• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

বাবাকে হারিয়ে দিনমজুর, সেই আরাফাত পেলেন জিপিএ-৫

Reporter Name / ৬ Time View
Update : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

ভোরে ঘুম থেকে জেগে পড়াশোনা, পরে একটু বেলা হলেই জীবনের তাগিদে মাঠে ছুটে যাওয়া। দিনমজুরের কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা—এভাবেই চলছিল ১৮ বছরের তরুণ আরাফাত হোসেনের জীবন। সপ্তাহে চার দিন হাড়ভাঙা শ্রম আর বাকি তিন দিন বাবার রেখে যাওয়া ভাঙাচোরা সাইকেল চালিয়ে ছয় কিলোমিটার দূরের কলেজে যাতায়াত করতেন তিনি।

এলাকার মানুষের কাছে আরাফাত দিনমজুর হিসেবে পরিচিত হলেও, এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

আরাফাত রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাগমারা পশ্চিমপাড়ার প্রয়াত আবুল কাশেমের ছেলে। তিনি ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন। গত শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তাঁর এই সাফল্যে পরিবার ও এলাকাবাসী আনন্দিত।

.

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আরাফাতের বাবা আবুল কাশেম মারা যান। বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবার মৃত্যুর পর চার বছরের ছোট ভাই ও মায়ের দায়িত্ব এসে পড়ে কিশোর আরাফাতের কাঁধে। সংসারের চাকা সচল রাখতে মা শিল্পী খাতুন স্থানীয় কিছু শিশুকে প্রাইভেট পড়াতে শুরু করেন এবং আরাফাত পানবরজে শ্রমিকের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে নামেন। এসএসসি পাসের পর সংসারের চাপ আরও বাড়ায় পুরোদমে দিনমজুরের কাজে নামতে হয় আরাফাতকে। কঠোর পরিশ্রম ও আর্থিক সংকটে এসএসসিতে আশানুরূপ ফল না পেলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। বাড়ি থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে ওই কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন।

.

গতকাল রোববার দুপুরে আরাফাতের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি তখন তাঁর চাচার পানবরজে কাজ করছিলেন। খবর দিয়ে তাঁকে ডেকে আনা হয়। পরে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার ও শনিবার ছাড়াও সপ্তাহের যেসব দিনে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকত না, সেই দিনগুলোতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। সাধারণত সপ্তাহে তিন দিন তিনি কলেজে যেতেন। তিনি পানবরজে কাজের পাশাপাশি ধান কাটা ও মাটি কাটার কাজও করেছেন। তাঁর তেমন ভালো পোশাক ছিল না; এক জোড়া পোশাক পরেই দুই বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। তবে মা সব সময় সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বলেই তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়নি।’

আরাফাত আরও বলেন, অভাবের কারণে সব গাইড বা সহায়ক বই কিনতে পারেননি। তবে কলেজের শিক্ষকেরা বই ও নানাভাবে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন।

.

‘দিনমজুরি করে শত বাধা ও অভাব-অনটনের মধ্যেও অধ্যবসায়ের জোরে আরাফাত অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার এই সাফল্যে পুরো কলেজ পরিবার গর্বিত। উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের আরাফাতের পাশে এগিয়ে আসা উচিত।’

মামুনুর রশিদ, কলেজের শিক্ষক, ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

.

ছেলের এমন সাফল্যে গর্বিত মা শিল্পী খাতুন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে মানুষের কাজ করে ও কষ্ট করে আরাফাত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। তাঁকে নিয়মিত তিন বেলা খাবার বা ভালো পোশাক কিনে দিতে পারেননি। সংসার চালাতে আজও তাঁদের খুব কষ্ট হয়। ইচ্ছে আছে ছেলেটাকে শহরে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষিত করার, তবে সামর্থ্য কতটুকু কুলোবে জানি না।’

আরাফাতের প্রতিবেশী এবং ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘দিনমজুরি করে শত বাধা ও অভাব-অনটনের মধ্যেও অধ্যবসায়ের জোরে আরাফাত অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার এই সাফল্যে পুরো কলেজ পরিবার গর্বিত। উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের আরাফাতের পাশে এগিয়ে আসা উচিত।’

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!