• মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৫ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

বিন্দুর আবর্তে

Reporter Name / ০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

সকালে ঘুম ভাঙতেই সারা বাড়িতে একটা শোরগোল লেগে গেল। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে যাওয়া অয়নের মেজাজ তখন চড়কগাছে।
‘বড় মামির অভ্যাস কি কোনো দিন ঠিক হবে না!’ চরম বিরক্তিতে বিছানা ছেড়ে নিদ্রালস চোখে উঠোনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে অয়ন।

সাত সকালে এত হইচইয়ের কারণ অন্বেষাকে নাকি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফোনে বারবার রিং হচ্ছে, কিন্তু রিসিভ করছে না। এতে মা, ছোট মামি আর মামাদের চেয়ে বড় মামির দুশ্চিন্তাই যেন বেশি। অযাচিত বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি আর পুরো বাড়ি মাথা তোলা তার পুরোনো স্বভাব। যদিও বিষয়টা মোটেও অহেতুক নয়; তবে অয়ন জানে তার বোন কোথায়।

মাঘের শীতের অলস প্রভাতে গ্রামের মেঠো পথ ধরে গন্তব্যহীন হেঁটে চলেছে অন্বেষা। গায়ে কেবল একখানি ধূসর শাল। কুয়াশা মাঠের বুকে এমনভাবে শুয়ে আছে, যেন পৃথিবী তার সমস্ত স্মৃতিকে শুভ্র কাফনে ঢেকে রেখেছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মাড়িয়ে অন্বেষা দ্রুত হাঁটছে সীমান্তর হাত ধরে, প্রচণ্ড নির্ভার আর নিশ্চিন্তে। সম্ভবত এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ সে।

.

সীমান্তর জীবনে অন্বেষা এসেছিল ঠিক ভোরের প্রথম সূর্যালোকের মতো। নিঃশব্দে, ধীরে অথচ সমস্ত অন্ধকার সরিয়ে। প্রথম দিন তাদের কোনো কথা হয়নি। এরপর দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে গেছে কেবল চোখে চোখ পড়ে। সে সময় সীমান্ত বুঝেছিল, মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ভাষা ‘শব্দ’ নয়, বরং নীরবতারও নিজস্ব এক ভাষা আছে, সবাই তা পড়তে পারে না। পছন্দের মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে চমৎকার মুহূর্ত হলো চোখের ভাষায় কথা বলা। দুজন মানুষ অপলক তাকিয়ে থাকে, মুখে কিছু না বলেও কত কিছু বলা হয়ে যায়। অন্বেষার মায়াভরা চোখের চাহনিতে যে আত্মার শান্তি অনুভব হয়, তার কাছে মোনালিসার হৃদয়নিংড়ানো হাসিও তুচ্ছ, বাবর আজমের অনিন্দ্য কভার ড্রাইভও নিতান্তই সামান্য এক সৌন্দর্য।
সেই নীরবতা নিয়ে সীমান্ত লিখেছিল—
‘নির্জনা নিশীথে নিভৃত নির্মল নির্যাস
নয়া নক্ষত্রের নোঙর নাচে নিস্তব্ধ নিশ্বাস
নিবিড় নশ্বর নীড়ে নিত্য নন্দন
নিঃশব্দ নতশিরে নীরবতার নম্র নিবেদন।’

প্রেমে পড়ে যায় সীমান্ত। হৃদয়জুড়ে নেমে আসে ফাগুনের মাতাল হাওয়া। উতলা মন আটকে যায় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। ছোট ছোট কল্পনায় অজান্তেই সেই মানুষটা হয়ে ওঠে তার একান্ত আসক্তি। অশান্ত অনুভূতিগুলো একবার ইচ্ছে করে লুকাতে, আবার পরক্ষণেই চায় অন্তরাত্মার সমস্ত গোপন দুয়ার উন্মুক্ত করে দিতে।
সীমান্ত তার ভালোবাসার কথা মুখফুটে বলতে পারেনি। হলুদ খামে মোড়ানো চিঠি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পৌঁছে যায় অন্বেষার হাতে।
‘শোনো মিষ্টি মেয়ে,
তোমার স্বপ্নগুলোর আবর্তে প্রজাপতির ডানায় আলতো স্পর্শে আমাকে সঙ্গে নেবে? হাসনাহেনার ঘ্রাণ আর ঝিঁঝিপোকার শব্দে পূর্ণিমার চাঁদ হব তোমার আকাশে। শহরের নিয়ন আলোর নিচে প্রস্তর পথ ধরে একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজব দুজন। তুমি পরবে শাড়ি, খোপায় বেঁধে দেব ঝরা বকুলের মালা। নন্দন কাননে ছুঁয়ে যাবে মেঘমল্লার সুর। পূর্ণতার শতদলে কাঁপন তোলা আবর্তময়ী অব্যর্থ দাওয়াই তুমি। মল্লিকার প্রেমাতুর স্পন্দনে রবের তরে তোমার প্রার্থনাতে ভালোবেসে রেখো আমায়।
’

.

লাজুক হাসিতে অন্বেষা বলেছিল, ‘তোমাকে চাওয়ার আকুলতাই আমার ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পূর্ণতা। মানুষকে পাওয়ার চেয়ে তাকে হৃদয়ের অন্তঃপুরে অনন্তকাল অনুভব করা অনেক বেশি সুন্দর।’
সীমান্ত কোনো উত্তর দেয়নি। সে জানত ভালোবাসা নদীর মতো। বাইরে যত শান্তই দেখাক, ভেতরে–ভেতরে তার স্রোত পাড় ভাঙে। কখনো বসন্তের পলাশ, কখনো শ্রাবণের অবিরল বর্ষণ, আবার কখনো শীতের শুষ্কতা। তবু সম্পর্কগুলো বেঁচে থাকে ভালোবাসা, সম্মান আর বিশ্বাসে।

অয়নের ফোন পেয়ে সংবিৎ ফেরে সীমান্তর। জানায়, ফিরতে কিছুটা দেরি হবে।
একটা ডিঙি নৌকায় অন্বেষাকে নিয়ে নদীর ওপারে যায় সীমান্ত। অন্বেষাকে আজকের মতো এত খুশি, এত প্রাণোচ্ছল আগে কখনো দেখেনি সে। তাদের প্রেমে খুনসুটি ছিল, আবেগ ছিল, ছিল হৃদমহলে শ্রেয়সীর আবদার। আবার কখনো নীহারিকার আবছায়ার মতো ক্ষণিকের বেদনার লহরীতে সজল হয়েছে ময়ূরাক্ষীর নয়ন।
তাদের কঠিন সময় শুরু হয় যখন সীমান্ত চাকরিতে যোগদান করে। ব্যস্ততা বাড়ে দুজনেরই। সঙ্গে বাড়তে থাকে দূরত্ব। চোখের আড়াল হতেই যেন মনের আড়াল হয়ে যায়। অভিযোগ আর অবিশ্বাসের সূক্ষ্ম কাঁটা বিঁধতে থাকে সম্পর্কে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুজনের মধ্যে জমতে লাগল অনুচ্চারিত অভিমান। আর সেই অন্তঃপুরে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকল বিষণ্নতার শেওলা।
হঠাৎ একদিন অন্বেষা বলেই বসল—
‘তোমার শত অবহেলার মধ্যে আমাকে কি একটু ভালোবাসা যায়? তোমার আচরণে আঘাত পেয়েছি, কিন্তু কোনো অভিযোগ করিনি, চাপা আর্তনাদ আর চিৎকারে পাঁজর ভেঙেছি, তবু নীরবে সয়ে গেছি। কিন্তু শেষ আঘাতটা রুহ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আমাদের আর কখনো দেখা না হোক।’

.অব্যক্ত অপেক্ষা.

সীমান্তর মনে তখন অজানা ভয়। অন্বেষাকে হারানোর শঙ্কা। তাই আর কালক্ষেপণ না করে সীমান্ত বলে দেয়—
‘অনেক তো হলো, চলো এবার বিয়েটা করে ফেলি। রাগ, অভিমান, ঝগড়া যা আছে, বিয়ের পরের জন্য তোলা থাক।’
দ্বিধায় পড়ে যায় অন্বেষা। চোখ বেয়ে পড়তে থাকে আনন্দের অশ্রু। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
‘এমন কোনো ভুল কোরো না সীমান্ত, যেটা শোধরানো যায় না।’
‘ভুল না। বাবা বলেছেন, বাড়ির বড় মেয়েকেই বড় বউ হিসেবে বেশি মানায়।’

এই ভাঙা–গড়ার মধ্যেই বিয়েটা হয়ে যায়। ঠিক অন্বেষার স্বপ্নের মতো, মসজিদে ছোট আয়োজনে। এরপর যেন জাদুর মতো সব ঠিক হয়ে গেল। গত দেড় বছরে কখনো ভুল–বোঝাবুঝিও হয়নি। স্মৃতির মেদুর আলোয় মাখা দিনগুলো দিশারি হয়ে ধরা দিল নিপবনে।

মামাতো বোনের বিয়ের দাওয়াতে গতকাল গ্রামে এসেছে অন্বেষা। কিন্তু বিয়েবাড়িতে এত আনন্দের মধ্যে তার ভেতরে একটা অব্যক্ত শূন্যতা, অজ্ঞাত বিষাদের ছায়া। বিকেলের দিকে সে ফোন করে সীমান্তকে।
‘তুমি কোথায়?’
‘অফিসে, কেন?’
‘আমাকে প্লিজ নিয়ে যাও। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
দুই দিন পরে যাওয়ার কথা থাকলেও সীমান্ত ছুটে বেরিয়ে পড়ল বাইকে। শেষ বিকেলের অস্তরাগের রক্তিম আভায় মলিন শহরের যানজট, মানুষের ভিড়, লাল-সবুজ সিগন্যাল সবকিছু তার কাছে নিষ্ঠুর উপহাস মনে হতে লাগল।

বড় মামি বারবার ফোন করে দ্রুত বাসায় ফিরতে বলছে। কিন্তু অন্বেষার এখনই যেতে ইচ্ছে করছে না। নির্ঝরিণীর মৃদু কল্লোলে বিভোর হয়ে সীমান্তর কাঁধে মাথা রেখে নদীর পাড়ে পাটাতনের ওপর বসে আছে সে। কিছু ভাবছে। হয়তো রোদে ঝলমল শর্ষে ফুলে ভ্রমর এসে কানে কানে বলছে—
জীবনটা রূপকথা হবে না ঠিকই, কিন্তু যার পরশে অহর্নিশ রক্তের সঞ্চার হয়, তাকে আঁকড়ে ধরেই আঁকতে হয় শাশ্বত স্বর্ণালি ক্যানভাস। নিরন্তর যত্ন, নীরব ক্ষমা, অপ্রকাশিত মায়া আর একে অপরকে হারিয়ে না ফেলার অভিলাষ ভালোবাসার সার্থকতার অনবদ্য অনুকম্পা।

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!