• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

বিচারের রাজনীতিকরণ ও রাজনীতির বিচারিকীকরণ

Reporter Name / ৯ Time View
Update : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় আইন ও আদালতের একটা প্রধান উপযোগিতা রেজিমের বৈধতা প্রদান করা। তা করার একটি বিশেষ উপায় হলো রাষ্ট্রের প্রধান ও গুরুতর রাজনৈতিক বিতর্কগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় আদালতনির্ভরতা। তাত্ত্বিকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘রাজনীতির বিচারিকীকরণ’। এ প্রক্রিয়ায় ‘রাজনৈতিক আদালত’–এর উত্থান ঘটে এবং রাজনৈতিক পরিসরকে ব্যাপকভাবে বিভাজিত করা হয়।  সরকার তার ক্ষমতা ও বৈধতা-সংক্রান্ত প্রধান প্রশ্নগুলো বা সংস্কারের ইস্যুগুলো আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে সমাধান করে নেয়। বাজেট, নিয়োগ ও পদোন্নতি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রেখে, উচ্চ আদালতে বেঞ্চ পুনর্গঠন করে কিংবা অবসর-পরবর্তী নিয়োগের প্রলোভন সামনে রেখে বিচার বিভাগকে নতজানু করে রাখা হয়। ঘটে ‘বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকরণ’।

এই দুই প্রক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়ায় আরও একটা লক্ষণ প্রকট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক পরিসরে আইনি ডিসকোর্স, বাগাড়ম্বর, বিধি, প্রক্রিয়ার বিস্তৃতি ঘটে এবং নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়াও আধা বিচারিক বিধিবিধান ও প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়।

.

২

বাংলাদেশে রাজনীতির বিচারিকীকরণ নিয়ে কিছু আলোচনা হলেও এর যে প্রধান প্রবণতা এখনো চিহ্নিত করা হয়নি, তা হলো বিচার বিভাগের ‘কৌশলগত দলবদল’। অর্থাৎ, রেজিমের জারি করা সাংবিধানিক সংশোধনীগুলোতে সাধারণত হাত না দেওয়া, এড়িয়ে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনে বৈধতা দেওয়া। গত তিন দশকের বিভিন্ন তুলনামূলক গবেষণায় দেখা যায়, বিচারকেরা সাধারণত সব রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেন। তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং ক্ষমতাসীনদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পতনের অপেক্ষায় থাকেন।

.

কর্তৃত্ববাদী আমলে আদালত শাসকদের হাতের খেলনায় রূপান্তরিত হন, এই পূর্বানুমানও বিচারকদের মধ্যে একধরনের বাড়তি দায়মুক্তির বোধ তৈরি করে। ফলে দেখা যায়, সংবিধানে ব্যাপক কাঁটাছেঁড়া কিংবা সামরিক শাসন জারি হওয়ার পরও সংস্কারমনস্ক বিচারকেরা কখনো কখনো রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ করেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নির্বাহী স্বেচ্ছাচারের ওপর প্রগতিশীল রুল জারি করেন; কিন্তু আইনে জুডিশিয়াল রিভিউর পূর্ণ ক্ষমতা থাকলেও সামরিক আইন কিংবা জরুরি অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো রায় দেন না।

কর্তৃত্ববাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হলে বিচারকেরা কৌশলী ভূমিকায় সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন; রেজিম দুর্বল হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। ফলে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতি আপাত–আনুগত্য প্রদর্শন করলেও রেজিমের পতনের রেখা স্পষ্ট হলেই তার মৌলিক স্বার্থগুলো চ্যালেঞ্জ করা হয়।

.

৩

বাংলাদেশের রাজনীতির বিচারিকীকরণের একটা প্রধান ক্ষেত্র হলো সংবিধান সংশোধনের রাজনীতি। বিচার বিভাগ কীভাবে বিচারিক রক্ষণশীলতা ও কৌশলগত দলবদলের মাধ্যমে ক্ষমতার হাত ধরে চলেছে, তার একটা খোঁজ পাওয়া যাবে সংবিধান সংশোধনী–সংক্রান্ত মামলাগুলোর পটভূমি বিশ্লেষণে। বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৭ বার। উচ্চ আদালত কর্তৃক সংশোধনী বাতিলের ঘটনা ঘটেছে ছয়বার। একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশোধনীগুলো বাতিল করা হয়েছে চলমান রেজিমের চূড়ান্ত পতনের কালে কিংবা অনেক পরের ভিন্ন রেজিমে কিংবা। 

.

সংবিধানের মৌল কাঠামোর প্রথম আমূল পরিবর্তন করা হয় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। দুই সপ্তাহের মধ্যে এই সংশোধনী আদালতের পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে। বিচার্য বিষয় বাহাত্তরের সংবিধানের ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত হাইকোর্টের ‘ইন্টেরিম অর্ডার’ পাস করার ক্ষমতা চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে কি না। কিছুটা সংশয়, কিছুটা জটিলতার ইঙ্গিত দিলেও ‘জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লব’–এর প্রতি অনুমোদনের স্বরই উঠে আসে বিচারপতি মুনীম ও বিচারপতি সায়েমের পর্যবেক্ষণ থেকে। কিন্তু রেজিম পড়ে যাওয়ার পরে ১৯৮১ সালের হাইকোর্ট ঠিকই স্বীকার করে নেন, চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে যে একে ‘আগের সংবিধান বলে চেনাই মুশকিল’ হয়ে পড়েছিল।

.

পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি (১৯৫৪-৬০) মুনীরের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সামরিক শাসনকে বৈধতা দান করেছিলেন ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ দিয়ে। বাংলাদেশের বিচারালয়ে সেই তত্ত্ব সর্বরোগ নিরাময়কারী মহৌষধ হিসেবে পুনরাবৃত্ত হয়ে চলেছে। এমনকি চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পরও সংস্কার কিংবা পুনর্গঠনের পক্ষ-বিপক্ষনির্বিশেষে বহু মহাজনকে এই তত্ত্বের ব্যবহার করতে দেখা যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জারি করা সামরিক শাসন বলবৎ থাকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। পঞ্চম সংশোধনী জারি করে সব সামরিক ফরমান ও কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়া হয়। বিভিন্ন মামলায় সামরিক শাসনের বিষয়টি সামনে আসে। আদালত যথারীতি তার রক্ষণশীলতার বর্ম পরে জানান, সামরিক শাসন আইনবিজ্ঞানের ‘পরিচিত ধারণা’; ‘সাধারণ আইনের আওতার বাইরে কিছু সংশোধনমূলক/সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের স্বার্থে’ জারি করা যায়, কিংবা আদালতের ‘সুপারভাইজরি ক্ষমতা’ সামরিক আইন দ্বারা ‘সম্পূর্ণভাবে বাতিল’ হয়ে যায়।

.

২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ মর্মে প্রদত্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। সরকারি-বেসরকারি প্রচারযন্ত্রে বিপুলভাবে উদ্​যাপিত এই ‘ঐতিহাসিক রায়ের’ মাধ্যমে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিরাট পুঁজি হাসিল করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ।

.

হাসিনাশাহির কবজা করা আদালত জিয়াউর রহমানকে ‘ক্ষমতা-দখলকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার বেসামরিকীরণে বিচার বিভাগেরও ভাগ আছে। বাংলাদেশ আর্মি রেগুলেশন (ভলিউম ১, রুলস)-এর ২৯৩ নম্বর বিধি অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর সদস্যরা কোনো নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না, মর্মে প্রধান সামরিক শাসক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমাদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। আদালত তা খারিজ করে দেন।

.

২০০৫ সালে খায়রুল হক-ফজলে কবীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ যখন ১৯৭৫-৭৯ পর্বের সামরিক শাসনকে বৈধতাদানকারী ৫ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন, তত দিনে হাইকোর্টের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করার দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে পড়েছে, অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াকে দলীয় নিয়োগের প্রবেশদ্বার বানানো হয়েছে এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচারকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের চূড়ান্ত দলীয়করণের প্রাতিষ্ঠানিকীরণ ঘটে গেছে। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ মর্মে প্রদত্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। সরকারি-বেসরকারি প্রচারযন্ত্রে বিপুলভাবে উদ্​যাপিত এই ‘ঐতিহাসিক রায়ের’ মাধ্যমে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিরাট পুঁজি হাসিল করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। 

.

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। বিচার বিভাগ পৃথক্​করণের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির আংশিক বাস্তবায়নের বিনিময়ে উচ্চ আদালতের নিরঙ্কুশ আনুগত্য অর্জন করে।

.

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে সংবিধান স্থগিত করেন। তিনি এপ্রিলেই প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতিকে সরিয়ে তাঁর আজ্ঞাবহ বিচারপতি মুনীমকে প্রধান বিচারপতি করেন। বিনিময়ে সামরিক শাসনের বৈধতা দেন বিচারপতি মুনীম। এরশাদের সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়ে জারি করা সপ্তম সংশোধনীও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয় খায়রুল হক কোর্টে (২০১১-১২)। হাইকোর্টে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক (পরবর্তীকালে রাজনৈতিক বিবেচনায় ২১ জনকে ডিঙিয়ে আপিল বিভাগে নিযুক্ত) এবং আপিল বিভাগে দুজনকে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি হওয়া খায়রুল হকের প্রযোজনায়। সংবিধানের একচ্ছত্র রক্ষক হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থান আরও পোক্ত হয়। প্রধান বিরোধী দলের পাশাপাশি তৃতীয় শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকেও সামরিক শাসন–জাত দল হিসেবে কলঙ্কিত করে খেলার পুতুলে পরিণত করা যায় সহজেই।

.

এরশাদ যাবতীয় কলাকৌশল ব্যবহার করেও বিরোধীদের বাগে আনতে ব্যর্থ হয়ে শেষ রাজনৈতিক চাল হিসেবে দুটি প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্রকে প্রভাবিত করার পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। ১৯৮৮ সালের ৭ জুনের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করার মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে ধর্ম-প্রশ্ন চিরস্থায়ীভাবে গেঁথে দেন এবং হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতির একটা বড় শক্তি আইনজীবী সমাজকেও বাগে আনার উদ্যোগ নেন। এই সংশোধনী পাস হওয়ার দিনেই বিরোধী সব পক্ষ এই সংশোধনীকে নাকচ করে আন্দোলন শুরু করে। কৌশলগত দলবদলের এ রকম মোক্ষম সময়ে এসেই কেবল প্রথমবারের মতো আদালতকে সংবিধান-দলনকারী কোনো শাসকের বিরুদ্ধে কথিত ‘সংবিধানের অভিভাবক’–এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। আপিল বিভাগ অষ্টম সংশোধনীর হাইকোর্ট-সংক্রান্ত বিধান অবৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু তত দিনে এরশাদের আয়ুরেখা শেষ দিকে, পতন অবশ্যম্ভাবী। 

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। বিচার বিভাগ পৃথক্​করণের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির আংশিক বাস্তবায়নের বিনিময়ে উচ্চ আদালতের নিরঙ্কুশ আনুগত্য অর্জন করে। জরুরি অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট হয়। আদালত সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা দিতে বলে তার দুই বছরের ‘সংস্কার’ প্রকল্পে সহায়তা করেন। 

.

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক বৈধতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয় ১৯৯৮ সালে। ২০০৪ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ও সাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের পর ২০০৫ সালেই আপিল হয়। কিন্তু তার শুনানি হয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে—২০১০ সালের ১ মার্চ। সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রধান বিচারপতির আসনে খায়রুল হক। ২০১১ সালের ১০ মে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন। রায় লেখেন এক সপ্তাহ পরে পদত্যাগ করতে যাওয়া প্রধান বিচারপতি, এদিন কেবল সংক্ষিপ্ত রায়ে অবৈধ ত্রয়োদশ সংশোধনীকে ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় তাঁর অবসর গ্রহণের ১৬ মাস
পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তার আগেই সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার মাস দেড়েকের মধ্যেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ ৫৪টি সংশোধনীসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের জেলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং ৫ম ও ৭ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করার মাধ্যমে ইতিমধ্যে সরকারের আইন ও সংবিধাননিষ্ঠা এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে ব্যাপক সম্মতি উৎপাদন করে ফেলা হয়। রাজনীতির চরম বিচারিকীকরণের মাধ্যমে দেশে চূড়ান্ত কর্তৃত্ববাদী শাসন সংহত হয়, পরের নির্বাচনগুলো রূপান্তরিত হয় প্রহসনে। সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষার বুলিতে দেশ বিভোর-বিহ্বল হয়ে ওঠে, কিন্তু নাগরিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধান উধাও হয়ে যায়। রাজনীতি ও নীতি পরিণত হয় বিচারিক বা আধা বিচারিক বিধিবিধান ও প্রক্রিয়ায়। কিন্তু এ বিষয়ে বিচার বিভাগের ঘুম ভাঙতে একটা অভ্যুত্থানের প্রয়োজন হয়।

.

২০১৬-১৭ সালে এসে বিচার বিভাগ অভূতপূর্বভাবে কর্তৃত্ববাদী রেজিমের অসাংবিধানিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। বিবাদের বিষয় বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে সংসদের হাতে ন্যস্ত করে জারি করা ২০১৪ সালের ষোড়শ সংশোধনী। ২০১৭ সালের ৩ জুলাই প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে এই সংশোধনীকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে। সরকারপক্ষের প্রবল প্রতিক্রিয়া, নিরাপত্তা বাহিনীর হুমকি-ধমকি ও চরম অপমানের মুখে প্রধান বিচারপতি সিনহা চার মাসের মাথায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে বিচারপতি সিনহার অনমনীয় অবস্থানকে এই নিগ্রহের কারণ হিসেবে পড়া যায়। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষ্যেই জানা যায়, কীভাবে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার ও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকীকরণের বিস্তৃত প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তার প্রধান কুশীলবের একজন হয়ে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কেবল চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটাই মেলেনি। 

.

৪

রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে গণ–অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ভূত গণ–অভ্যুত্থানকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় বিচারের রাজনীতিকরণ ও রাজনীতির বিচারিকীকরণের পথে। আন্দোলনের মুখে ১০ আগস্ট পদত্যাগকারী প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ছয়জন বিচারপতি ছিলেন হাসিনাশাহীর ‘রাজনৈতিক আদালতে’র ঘুঁটি। তাঁদের প্রত্যেককেই আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে, একান্ত দলীয় বিবেচনায়। কিন্তু পদত্যাগ করানোর আগে তাঁদের কাছ থেকেই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের বৈধতা নিতে হয়, যে সরকারের প্রধান ম্যান্ডেটই ছিল সংস্কার বা রাষ্ট্র পুনর্গঠন-প্রক্রিয়ার তদারকি করা। এর মাধ্যমেই রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতিকে পুনরায় আইন-আদালতের কাছে সমর্পণ করা হয়, করা হয় এর বিচারিকীকরণ।

আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসসহ আদালত প্রাঙ্গণই হয়ে ওঠে সংস্কার–প্রক্রিয়ার প্রধান কেন্দ্র। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল, পঞ্চদশ সংশোধনী কিংবা ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহালের মাধ্যমে পুরোনো ব্যবস্থাকে প্রয়োজনীয় ঘষামাজা-মেরামত করে অক্ষুণ্ন রাখার যাবতীয় নির্দেশনা আসে আদালতের বরাতে। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত জুলাই সনদ, গণভোটের রায় হয়ে ওঠে ফলস লাইন মাত্র। এভাবে গণ–অভ্যুত্থান, নতুন বন্দোবস্ত, সংস্কার আদালত প্রাঙ্গণে গোত্তা খেতে থাকে। অনুমিতভাবেই নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে নতুন সরকার গঠন করে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’। সংস্কারও চলতে থাকে, ‘অক্ষরে অক্ষরে’ পুরোনো ছক মেনে। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি আইন আকারে পাস হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগবিধি হয় না। গুম প্রতিরোধ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ হয় না; হতে থাকে সাইবার সুরক্ষা আইন, র্যাব থেকে এসআরবি ইত্যাদি। কারণ, নব-অঙ্গশোভাপ্রাপ্ত পুরোনো ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের দরকার কাঁধে বন্দুক রেখে আরাম হয় এমন নমনীয় বিচার বিভাগ, বৈধতা উৎপাদনের সফেদ কারখানা।

* রাশেদ রাহম: আইনের ইতিহাসবিষয়ক গবেষক

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!