
রাঙ্গুলিতে রয়েছে পার্পল ডিলাইট, মুরাসাকি, হাকুহো, ক্রাসুলা, জেড প্ল্যান্টসহ নানা জাতের গাছ।
একেকটি গাছের দাম ১০০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।
বাণিজ্যিকভাবে গাছ উৎপাদনের জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকায় ছাদ ভাড়া নেন।
ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম–সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কুরিয়ারে যায় গাছ।
.
শুরুটা হয়েছিল শখের বশে। আর শখটা ছিল নিজের সংগ্রহে কিছু ব্যতিক্রমী গাছ রাখার। তাই ছাদে বাগান করলেন। গাছের প্রতি এই ভালো লাগাই একসময় রূপ নেয় ব্যবসায়। সে জন্য ছাদ ভাড়া নিয়ে এখন গাছের চারা উৎপাদনে খুব মনোযোগী ইয়াসমিন খান। ‘রাঙ্গুলি’ নামে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রি করেন নানা ধরনের শৌখিন গাছ।
আলাপকালে ইয়াসমিন খান প্রথম আলোকে বলেন, রাঙ্গুলি অর্থ রঙের বাহার। এই পেজে পাওয়া যায় বিভিন্ন রঙের ফুল ও পাতার গাছ। বর্তমানে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকার গাছ বিক্রি হচ্ছে।
ইয়াসমিন খানের এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন তাঁর স্বামী কে এম মঈনউদ্দীন। শখের বাগান বড় করতে গিয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন, ব্যতিক্রমী গাছের প্রতি মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে ঘর ও বারান্দা সাজানোর জন্য ছোট আকারের গাছ এবং ঝুলন্ত টবে লাগানোর উপযোগী গাছের চাহিদা বেশি। সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়েই তাঁরা শখের বাগানের বাণিজ্যিক রূপ দেন।
করোনাকালে রাজধানীর রামপুরায় নিজেদের বাসার ছাদে গাছের সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু জায়গার সংকট ও অন্যদের সঙ্গে ছাদ ব্যবহার নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তখন পাশের একটি ভবনের ছাদ ভাড়া নেন। মাসে ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। এখন সেখানেই গাছের চারা তৈরি, পরিচর্যা, অনলাইনে বিক্রির জন্য ছবি তোলা ও ভিডিও তৈরি করা এবং ক্রেতাদের কাছে গাছ পাঠানোর সব কাজ চলে। কাজের সুবিধার জন্য দুজন লোকও রেখেছেন। ইয়াসমিন খান বলেন, ‘শখটা একসময় নেশায় রূপ নেয়। অবশেষে নেশাটাকেই পেশায় পরিণত করি।’
.
গাছ থেকেই নতুন চারা
রাঙ্গুলির ব্যবসার অন্যতম কৌশল হলো, গাছের ডাল বা শাখা কেটে নতুন চারা তৈরি করা। ইয়াসমিন খান জানান, অনেক গাছের ডাল ছোট ছোট অংশে কেটে টবে লাগানো যায়। উপযুক্ত পরিচর্যায় সেখান থেকে তৈরি হয় নতুন গাছ। এভাবে একটি গাছ থেকে একাধিক গাছ তৈরি করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে ‘রুবি নেকলেস’ নামের একটি গাছের উদাহরণ দেন তিনি। ঝুলন্ত টবে রাখলে গাছটি দেখতে সুন্দর লাগে। রোদ পেলে এর রং বেগুনি আভা ধারণ করে। গাছটির চাহিদাও ভালো বলে জানান তিনি। আকার ও ঝোপালো হওয়ার ওপর নির্ভর করে এ ধরনের একটি গাছের দাম টবসহ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা হতে পারে।
ইয়াসমিনের ভাষ্য, একটি গাছ থেকে নিয়মিত কাটিং নিয়ে নতুন চারা তৈরি করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো যায়। ফলে প্রতিবার নতুন গাছ কিনে সংগ্রহ বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না। গাছের জাত, বৃদ্ধির গতি ও পরিচর্যার ওপর উৎপাদন ও বিক্রির পরিমাণ নির্ভর করে।
.
সাকুলেন্ট, ক্যাকটাসসহ নানা জাতের গাছ
রাঙ্গুলিতে রয়েছে সাকুলেন্ট, ক্যাকটাসসহ নানা ধরনের শৌখিন গাছ। ইয়াসমিন জানান, সাকুলেন্টের মধ্যে পার্পল ডিলাইট, মুরাসাকি, হাকুহো, ক্রাসুলা, অরুণ পেই, রোজ, মাউন্টেন রোজ, অ্যানোনিয়াম ও জেড প্ল্যান্টের মতো বিভিন্ন জাত রয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে তাঁদের সংগ্রহে সাকুলেন্টের প্রায় ৩০০ ধরনের জাত আছে।
গাছের ধরন, আকার ও পরিপক্বতা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত ছোট সাকুলেন্টের দাম ১০০ টাকা হয়। বড় ও বিরল জাতের সাকুলেন্টের দাম ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা হতে পারে। অন্যদিকে ক্যাকটাসের দাম শুরু হয় ১৫০ টাকা থেকে। আকার ও জাতভেদে কিছু ক্যাকটাসের দাম ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা হয়ে থাকে।
গাছের বংশবিস্তারের আরেকটি পদ্ধতিও দেখান ইয়াসমিন। তাঁর সংগ্রহের কিছু সাকুলেন্টের পাতা থেকেই নতুন চারা জন্মায়। একটি পাতা থেকে চারা গজাতে শুরু করলে সেটি আলাদা করে বড় করা যায়। ইয়াসমিন খান বলেন, এসব গাছ তুলনামূলক দ্রুতগতিতে বাড়ে। উপযুক্ত কাটিং থেকে তৈরি চারা দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে বিক্রির উপযোগী হতে পারে।
.
অনলাইনেই বিক্রি
রাঙ্গুলির বিক্রির প্রধান মাধ্যম অনলাইন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাছের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর ক্রেতারা অর্ডার দেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গাছ পৌঁছে দিতে তাৎক্ষণিক পার্সেল সরবরাহসেবার সহায়তা নেওয়া হয়।
ইয়াসমিন খান জানান, পরিবহনের সময় গাছ যেন ভেঙে না যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হয়। এ জন্য গাছ কার্টনে ভরে প্যাকেট করা হয়। ঢাকার ভেতরে অনেক ক্ষেত্রেই অর্ডার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা বা এক দিনের মধ্যেই ক্রেতার কাছে গাছ পৌঁছে দেওয়া হয়।
ঢাকার বাইরেও দেশের বিভিন্ন জেলায় গাছ পাঠান তাঁরা। চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে তুলনামূলক বেশি অর্ডার আসে। তবে দূরের জেলায় পাঠানোর সময় গাছের ক্ষতি এড়াতে অনেক ক্ষেত্রে টব থেকে গাছ আলাদা করে প্যাকেট করা হয়। অনলাইনের পাশাপাশি বছরে দু-একবার কোনো কোনো বৃক্ষমেলাতেও অংশ নেন তাঁরা।
.
পরিচর্যা লাগে কম
শৌখিন গাছের ব্যবসায়ে ক্রেতাদের কাছে পরিচর্যার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াসমিন জানান, সাকুলেন্ট ও ক্যাকটাসের পাতায় পানি ধরে রাখার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে অন্যান্য কিছু গাছের মতো এগুলোতে ঘন ঘন পানি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
ইয়াসমিনের মতে, এসব গাছের কিছু জাত ১০ থেকে ১৫ দিন পানি না দিলেও টিকে থাকতে পারে। তবে গাছের জাত, মাটির মিশ্রণ, আলো ও আবহাওয়ার ওপর পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে।
গাছের জন্য তাঁরা সাধারণ মাটির বদলে বালি, ভার্মি কম্পোস্ট, ধানের তুষ ও ইটের কুচি মিশিয়ে বিশেষ মাধ্যম তৈরি করেন। গাছের বৃদ্ধি ও শিকড়ের অবস্থার ওপর নির্ভর করে এক থেকে দুই বছর পর টব ও মাটির মিশ্রণ পরিবর্তন করেন।
বহুজাতিক একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কে এম মঈনউদ্দীন এই উদ্যোগকে এখন বিকল্প পেশা হিসেবে দেখছেন। কখনো চাকরিতে সমস্যা হলে তিনি এখানে পূর্ণকালীন সময় দেবেন বলে জানান।