• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

ভূমিকা : যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন বাংলার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইসলাম গ্রহণ করেছে এই অঞ্চলের মানুষেরা। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Rise of Islam and the Bengal Frontier’-এ ইটন উল্লেখ করেছেন, ‘মুসলিম শাসকরা ভারত উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেছেন। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল বাংলা। ভারতের সব প্রদেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাতেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শাসকশ্রেণির ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছিল। উল্লেখ্য, বাংলা ছিল ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের সম্মিলিত আয়তনের প্রায় সমান।’ ভারতের পূর্বাংশে ইসলামের এই অভাবনীয় উত্থান নিয়ে ইটন প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন তুলেছেন—‘এই বিকাশকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? আরো নির্দিষ্টভাবে বললে, ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু সেখান থেকে এত দূরবর্তী বাংলায় কেন এত বড় একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটল? অথচ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এমন কিছু হলো না! আর বাংলার ভেতরেই বা পশ্চিমের তুলনায় পূর্বে কেন এত বেশি হারে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল?’বর্তমানে বাঙালি মুসলমান জাতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জাতি। তাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২১ কোটি, যেখানে আরব মুসলমানের সংখ্যা ৪০ কোটি। বাংলাদেশ বাঙালি মুসলমানদের প্রধান আবাসভূমি। আর তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গ ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বসবাস করে।আমরা এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পাড়ি দিয়ে বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। আজ আমরা আলোচনা করব ভারতে মুসলিম শাসন শুরুর প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১১ শতকের সেন রাজাদের আমল নিয়ে।সেন আমলে গোঁড়া ব্রাহ্মণদের আধিপত্য (১১-১২ শতক) পাল বংশের শাসনামলে সেনরা কর্ণাটক থেকে বাংলায় এসেছিল। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। সেনরা কাজের সন্ধানে বাংলায় আসে এবং আনুমানিক ১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন বাংলার সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। তারা নিজেদের দক্ষিণ ভারতের ক্ষত্রিয় বংশধর দাবি করত। সেনদের প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব সামন্ত সেন ক্ষয়িষ্ণু পাল শাসকদের সেনাবাহিনীতে একজন সর্দারের পদে উন্নীত হন। তার পুত্র পরে এই নতুন বংশের প্রথম রাজা হন। তবে বংশটির ভিত্তি প্রকৃতপক্ষে গড়ে দেন বিজয় সেন। তিনি ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা হন এবং ৬০ বছর বাংলা শাসন করেন। পরবর্তী সেন রাজারা বাংলায় হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃত বিদ্যাচর্চাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ ভারত থেকে ব্রাহ্মণদের আগমনে উৎসাহ দেন। বল্লাল সেন কঠোর বর্ণপ্রথা প্রতিষ্ঠার জন্য তথাকথিত ‘কৌলীন্যবাদ’ চালু করেন। প্রাচীনকালেও বাংলা কখনো বৈদিক সংস্কৃতির অংশ ছিল না। মৌর্য আমলে উত্তরবঙ্গ আর্য প্রভাবের অধীনে এলেও কিংবদন্তিতুল্য মৌর্য সম্রাট অশোক নিজে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর এই অঞ্চলে ক্রমেই মাথা তুলতে থাকা ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য থমকে যায়। এরপর হিন্দু রাজা শশাঙ্কের (৬০৬-৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) তিন দশকের শাসনকালে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও বর্ণপ্রথার একটি সংক্ষিপ্ত পুনরুজ্জীবন ঘটে; শশাঙ্ক ছিলেন বৌদ্ধধর্মের তীব্র বিরোধী। তবে অষ্টম শতকে বৌদ্ধ পালরা তাদের রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্থান আবার থেমে যায়। তবু পাল রাজবংশ (৭৫০-১০৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ব্রাহ্মণদের প্রতি চরম শত্রুতা পোষণ করত না; তাদের ধর্মীয় আচার পালনের অনুমতি দিয়েছিল এবং কিছু অনুদানও দিয়েছিল। ১১ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ পূর্ববঙ্গে বর্মণদের এবং গৌড়ে সেনদের উত্থানের ফলে পাল বংশের ক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। বর্মণ ও সেন উভয়েই ছিল গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোর অনুসারী। অবশেষে সেনরা সমগ্র বাংলার শাসক হয়ে ওঠে, যদিও তাদের আনুষ্ঠানিক উপাধি ছিল ‘গৌড়েশ্বর’ বা ‘গৌড়ের অধিপতি’।হেমন্ত সেন ১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম সেন রাজা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এই সময়ের মধ্যেই আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে মুসলিম ধর্মপ্রচারক ও সাধকরা বাংলায় আসতে শুরু করেন। এই ধর্মের একেশ্বরবাদ ও সাম্যের বাণীতে আকৃষ্ট হয়ে স্থানীয় মানুষও সীমিত সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। তবে রাজনৈতিক ইসলামের আগমনের জন্য আরো এক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়েছিল।সেনরা কঠোর হিন্দুধর্মাচার বলবৎ করে, ফলে বৌদ্ধ সংস্কৃতি বহুলাংশে স্থানচ্যুত হয়। সেন শাসকরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। শুধু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রাই সমাজে আধিপত্য করত, আর বাকি সবাইকে শূদ্র শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করে হীন মর্যাদায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাংলায় বৌদ্ধদের পরিকল্পিতভাবে প্রান্তিক করা হয়, তাদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বন্ধ করা হয় এবং বিভিন্নভাবে তাদের নির্যাতন করা হয়। বহু বাঙালি বৌদ্ধ পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পালিয়ে পূর্ববঙ্গে আশ্রয় নেয়। এই চরম স্তরবিন্যাস জনসংখ্যার এক বিশাল অংশকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে, আর এভাবে তুর্কি বংশোদ্ভূত আফগান মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ারুদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির আগমনের মঞ্চ প্রস্তুত হয়ে যায়।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!