• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

পুলিশের টিকিট সমাচার

Reporter Name / ২০ Time View
Update : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

৮০ বছর বয়সী এক ভদ্রলোক এবং মধ্য বয়সী এক নারী কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলেন, অ্যাকসিডেন্ট করার পর থেকে তাঁরা আর ড্রাইভ করেন না। প্রয়োজনে উবার কল করেন। ড্রাইভিং লাইসেন্সটি ফটো আইডি হিসেবে তাঁরা ব্যবহার করেন। যাঁরা ড্রাইভিংয়ে অনিচ্ছুক এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স নেননি, তাঁদের অনেকেই সার্ভিস অন্টারিও (সরকারি অফিস) থেকে বাৎসরিক ফি পরিশোধের মাধ্যমে ফটো আইডি নিয়ে থাকেন। নর্থ আমেরিকায় ড্রাইভিং লাইসেন্স ফটো আইডি হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই আছেন, যাঁরা ড্রাইভ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তারপরও বলা যায়, শীতের দেশে এই নর্থ আমেরিকায় গাড়িহীন জীবন একেবারেই অচল। ড্রাইভিংয়ের সময় নিয়ম ভঙ্গের জন্য পুলিশের টিকিট ছায়া হয়ে আশপাশেই ওত পেতে থাকে এবং গাড়ি পার্কিংয়ে ভুল ও অবহেলার কারণেও রয়েছে টিকিটের ব্যবস্থা। পান থেকে চুন খসলেই খবর আছে!

.

অগ্রজ ফরিদ ভাই হলুদ রঙের পার্কিং টিকিটের এই জরিমানার কাগজের (টিকিট) নাম দিয়েছেন গিফট সার্টিফিকেট। পুলিশের টিকিট সে তাঁর গাড়ির কম্পিউটার থেকে সাদা কাগজে সঙ্গে সঙ্গেই প্রিন্ট করে দেন এখন। ড্রাইভিংয়ের সময় ওয়াশরুমের প্রয়োজন হলে গ্যাস স্টেশন, কফির দোকান (টিম হর্টনস, স্টার বাকস্), শপিং মল কিংবা হোটেলে যেতে হয়। তখন গাড়ি অবশ্যই যথাস্থানে পার্ক করতে হবে। করোনার অনেক আগে একদিন দুপুরে ফরিদ ভাই ডাউনটাউনের এসপ্লানেড স্ট্রিটে অবস্থিত নভোটেল হোটেলে গেছেন ওয়াশরুম ব্যবহারের জন্য। তিনি তখন তাঁর গাড়িটি হোটেলের লবিতে পার্ক করেছিলেন। এটি ড্রপ অফ ও পিকআপ জোন। ডেজিগনেটেড পার্কিং স্পট নয়। ওয়াশরুম থেকে ফিরে হোটেলের লবি থেকেই তিনি দেখতে পান, দুজন পুলিশ সদস্য সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর গাড়ির পাশে। গাড়ির চালককে নাগালে পেলেই তাঁরা জরিমানা করবেন। করিতকর্মা ফরিদ ভাই হোটেলের ভেতরে গ্লাসের ওপাড়ে থেকেই প্রায় দুই ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেললেন। অধৈর্য হয়ে পুলিশ দুজন সাইকেলে চড়ে পিঠ টান দেওয়ার পর ফরিদ ভাই বিজয়ের হাসি দিয়ে ফোন করে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানালেন। এখন আর সেই যুগ নেই, পার্কিং ইন্সপেক্টরদের হাতে আধুনিক ডিভাইস দেওয়া হয়েছে। তাঁরা গাড়ির ছবি তুলতে পারলেই যথেষ্ট। তারিখ, সময়, লোকেশন উল্লেখ করে জরিমানার টিকিট এখন ডাকযোগে বাসায় চলে আসে। প্রযুক্তির কারণে তাঁদের পেশাদারত্ব সহজতর হয়েছে।

.

সকাল ও বিকেলের নির্দিষ্ট একটি সময় ট্রাফিক নিয়মানুযায়ী রাশ আওয়ার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে শহরে। এই রাশ আওয়ারে বিভিন্ন সড়কে লেফট টার্ন করা নিষেধ। কোথাও কোথাও রেড লাইটে রাইট টার্ন নিষেধ।

ড্রাইভিং শুরুর প্রথম দিকে (সম্ভবত ২০০৪ সাল) কিং স্ট্রিট ওয়েস্ট অ্যান্ড আটলান্টিক স্ট্রিটে সকাল নয়টার সামান্য একটু আগে লেফট টার্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই মামা (পুলিশ) আমাকে থামিয়ে বললেন, তুমি আমাকে ইনসাল্ট করেছ! তিনি তাঁর গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসে ছিলেন। আমি আমার বাঁ দিকে একটু বেশি করে ঘাড় ঘোরালে তাঁকে দেখতে পেতাম। এক্সকিউজ মি, তোমাকে কীভাবে ইনসাল্ট করেছি, তুমি একটু বুঝিয়ে বললে ভালো হয়। সে বলল, রাশ আওয়ারে এই আটলান্টিক স্ট্রিটে লেফট টার্ন নিষেধ। আমি তো এখানে বসে আছি, তারপরও তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে লেফট টার্ন করে আমাকে ইনসাল্ট করেছ। তুমি এটার পরের স্ট্রিট জেফারসনে লেফট টার্ন করতে পারতে। এক্সকিউজ মি, আসলে আমি তোমাকে খেয়াল করিনি। তোমাকে দেখলে তো আর আমি বোকার মতো ভুল করি না। আটলান্টিকে লেফট টার্ন না করে জেফারসনে লেফট করা যায়, সেটাও আমি জানি। ‘ভুল সবই ভুল এই জীবনের পাতায় পাতায়’।

.

সাধারণত পুলিশ টিকিট দেওয়ার পর বলে, তোমার কিছু বলার থাকলে তুমি কোর্টে যেতে পারো। বাসায় আসার পর বিকেলে বন্ধু মহিউদ্দিন আহমেদ বিন্দুকে ফোনে জিজ্ঞাসা করি, জীবনের প্রথম টিকিটের জরিমানা কি দিয়ে দেব? না, না, জরিমানা দিয়ো না। জরিমানা দিলে তোমার ইনস্যুরেন্স বাড়বে, কোর্টে যাও। যথারীতি কোর্টে গিয়ে ফর্ম পূরণ করার চার-পাঁচ মাস পর ডাকযোগে চিঠি এল, তোমার আমলনামা থেকে উল্লিখিত টিকিটটি ওয়েভ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো জরিমানা দিতে হবে না। কোনো কারণে মামা নির্দিষ্ট তারিখে কোর্ট উপস্থিত হতে অপারগ ছিলেন, এই জন্য মওকুফ পাওয়া গেল। আপিলের তারিখে কোর্টে পুলিশ উপস্থিত থাকলে চিত্রনাট্য পাল্টে যায়। ব্যস্ততার কারণে অনেকে উকিলের সাহায্য নেন।

.

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com

.

একদিন সকালে সাউথ অব মার্টনে ইয়াং স্ট্রিটের সাউথ বাউন্ডে ড্রাইভিংয়ের সময় মামার খপ্পরে আটকে গেলাম। তিনি লাইট পোস্টের আড়ালে নর্থের দিকে স্পিড ক্যামেরা হাতে শুটিং মুডে ছিলেন। রাস্তার এই অংশটি ধনুকের মতো বাঁকা বা ঢালু (লো-হিল), এ কারণে চলমান গাড়ির গতি দ্রুত বেড়ে যায়। মামা আমাকে থামিয়ে জোড়ালো কণ্ঠে বললেন, সিট টাইট। তিনি আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে গেলেন। ফিরে এসে টিকিট দিয়ে বললেন, তোমার গাড়ির গতি বেশি ছিল, এই নাও তোমার টিকিট। তুমি জরিমানার টাকা যথাসময়ে জমা দিও, যদি কোর্টে গিয়ে আপিল করো, তাহলে তোমার জরিমানার অঙ্ক এখনই বাড়িয়ে দেব। বললাম, এক্সকিউজ মি, মামা তুমি যদি ক্যামেরাটা আমাকে একটু দেখাও তাহলে ভালো হয়। আমার গাড়ির স্পিড কত ছিল? মামা তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন, টিকিট ফেরত দাও এবং সিট টাইট। তোমাকে আরেকটি টিকিট দেব। টিকিটসহ আমার হাত সরিয়ে নিয়ে বলি, আচ্ছা মামা, আমার ভুল হয়েছে। ক্যামেরা দেখাতে হবে না। আমি সুবোধ বালকের মতো তোমার উল্লিখিত জরিমানা যথাসময়ে পরিশোধ করব। “‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা তখন আমার। পরদিনই কোর্টে গিয়ে আপিল করি। চার-পাঁচ মাস পর ডাকযোগে চিঠি আসে, তোমার আমলনামা থেকে টিকিট ওয়েভ করা হয়েছে। তখন পুলিশ মামাকে উদ্দেশ্য করে বলি, ‘পিচঢালা এই পথটারে ভালোবসেছি/ তার সাথে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছি/ রংভরা এই শহরে যতই দেখেছি/ আরে গোলকধাঁধার চক্করে ততই পড়েছি’।

.

আমি ইস্ট বাউন্ডে ড্রাইভিংয়ে ছিলাম, বাসায় ফিরতে হলে ওয়েস্ট বাউন্ডে ড্রাইভ করতে হবে। বাসায় ফেরার জন্য আমার বাঁ দিকে নর্থ বাউন্ডের ওয়ান-ওয়ে স্ট্রিটের গলির মুখে ঢুকে সঙ্গে সঙ্গেই ইউ টার্ন করি। ওয়ান-ওয়ে নির্দেশনার কালো রঙের সাইনটি গ্রীষ্মের ঝুলন্ত ফুলগাছের আড়ালে থাকায় আমার নজর কাড়েনি। রাস্তার সাউথে কনস্ট্রাকশন কাজের তদারকিতে ছিলেন এক পুলিশ মামা। তিনি সাইকেল পুলিশের সঙ্গে গল্পরত অবস্থায় আমাকে লক্ষ করেন। আমার ভুল ইউ টার্ন দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিষয়টি সাইকেল পুলিশের দৃষ্টিগোচরে আনেন। ‘পড়বি পড় মালির ঘাড়ে…’। বিনা পরিশ্রমের শিকার তো আর এত সহজে হাতছাড়া করা যায় না। তিনি সাইকেলসহ দৌঁড়ে এসে আমাকে পাকড়াও করলেন। যদিও তিনি নিজের চোখে আমার ভুল প্রত্যক্ষ করেননি। টিকিট নিয়ে আপিল করার পর কোর্টের তারিখ এল ডাকযোগে। কোর্টে উপস্থিত হওয়ার পর দেখি, মামা অনুপস্থিত। বেঞ্চ ক্লার্ক সবাইকে জানালেন, আজ সরাসরি জরিমানার টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়, তাঁদের নিচতলার পেমেন্ট অফিসের পিওএস টার্মিনাল ডিসঅর্ডার। সবাইকে তিনি টাকা পরিশোধের জন্য সম্ভাব্য অফিসের ঠিকানা ও নির্দেশনার কাগজ হস্তান্তর করলেন। পুলিশ অনুপস্থিত থাকলে আমার টিকিট ওয়েভ হওয়ার কথা। সেটি আর হলো না। দুই-তিন দিন পর ডাউনটাউনের অফিসে টাকা পরিশোধের জন্য গেলে জানতে পারি, আমার টিকিট ওয়েভ হয়েছে। কারণ, কোর্ট থেকে আমি চলে আসার পর পুলিশ উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি লেট-লতিফ হওয়ার কারণে বিচারক আমার টিকিট ওয়েভ করেছেন। এটি শুরুতেই হওয়ার কথা ছিল।

.

সব সময়ই একটু পরপর তিনটা মিররে চোখ রাখি। রেড লাইটের খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য লেফট টার্ন করার সময় দ্রুত টার্ন করতে গিয়ে ডান দিকে তাকাতে ভুলে গিয়েছি। ইন্টারসেশনের ডান দিকের রেড লাইটে প্রথমেই মামা দণ্ডায়মান ছিলেন। ঝড়ের বেগে আকাশসমান পাহাড় হয়ে তিনি আমার বাঁ পাশে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের আড়ালে থাকা অডিও রেকর্ডার অন করে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাকে কেন থামিয়েছি জানো? না, জানি না। তুমি রেড লাইটে লেফট টার্ন করেছ। এক্সকিউজ মি, আমি কি কথা বলতে পারি। হ্যাঁ, বলো। আমি রেড লাইটে লেফট টার্ন করিনি। আমি লেফট টার্ন করার সময় ইয়োলো থেকে রেড হয়েছে, গ্রিন লাইটের সময় আমি ইন্টারসেকশনের মাঝে ছিলাম। তোমার কাগজপত্র দাও। ১৪০ ডলার ও ২৪০ ডলারের টিকিট দিয়ে বললেন, তোমার গাড়ির স্পিড বেশি ছিল, এখানে বাইক লেন আছে, এ জন্য তোমার সতর্ক থাকা উচিত। ইচ্ছা করলে তুমি কোর্টে যেতে পারো। গত দুই দশকে কোর্টে আপিল করার সময় কখনোই আমি দোভাষীর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করিনি এবং কোনো উকিল নিয়োগ করিনি। এবার কেন জানি না, ফর্ম পূরণের সময় আমার ইনটুইশন দোভাষীর জন্য বক্সে টিক চিহ্ন দিতে সায় দিল। চার-পাঁচ মাস পর ডাকযোগে চিঠি পেয়ে নির্দিষ্ট তারিখে কোর্টে উপস্থিত হই। বেঞ্চ ক্লার্ক বললেন, একটু অপেক্ষা করো, দেখি পুলিশ তোমার ফাইলে কী নোট লিখেছে। তিনি তাঁর কম্পিউটার থেকে চোখ তুলে বললেন, কোর্ট শুরু না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো প্লিজ। ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি, আমরা মাত্র ১০-১২ জন। দোভাষী মামাও লেট–লতিফ। যথারীতি আদালত শুরু হওয়ার পর আমার নাম উচ্চারিত হলে মহামান্য বিচারক জানান, ইউ আর ফ্রি টু গো। দুটি টিকিটই ওয়েভ করা হয়েছে। ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’!

.

মজুমদার ভাই সব সময়ই টিকিট নিয়ে কোর্টে আপিল করার সময় দোভাষীর জন্য অনুরোধ জানাতেন। তাঁকে বলেছি, যে ব্যক্তি ইংরেজি ভাষায় ভাব আদান-প্রদানে অথবা কথা বলায় দুর্বল, তাঁর জন্য দোভাষী প্রয়োজন। আপনি কোর্টে কেন দোভাষীর সাহায্য নেন? আপনার তো দোভাষীর প্রয়োজন নেই। বললেন, আরে জানেন না তো, দোভাষী অনুপস্থিত থাকলে টিকিট মাফ, কেস ডিসমিস।

ইন্টারসেকশনে রেড লাইটে ক্যামেরা আছে। গাড়ির অবস্থান, তারিখ, সময়, ছবিসহ ৪৫০ ডলারের টিকিট ডাকযোগে বাসায় চলে আসে। ড্রাইভিংয়ের সময় সেলফোন হাতে নিয়ে কথা বলা এবং ফেসবুকে যাওয়া নিষেধ। এ–জাতীয় অপরাধ সাইকেলে চলমান পুলিশের নজরে এলে কিংবা পুলিশের ক্যামেরায় ধরা পড়লে প্রায় ৬৫০ ডলারের টিকিট এবং তিন পয়েন্ট ডিমেরিট। গাড়িতে সবার জন্য সিট বেল্ট ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। সিট বেল্ট ব্যবহার না করলে ২০০ ডলারের টিকিট। রেড লাইটে থেমে থাকা গাড়িতে সাইকেল পুলিশ উঁকি দিয়ে পরীক্ষা করেন। রাস্তায় চলমান ট্রাফিকের কারণে ইন্টারসেকশনের বক্সে আটকে থাকার পর রেড লাইট হলে ৪৫০ ডলারের টিকিট। এই আইন নতুন নাজিল হয়েছে, অনেকেই জানেন না। এসবের জন্যও কোর্টে যাওয়া যায়। টিকিট থেকে রক্ষা পেতে চাইলে সাবধানতার (ডিফেন্সিভ ড্রাইভিং) কোনো বিকল্প নেই। তারপরও ‘ছায়া হয়ে তবু পাশে রইব’ গানের বাণীর মতো তাঁরাও আমাদের আশপাশেই থাকেন অহর্নিশ।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!