙলে জ্বর কমে না, কেবল জ্বর মাপা বন্ধ হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনা আগের বছরের চেয়ে ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে (দ্য ডেইলি স্টার, ২১ জুলাই ২০২৬)। কিন্তু এভাবে পরিসংখ্যানের পাঠ বিপজ্জনক। আগের বছরকে কোন মানদণ্ডে আমরা তুলনার ইউনিট ধরব? কম সংখ্যা নথিবদ্ধ হয়েছে বলেই ভালো? আর্থরাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ ছাড়া এভাবে বছরভিত্তিক বাড়া-কমা সমস্যার সঠিক উপস্থাপন নয়।

আনুষ্ঠানিক ও রক্ষণশীল সরকারি হিসাবটিও ভীতিকর। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২৫ সালে ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৬৮টি; আগের বছর ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি (প্রথম আলোর সূত্রে, দ্য ডেইলি স্টার)। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৪ হাজার ৪৬৫টি মামলা হয়েছে, যার ১ হাজার ৭১৫টি শিশুধর্ষণের; জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ একই সময়ে ১৭৬টি শিশুধর্ষণ ও ১০৭টি ধর্ষণচেষ্টার খবর এসেছে (নিলিমা জাহান, দ্য ডেইলি স্টার, ১১ অক্টোবর ২০২৬)। একই সময়ে ১৪টি ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ১ হাজার ৫৮০ জন ধর্ষণের শিকার শিশু সেবা নিয়েছে, আরও ৫০৭ জন এসেছে ৬৭টি ক্রাইসিস সেলে।

.

শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮–এ গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৫ লাখ কল এসেছে। এর মধ্যে মেয়েশিশুর প্রতি সহিংসতা নিয়ে কল ৬৪ হাজার ২৮৯টি। ফোনকারীদের প্রায় ৬০ শতাংশ ছেলেশিশু। কারণ, মেয়েশিশুদের হাতে ফোন কম।

আসকের এক দশকের (২০১৬-২৫) হিসাবে যাচাই করা ১১ হাজার ৭৩৫টি শিশু নির্যাতনের মাত্র ৬ হাজার ৯টিতে; অর্থাৎ প্রায় ৫১ শতাংশ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক মামলা হয়েছে, যার মানে প্রতি দুটির একটি মামলার খাতাতেই ওঠেনি; আর প্রতি চারটি প্রকাশিত শিশুধর্ষণের একটি ঘটনা আদালত পর্যন্তই পৌঁছায়নি। (দ্য ডেইলি স্টার, ২১ জুলাই ২০২৬)। ওসিসি ও ক্রাইসিস সেলে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ৬৬ হাজার ৭১১ জন নারী ও শিশু। মামলা হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ৯১৪টির; অর্থাৎ তিনজনের দুজনই হাসপাতাল পর্যন্ত এসে থানার দরজা থেকে ফিরে গেছেন (দ্য ডেইলি স্টার, ১১ অক্টোবর ২০২৬)।

পরিসংখ্যানগুলো তাই পড়তে হবে মেঘলা রাতের তারার মতো: যে কটি দেখা যাচ্ছে, আকাশে তার অনেক গুণ বেশি আছে।

.শিশুশিক্ষার্থী দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য চাঁদা সংগ্রহ কবে বন্ধ হবে.যৌন নির্যাতন: আইন কি ছেলে শিশুদের সুরক্ষা দেয়?.

আমরা শিশুকে শেখাই, ‘অচেনা কারও দেওয়া চকলেট খাবে না।’ পরিসংখ্যান বলছে, চকলেটটা আসলে দেয় চেনা লোকই। শিশুরাই সব সংগঠনের ২০২৫ সালের ৩০৮টি শিশুধর্ষণ মামলার নিরীক্ষার ফল (দ্য ডেইলি স্টার, ১১ অক্টোবর ২০২৬) মোতাবেক, অভিযুক্তদের সবচেয়ে বড় অংশ (৪০ দশমিক ৫৮ শতাংশ) শিশুটির প্রতিবেশী।

এরপর ২১ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরিচিত ব্যক্তি, ১৪ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষক এবং ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ মাত্র ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ; অর্থাৎ ১০টি ঘটনার ৯টিতেই অভিযুক্তরা শিশুদের চেনা জগতের মানুষ। আর স্থান? প্রকাশিত যৌন নির্যাতনের ৫৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশই ঘটেছে ঘরে। আমরা যে দরজায় তিনটি তালা দিই, টেরও পাই না বিপদ সেই দরজার ভেতরেই বসে আয়েশে চা পান করছে।

শিশুরা চেনা মানুষকে বা আত্মীয়স্বজনকে কীভাবে সন্দেহ করবে, যেখানে মা–বাবাই তাঁদের সন্দেহমুক্ত চোখে দেখেন?

সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে ‘ফুটন্ত ব্যাঙ’ রূপক ব্যবহার করতে করতে আমরা ত্যক্ত-বিরক্ত। তবু আরেকবার না বললে অনেকে সমস্যাটি সহজে ধরতে পারবেন না। একটি ব্যাঙকে ফুটন্ত পানিতে ফেললে সে লাফ দিয়ে বেরোয়। কিন্তু ঠান্ডা পানির মধ্যে রেখে পানি ধীরে ধীরে গরম করলে বিপদের বাড়া-কমা টেরই পায় না। তারপর যখন টের পায়, তখন হয়তো পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগও আর থাকে না।

.

আবাসিক ব্যবস্থা, মা-বাবা থেকে দূরত্ব, শিক্ষকের প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রের দুর্বল তদারকি আর ‘প্রতিষ্ঠানের সুনাম’ রক্ষার তাগিদ—এই পাঁচ উপকরণ যেখানেই একসঙ্গে থাকে, সেখানেই নির্যাতন বাসা বাঁধে।

.

বেশির ভাগ শিশুর যৌন নির্যাতন শুরু হয় এই স্লো-বয়লিং কৌশলেই। আলাদা আদর। প্রশংসা। মনকাড়া উপহার। ‘তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয়।’ স্তুতি। তারপর একটি ‘গোপন কথা’। এভাবে বশীকরণ। নির্যাতক শুধু শিশুকে বশ করে না, শিশুর বাবা-মাকেও করে। সে সবচেয়ে মনোযোগী শিক্ষক, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্বজন বা পারিবারিক বন্ধু। সবচেয়ে দরদি প্রতিবেশী। তাই শিশুর কথা যখন কানে আসে, বড়রা অনেক সময় বিশ্বাসই করেন না।

টঙ্গীর শিশুটির মাদ্রাসায় যেতে না চাওয়াই ছিল স্মোক অ্যালার্মের প্রথম বিপ। সেই বিপ শুনে মা-বাবা প্রশ্ন করেছিলেন, আর সেখানেই এই পরিবারটি অনেকের চেয়ে এগিয়ে।

এই বিষয়ে কিছু লেখাও মুশকিলের। একদল মানুষ অহেতুক প্যারানয়েড হয়ে পড়তে পারেন। ভাবতে পারেন, শিশুকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে আত্মীয়স্বজনকেও কি তাহলে আশপাশে ঘেঁষতে দেব না? সম্পর্কহীন, আত্মীয়-পরিজনহীন অসামাজিক জীবন বেছে নেব?

উত্তর হচ্ছে, একেবারেই নয়; বরং উল্টোটা। পারিবারিক ও স্বজনবন্ধন বাড়াতে হবে। তবে শিশুকে ভয় দেখানো নয়, শৈশব থেকেই ভীতসন্ত্রস্ত না করে সতর্কতা ও সচেতনতার শিক্ষাদান সম্ভব। মা–বাবার জন্যও সচেতনতা দরকার, যাতে তাঁরা সন্তানকে এই আত্মবিশ্বাস জোগান যে তাঁদের চেয়ে বড় সুরক্ষক কেউ নেই। শিশুরা যেন মন খুলে তাঁদের কাছে সত্য প্রকাশ করতে পারে। শিশুরাও সত্য লুকায়, কঠোর স্বভাব ও অবন্ধুসুলভ অভিভাবকদের শাসন এবং ‘তোরই দোষ’ ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত দায়িত্বজ্ঞানহীন দোষারোপের ভয়ে।

.

মাদ্রাসার প্রশ্নটি এড়ানো যাবে না, আবার মাদ্রাসাকে একমাত্র সমস্যাগারও বানানো যাবে না। সমস্যা টুপিতে বা আলেম পদবাচ্যদের নৈতিকতায় নয়; বরং বিদ্যমান সুরক্ষা কাঠামোর দুর্বলতার ভেতরে লুকানো।

আবাসিক ব্যবস্থা, মা-বাবা থেকে দূরত্ব, শিক্ষকের প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রের দুর্বল তদারকি আর ‘প্রতিষ্ঠানের সুনাম’ রক্ষার তাগিদ—এই পাঁচ উপকরণ যেখানেই একসঙ্গে থাকে, সেখানেই নির্যাতন বাসা বাঁধে। আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক আবাসিক প্রতিষ্ঠান, অস্ট্রেলিয়া আর কানাডার গির্জা-স্কুল আর যুক্তরাষ্ট্রের বয় স্কাউটদের বেলায়ও একই রকম কারণই দায়ী ছিল। প্রথম আলোর ধর্মবিষয়ক ডেস্কের মনযূরুল হক লিখেছেন, আসকের হিসাবে, এক বছরে অন্তত ৫২টি শিশু মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তিনজন মারা গেছে, ২০২০-২৫ সালে গণমাধ্যমে এসেছে অন্তত ২১১টি ঘটনা (প্রথম আলো ইংরেজি)।

নেত্র নিউজের হিসাবে, ২০২৪-২৫ সালে সংবাদপত্রে আসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৯টি যৌন নির্যাতনের ঘটনার ২৩টি (৫৯ শতাংশ) মাদ্রাসায়, অথচ মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৬ শতাংশের মতো মাদ্রাসায় পড়ে, প্রতি ১০ লাখে প্রকাশিত ঘটনা মাদ্রাসায় ৮ দশমিক ৩। স্কুল-কলেজে ১ দশমিক ১ (নেত্র নিউজ, জুন ২০২৬)। নিঃসন্দেহে এসব কারণেই মাদ্রাসাগুলোর নৈতিকতা প্রশ্নের মুখে এবং শিক্ষকসমাজ জনরোষের শিকার।

.

শিশুর মা–বাবা যদি জানেন, মুখ খুললে পাড়ার কেউ জানবে না, তাঁরা মুখ খুলবেনই। গোপনীয়তা রক্ষা করে বিচার, বন্ধ কক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ, এনক্রিপ্টেড ভিডিও জবানবন্দি, মামলার কাগজে ছদ্মনাম ইত্যাদির নিশ্চয়তা থাকা চাই। পরিচয় ফাঁস করলে ফাঁসকারীর দ্রুত শাস্তির নিশ্চয়তা দরকার।

.

মাদ্রাসার জগৎটি যেন আইনের ঊর্ধ্বে! হেফজখানা ও কওমি মাদ্রাসা রাষ্ট্রের সরাসরি শিক্ষা তদারকির বাইরে। বেফাকের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা আছে, শাস্তির আইনি ক্ষমতা নেই (নেত্র নিউজ)। প্রাইভেট টিউশন, কোচিং সেন্টার, আবাসিক হোস্টেল, খেলার ক্লাব, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু এবং একটা বড় অংশের কিন্ডারগার্টেনের কোনো বাধ্যতামূলক সুরক্ষানীতি, পটভূমি যাচাই বা অভিযোগ কমিটি নেই।

অপরাধ ঘটলে কী হবে, আইন বলছে; কিন্তু কোনো আইন এখনো বলছে না, অপরাধ যাতে ঘটতেই না পারে, সে জন্য প্রতিষ্ঠানকে কী কী বাধ্যতামূলকভাবে করতেই হবে। ভাবেসাবে মনে হচ্ছে, আইন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি কিনে বসে আছে, কিন্তু অগ্নিনির্বাপণের নিয়মকানুনই (ফায়ার কোড) বানাতে পারেনি এখনো।

.মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন ও ঝুঁকির দায় কার?.ধর্ষণ, ক্ষমতার রাজনীতি ও বোকামির মূল্য.

শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে বড় সহযোগী নির্যাতক নয়, নীরবতা। অযৌক্তিক বিবেচনায় ‘নীরবতা’কেও দোষ দেওয়ার উপায় নেই। পরিবারগুলো ভাবে, ‘মেয়েটার বিয়ে হবে না,’, ‘ছেলেটা স্কুলে মুখ দেখাতে পারবে না’। সমস্যাটা তাদের অনুমানে নয়, সমাজে। নীরবতার পেছনে অন্তত চারটি কারণ থাকে:

এক, ইজ্জতের হিসাব। নির্যাতনের লজ্জা যেন নির্যাতকের নয়, নির্যাতিতের। আমরা এই সমাজকে শেখাইনি, যদি চোর ধরতে পারলে ঘরের মালিকের ইজ্জত না যায়, বরং বাড়ে; শিশু নির্যাতিত হয়েছে জানলে কীভাবে পরিবারের ইজ্জত যায়!

দুই, রুটিরুজির হিসাব। অভিযুক্ত যখন বাবা, চাচা, বাড়িওয়ালা বা পাওনাদার, তখন মামলা-মোকদ্দমায় ঘরের চুলা নিভে যেতে পারে। সম্পত্তি ভাগাভাগিতে ভাগে কম পড়তে পারে। অবস্থাটিতে ‘স্বার্থপরতা’, ‘নিষ্ঠুরতা’ বা ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ দেখতে যাওয়াও অনুচিত। কারণ, রাষ্ট্র তাকে সুবিচার পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা এখনো দেয়নি। না আছে কোনো বিকল্প—না ভাতা, না আশ্রয়, না বিকল্প অভিভাবকত্ব। দেশে প্রতি ১ লাখ ৩ হাজার শিশুর জন্য সমাজকর্মী আছেন মাত্র একজন (দ্য ডেইলি স্টার)। ছয় বছরের শিশুটির মা স্বামীর জামিন চাইত না, যদি রাষ্ট্র তার ভাত-কাপড়-বিছানা ও মাথার ওপর একচিলতে ছাদের ব্যবস্থা রাখত।

.

তিন, সালিসের দৌরাত্ম্য। গ্রামের মাতবর, প্রতিষ্ঠানের কমিটি বা প্রভাবশালী আত্মীয় মিলে টাকা, বিয়ে বা ‘আর করবে না’ প্রতিশ্রুতিতে বিষয়টা ‘মিটিয়ে’ দেন। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের ২০২৬ সালের গবেষণায় নিষ্পন্ন মামলার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশই শেষ হয়েছে আপসে। অসুখ না সারিয়ে জ্বর নামিয়ে দেওয়ার মতো। আপস আপাতসুরক্ষিত শিশুটিকেও আসলে সুরক্ষা দেয়নি। উপরন্তু, আরেকটি শিশুকে নিবর্তনের শিকার করতে নির্যাতকের স্বাধীনতাকেই বাড়িয়ে দেয়।

চার, ভুক্তভোগী পরিবারের কলঙ্কবোধ। সমাজে খবর একবার ছড়ালে তা ফেসবুকের খোরাক হয়ে ওঠে মুহূর্তেই। টঙ্গীর ভিডিওটি ভাইরাল মানে মাদ্রাসার নাম, এলাকা, বাবার মুখ—সব জানা। সুতরাং শিশুটিকে চিনতে এখন পাড়ার কারও এক মিনিটও লাগবে না। অথচ শিশু আইন, ২০১৩-এর ৮১ ধারা ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ ধারা শিশুর পরিচয় শনাক্তকরণ যায়, এমন ছবি বা তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করেছে (ব্লাস্ট, শিশু আইনের ভাষ্য)। আইন আছে, কিন্তু লাইক-শেয়ারের উন্মাদনা আইনকে দাবিয়ে রাখে।

.

সাত বছরের একটি শিশু বিচার পেতে পেতে যদি ১১ বছরে পড়ে, আর আদালত তাকে স্মরণ করে বলতে নির্দেশ দেন, তাহলে শিশুটিকে কি স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য করছি না? রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বরং তাকে নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা, ‘স্মৃতির মধ্যে আটকে না থেকে স্বাভাবিক সৌন্দর্যে বড় হয়ে ওঠো।’

.

গোপনীয়তা আর গোপনের ফারাকই করতে জানে না রাষ্ট্র। শুধু ডাক্তারই রোগীর রোগ সম্পর্কে জানেন, কাউকে না জানিয়ে চিকিৎসা দেন নিভৃতে। এটিই গোপনীয়তা বা ‘কনফিডেন্সিয়ালিটি’। কিন্তু রোগ চেপে রেখে চিকিৎসাই না করানো, গোপন রাখা বা ‘কনসিলমেন্ট’। রাষ্ট্র যখন ভুক্তভোগী ও অপরাধীর গোপনীয়তার অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, পরিবারগুলো তখন দ্বিতীয় বিপজ্জনক পথটিই বেছে নেয়। খোলা মঞ্চে বিচার, মিডিয়া ট্রায়াল ইত্যাদি বিচারও নয়, সমাধানও নয়—এগুলো সমস্যা।

শিশুর মা–বাবা যদি জানেন, মুখ খুললে পাড়ার কেউ জানবে না, তাঁরা মুখ খুলবেনই। গোপনীয়তা রক্ষা করে বিচার, বন্ধ কক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ, এনক্রিপ্টেড ভিডিও জবানবন্দি, মামলার কাগজে ছদ্মনাম ইত্যাদির নিশ্চয়তা থাকা চাই। পরিচয় ফাঁস করলে ফাঁসকারীর দ্রুত শাস্তির নিশ্চয়তা দরকার।

ব্যবস্থাগুলো চালু হলে অপরাধীও অপরাধ স্বীকার করবেই অনায়াসে। তাকেও তার পরবর্তী জীবনভর অপরাধ ও অপরাধীর গ্লানি বয়ে বেড়াতে হবে না। শেষ বিচারে অপরাধীও মানুষ, অনুতপ্ত হয়ে, সংশোধিত হয়ে আসার অধিকার তারও মানবিক প্রাপ্য-পাওনা।

.নিখোঁজ সংবাদ: মাদ্রাসার শিশু–কিশোরের সংখ্যা কেন বেশি.পল্লবীর শিশুটির বাবা কী কারণে বিচার চাইবেন.

শিশুসুরক্ষা আইনের ওপর বাংলাদেশে আলমারি বই-ভর্তি আছে, সবই কিন্তু ধুলাময়। দামি গাড়ি গ্যারেজে প্রদর্শনবস্তুর মতো রেখে দিলে, না চালালে সেটি যেমন যানবাহন নয়, লোহালক্কড়ের জঞ্জাল, সে রকম।

সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক ৩২ জেলার ৪ হাজার ৪০টি নিষ্পন্ন মামলা পরীক্ষা করে পেয়েছে: দণ্ড হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ মামলায়, খালাস ৭০ দশমিক ২ শতাংশ, আপস ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ; ১৫টি জেলায় একটি দণ্ডও হয়নি। তদন্তের আইনি সময় ১৫ দিন, লেগেছে গড়ে ১৫২ দিন; বিচারের সময়সীমা ৯০ দিন, লেগেছে গড়ে ১ হাজার ৩৭০ দিন—মানে, প্রায় পৌনে চার বছর আর ২২টি শুনানি (দ্য ডেইলি স্টার, ১১ অক্টোবর ২০২৬; ব্র্যাক)।

সাত বছরের একটি শিশু বিচার পেতে পেতে যদি ১১ বছরে পড়ে, আর আদালত তাকে স্মরণ করে বলতে নির্দেশ দেন, তাহলে শিশুটিকে কি স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য করছি না? রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বরং তাকে নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা, ‘স্মৃতির মধ্যে আটকে না থেকে স্বাভাবিক সৌন্দর্যে বড় হয়ে ওঠো।’

.

ছেলেশিশুর ওপর যৌন নির্যাতন ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধ’ হিসেবে ৩৭৭ ধারার অস্পষ্ট বৃত্তে আটকে আছে এখনো। কোনোই সংস্কার নেই। অথচ ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির সংজ্ঞা মোতাবেক, ৩৭৫-৩৭৬ ধারায় ধর্ষণ, ৩৫৪ ধারায় শ্লীলতাহানি, ৩৭৭ ধারায় প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধ এবং ৫০৯ ধারায় অশোভন ইঙ্গিতও অপরাধ এবং এগুলোর সবই ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার জন্য যুক্তিসিদ্ধ।

শিশু আইন–২০১৩ বিষয় অনুযায়ী অত্যন্ত আধুনিক আইন; কিন্তু প্রয়োগের বেলায় প্রায় ব্যর্থ। প্রতি ১ লাখ ৩ হাজার শিশুর জন্য মাত্র একজন সমাজকর্মীর ব্যবস্থা থাকলে কীভাবে সম্ভব শিশুসুরক্ষা? আছে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০। এই আইন সুরক্ষা ঘরের ভেতরের সহিংসতাকে প্রথমবারের মতো আইনের আওতায় এনেছে।

অথচ যে দেশে শিশু নির্যাতনের বেশির ভাগ ঘটে ঘরেই, সেখানে এর ব্যবহার খুবই কম, আর শিশুর জন্য আলাদা সুরক্ষা আদেশ চাওয়ার চর্চা প্রায় নেই বললেই চলে। আছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২। শিশু পাচার ও যৌন শোষণ দমনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের একটি কাঠামো এই আইন দিয়েছে। কিন্তু সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা না থাকায় মামলা টেকে না, দণ্ডও বিরল।

.

সব দেশের একটিই সারকথা—যারা কেবল শাস্তি বাড়িয়েছে, তারা আটকে গেছে; যারা পরিবেশ বদলেছে, তারা এগিয়েছে। পরিবেশ বদলানো মানে পাঁচটি কাজ: একান্ত সুযোগ কমানো, প্রাপ্তবয়স্ক যাচাই, নিরাপদ অভিযোগের পথ তৈরি করা, শিশুবান্ধব বিচার, আর দায়ী প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।

.

আরও আছে ২০১১ সালের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধকরণ আইন। হাইকোর্টের রায় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীকে মারধর নিষিদ্ধ হয়েছে। মূলধারার স্কুলে আচরণের মানদণ্ড এতে সত্যিই বদলেছে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসা ও হেফজখানা কার্যত এর আওতার বাইরে থেকে গেছে, আর মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের নির্যাতনবাদী সংস্কৃতি প্রায় অক্ষতই রয়ে গেছে।

পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২–তে শিশুকে ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি তৈরি ও বিতরণের কঠোর দণ্ড রেখেই–বা কী লাভ হয়েছে? ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এনসিএমইসিতে ২৪ লাখের বেশি সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট জমা পড়লেও দেশে এ আইনে মামলা তেমন নেই বললেই চলে।

.এই শিশুদের পক্ষে বলার কি কেউ নেই.ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার শিশু ও নারীর বিয়ে কীভাবে সম্ভব.

তাহলে সমাধান? বাইসেপের মাপে সুরক্ষা অবশ্যই সমাধান নয়। থাপ্পড়টি একটি নীরবতা ভেঙেছে, সত্য; কিন্তু যে সুরক্ষা বাইসেপে, সেটি সুরক্ষা নয়, একটি শিশুর সৌভাগ্য। বাবাটি মেয়ের কথা বিশ্বাস করেছেন। অসংখ্য মা–বাবা শিশুকেই উল্টো ধমকান, ‘উনি হুজুর, উনি এমন করতেই পারেন না।;

ব্যক্তিগত সাহসকে জাতীয় নীতি বানানো যাবে কি? সব শিশুর বডিবিল্ডার বাবা নেই। যে শিশুর বাবা নেই, যার মা পোশাক কারখানায় রাতের শিফটে, যার পরিবার অভিযুক্তের কাছে দেনাদার, যার নিজের বাবাই অভিযুক্ত, তার জন্য থাপ্পড় কোনো বিকল্পই নয়। গায়ের জোরের বিচার হলো জোরওয়ালাদের অবিচার। রাষ্ট্রের কাজ ঠিক উল্টোটা, সবচেয়ে দুর্বল শিশুটির পাশে সবচেয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো।

সব দেশের একটিই সারকথা—যারা কেবল শাস্তি বাড়িয়েছে, তারা আটকে গেছে; যারা পরিবেশ বদলেছে, তারা এগিয়েছে। পরিবেশ বদলানো মানে পাঁচটি কাজ: একান্ত সুযোগ কমানো, প্রাপ্তবয়স্ক যাচাই, নিরাপদ অভিযোগের পথ তৈরি করা, শিশুবান্ধব বিচার, আর দায়ী প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।

.

বাংলাদেশে শিশুসুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রায় সব উদ্যোগ বা আইনগুলোই কেমন যেন একরৈখিক, সমন্বিত ভাবনার নয়। ছাড়া ছাড়া, গা-ছাড়া।

তাহলে প্রকৃত থাপ্পড়টা কার গালে? আমার উত্তর: তিনটি গালে। এক, সেই প্রতিষ্ঠানের গালে, যে অভিযোগ পেয়ে তিন দিন বসিয়ে রাখে। দুই, সেই রাষ্ট্রের গালে, যে ১৫ দিনের তদন্ত ১৫২ দিনে করে আর ৩ শতাংশ মামলায় দণ্ড দেয়। তিন, আমাদের নিজেদের গালে, যারা ‘উনি তো হুজুর’, ‘উনি তো চাচা’ বলে শিশুকে একা ঘরে পাঠাই। এই থাপ্পড়ের নাম ‘সংস্কার’। এই সংস্কারের জন্য দেশময় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

আইসল্যান্ডের বার্নাহুস বা শিশুর ঘর আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে। ১৯৯৮ সালে আইসল্যান্ড একছাদের নিচে এনেছিল পুলিশ, প্রসিকিউটর, শিশুসুরক্ষা কর্মী, চিকিৎসক ও মনোবিদকে। প্রশিক্ষিত সাক্ষাৎকারী একবারই শিশুর কথা শোনেন। পাশের ঘর থেকে বাকিরা দেখেন। আর রেকর্ড করা সেই সাক্ষাৎকারই আদালতে সাক্ষ্য।

.যৌন নিপীড়ন: শিশুর সুরক্ষায়

যেন চুপ না থাকি.ধর্ষণের পেছনে কাজ করে যে মনস্তত্ত্ব.

শিশুকে বছরের পর বছর আদালতে গিয়ে দাঁড়াতে হয় না। সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে এখন ৫০টির বেশি কেন্দ্র, ইউরোপের প্রায় ২০টি দেশ মডেলটি গ্রহণ করছে। আমাদের ওসিসি এই মডেলের অর্ধেকের কাছাকাছি রাস্তা পার হয়েছে। আদালতের গ্রহণযোগ্য একক সাক্ষাৎকার–প্রথা চালু হলে বাকি অর্ধেক পথও পেরোনো যাবে হয়তো।

নির্মাণশিল্পের একটি আপ্তবাক্য হচ্ছে, সব অগ্নিকাণ্ডের আগুন লাগার কারণ আলাদা। কিন্তু সব অগ্নিনির্বাপক নিয়মের উদ্দেশ্য একটিই, আগুনকে ছড়ানোর সুযোগ না দেওয়া। এই অনুধাবনের আলোকে জাতীয় শিশুসুরক্ষা নীতিমালার যুগোপযোগী সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটি জাতীয় কনভেনশন আয়োজন জরুরি দরকার।

  • হেলাল মহিউদ্দীন শিক্ষক, লিবারেল আর্টস, মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডাকোটা, যুক্তরাষ্ট্র

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!