• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

গবেষণার তথ্য: ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে নারীর প্রতি সহিংসতা বেশি

Reporter Name / ১৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ডিজিট্যালি রাইটের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, অনলাইনে প্রযুক্তিসহায়ক ৮ ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন প্রায় ৪৬ শতাংশ নারী। সক্রিয়ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের মধ্যে এ হার প্রায় ৬৪ শতাংশ। এ বছরের ৭ থেকে ১৩ জানুয়ারি ১৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ৫২১ কিশোরী ও নারীর ওপর জরিপ চালিয়ে গবেষণাটি করা হয়।

‘অ্যাবিউজ বিয়ন্ড দ্য স্ক্রিন’ (পর্দা ছাপিয়ে সহিংসতা) শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটের সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকা এবং উপজেলায় এ জরিপ চালানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণী ও শিক্ষিত নারীরা এ ধরনের সহিংসতার বেশি শিকার হচ্ছেন।

যে ৮ ধরনের সহিংসতা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে—হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক শোষণ, অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রতারণা, যৌন ও ছবিভিত্তিক নির্যাতন, পরিচয়ের অপব্যবহার ও ভুয়া আইডি–সংক্রান্ত সহিংসতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (প্রাইভেসি) লঙ্ঘন ও সাইবার স্টকিং, সুসংগঠিত সাইবার আক্রমণ, অ্যানোনিমাস অ্যাপের ব্যবহার (নাম–পরিচয় গোপন রেখে যৌন হয়রানি) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বা ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে সহিংসতা। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে যাঁরা টিএফজিবিভির শিকার হয়েছেন, তাঁদের ৫৭ শতাংশের বেশি গত ১২ মাসে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন।

.

গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণী ও শিক্ষার্থীরা এ ধরনের অনলাইনভিত্তিক বা প্রযুক্তিসহায়ক সহিংসতার শিকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। এ হার ৪৯ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় পাস নারীদের মধ্যে সহিংসতার অভিজ্ঞতার হার প্রায় ৭৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণী, শিক্ষার্থী ও উচ্চশিক্ষিত নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

আট ধরনের সহিংসতার মধ্যে হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক শোষণের শিকার হয়েছেন সবচেয়ে বেশি নারী—প্রায় ৫৩ শতাংশ। তুলনামূলক বেশি বয়সী নারী ও গৃহবধূরা অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন বেশি। ভুয়া তথ্যের ফাঁদে ফেলে তাঁদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সহিংসতার শিকার নারীর হার ৩৭ শতাংশ।

যৌন ও ছবিভিত্তিক সহিংসতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী; এ হার প্রায় ২৫ শতাংশ। এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নারীর মুখাবয়ব ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিকৃত করে ব্ল্যাকমেল করার প্রবণতাও দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাবেক প্রেমিকেরা নারীদের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। মানহানি করতে দলবদ্ধভাবে নারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বা পোস্টে হামলা ও ব্যঙ্গ–বিদ্রূপ করা হচ্ছে।

.

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুক ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে নারীরা সবচেয়ে বেশি অনলাইন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের প্রায় ৪০ শতাংশ মেসেঞ্জারের চ্যাটবক্সে এবং প্রায় ৩৭ শতাংশ ফেসবুকে সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

গ্রামের নারী ও অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যরা ইমো ও টিকটকের মাধ্যমে বেশি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে শহরের নারীরা ব্ল্যাকমেল ও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার শিকার হচ্ছেন বেশি।

সহিংসতার শিকার হয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে অভিযোগ করা নারীদের ৫৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্ল্যাটফর্মগুলো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

.

সহিংসতার শিকার নারীদের মধ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লক করার প্রবণতা বেশি। এ হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। ভয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন ২১ শতাংশ নারী। মাত্র ৫ শতাংশ নারী পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নারীদের প্রায় ৮২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের মামলায় অগ্রগতি সামান্য অথবা কোনো অগ্রগতিই হয়নি। প্রায় ৭২ শতাংশ নারী মনে করেন, অনলাইনে সহিংসতার শিকার হলে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়।

.

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, জরিপে উঠে এসেছে, এ সহিংসতা একটি পদ্ধতিগত সংকট। সংকটের কারণ ও সমাধান নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। নারীর প্রতি বৈষম্য বন্ধ না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নতুন নতুন রূপ দেখা দিতে থাকবে।

ডিজিটালি রাইটের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তিসহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিস্তার, নারীর ওপর এর প্রভাব এবং তা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে এ গবেষণায়।

গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অপরাধ ছড়াচ্ছে। প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিকারের ব্যবস্থা না নিলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। এ দেশে এসব প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি থাকতে হবে।

.

উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম বলেন, ভুক্তভোগীদের সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। থানাগুলো এখনো এ সেবা দিতে পুরোপুরি সক্ষম নয়। ভুয়া আইডি ব্যবহারকারী অপরাধীর প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। গবেষণাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধান গবেষক সায়েমা চৌধুরী। গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান এবং ডিজিট্যালি রাইটের গবেষণাপ্রধান আবদুল্লাহ তিতির। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার সম্পাদক রীনা আহমেদ।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!