• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৪ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে সাইবার হামলা কিডন্যাপ কুমিল্লায় ৬ ঘণ্টার অভিযানে আটক ৩৫১, মুচলেকায় মুক্তি ২১৯ জনের ই–রিকশা কোথায় চলবে, কোথায় নিষেধ, কত গতিতে চলতে পারবে—নতুন বিধিমালা কী বলছে বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠ যেন একটা বক্সিং রিং মেঘনায় গুলিবিদ্ধ জেলের মৃত্যু : ২৪ ঘণ্টা পরও মামলা হয়নি, থানায় পুলিশের জিডি নেতানিয়াহুর সাফল্যে আশা দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প শিশুর মানসিক বিকাশ: অভিভাবকদের করণীয় ও পরামর্শ ছোবল খেয়ে মুঠোফোনের আলোয় সাপ ধরলেন, নিয়ে গেলেন হাসপাতালে মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংলিশ ভার্সনে নার্সারি–নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি

বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠ যেন একটা বক্সিং রিং

Reporter Name / ১০ Time View
Update : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠ যেন একটা বক্সিং রিং। এখানে এক দল আরেক দলের ওপর যেভাবে চড়াও হয়, যেভাবে কথা বলে, যেভাবে বক্তৃতায় শব্দচয়ন হয়, তা উত্তেজনাকর তো বটেই, ভীতিকরও। এ দেশে রাজনীতির ভাষা কেন এত আক্রমণাত্মক—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষণে মেলে না; এর শিকড় খুঁজতে হয় ইতিহাসের ক্ষতচিহ্নে, ক্ষমতার দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় এবং মানুষের ভেতরে জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।

বাংলাদেশের আকাশে যখন সন্ধ্যার শেষ শালিকটি উড়ে যায়, যখন ধানের খেতের ওপর নিঃশব্দ কুয়াশা নেমে আসে, তখন মনে হয় এ দেশ যেন মূলত কোমল মানুষের দেশ। নদীর স্রোতের মতো শান্ত, শাপলার পাপড়ির মতো নরম কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টির মতো উদার। অথচ এ দেশেই যখন রাজনীতির মঞ্চে কেউ ভাষণ দিতে দাঁড়ায়, তখন শব্দগুলো হঠাৎ লোহার মতো কঠিন হয়ে যায়। ভাষার ভেতরে জমে ওঠে ক্রোধ, বিদ্বেষ, উপহাস, হুমকি ও প্রতিশোধের আগুন।

যে জনগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথের গান গায়, জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি খুঁজে বেড়ায়, তারাই আবার রাজনীতির ভাষায় কেন এত নির্মম? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘ করিডর ধরে হাঁটতে হয়।

.তারুণ্যের বিদ্রোহে বিশ্ব কেন উত্তাল.

এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ উপনিবেশ, দেশভাগের ক্ষত, ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণতন্ত্রের জন্য রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, বারবার ক্ষমতার পালাবদল এবং ক্রমাগত আদর্শিক সংঘাত এই জাতির মনে গভীর দাগ কেটে গেছে। ফলে এখানে রাজনীতি কখনো নিছক মতভেদ নয়; অনেক সময় তা হয়ে উঠেছে অস্তিত্বের প্রশ্ন।

একটি জাতি যখন বারবার সংকটের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে, তখন তার ভাষাও আর মসৃণ থাকে না। শব্দের মধ্যে জমে ওঠে আত্মরক্ষার তাড়না। প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রু বলে মনে করার প্রবণতা জন্ম নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা তাই অনেক সময় নদীর মতো নয়, যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। এখানে বক্তব্য কখনো যুক্তির জন্য নয়; বরং সমর্থকদের উৎসাহিত করার জন্য। বক্তৃতা মানুষের চিন্তা প্রসারিত করার জন্য নয়; বরং সমর্থকদের তাতিয়ে রাখার জন্য। ফলে ভাষা হয়ে ওঠে আগ্নেয়াস্ত্র। শব্দ তখন আর শব্দ থাকে না। শব্দ তখন গুলি হয়ে যায়।

.অস্বীকার, প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি.

এর একটি বড় কারণ হলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সমঝোতার ঐতিহ্য দুর্বল। আমরা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এমনভাবে দেখি, যেন সে ভিন্নমতের নাগরিক নয়, বরং জাতির সর্বনাশের কারণ। ফলে বিতর্কের জায়গায় আসে নিন্দা, তর্কের জায়গায় আসে তাচ্ছিল্য, আর যুক্তির জায়গায় আসে ব্যক্তিগত আক্রমণ।

বটগাছের ছায়ায় বসে থাকা দুই কৃষক যেমন বৃষ্টি হবে কি হবে না, তা নিয়ে মতভেদ করেও একসঙ্গে বিড়ি-চা খেতে পারে, রাজনীতির ময়দানে সেই সহজতাটি অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। এখানে মতের পার্থক্য প্রায়ই সম্পর্কের বিচ্ছেদে রূপ নেয়। যেন মানুষ নয়, শুধু দুই বিপরীত সৈন্য দল। 

তবে সমস্যাটি কেবল রাজনীতিবিদদের নয়। সমাজও এ সংস্কৃতিকে লালন করেছে। আমাদের চায়ের দোকান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি পারিবারিক আড্ডাগুলোতেও আমরা মতভিন্নতাকে সহ্য করতে শিখিনি। আমরা নিজের মতামতকে সত্য এবং বিপরীত মতকে মিথ্যা বলে ধরে নিতে ভালোবাসি। ফলে রাজনৈতিক নেতারাও জানেন, পরিমিত ভাষার চেয়ে উত্তেজনামূলক ভাষা বেশি হাততালি পাবে।

.

যে মানুষ ভয় পায়, সে অনেক সময় উচ্চ স্বরে কথা বলে। যে মানুষ অনিশ্চয়তায় ভোগে, সে অনেক সময় কঠিন শব্দের পেছনে আশ্রয় নেয়। রাজনীতিতেও তা–ই। শব্দ যত কঠিন, ভেতরের ভয় তত গোপন হয়ে থাকে।

.

শান্ত নদীর খবর কেউ মনে রাখে না; মানুষ মনে রাখে বন্যার গল্প। এ কারণেই অনেক নেতা যুক্তির চেয়ে উত্তেজনাকে বেছে নেন। কারণ ক্রুদ্ধ শব্দ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া আরও একটি কারণ আছে। সেটি হলো ক্ষমতা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ নয়; এটি অনেক সময় নিরাপত্তা, প্রভাব, মর্যাদা এবং অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবেও হাজির হয়। ক্ষমতা হারানো মানে কেবল নির্বাচন হারানো নয়, অনেকের কাছে তা হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অর্জিত অবস্থান হারানোর ভয়। যেন স্বর্গ থেকে বিদায়। এই ভয়ের ভেতর থেকে জন্ম নেয় আক্রমণাত্মক ভাষা।

যে মানুষ ভয় পায়, সে অনেক সময় উচ্চ স্বরে কথা বলে। যে মানুষ অনিশ্চয়তায় ভোগে, সে অনেক সময় কঠিন শব্দের পেছনে আশ্রয় নেয়। রাজনীতিতেও তা–ই। শব্দ যত কঠিন, ভেতরের ভয় তত গোপন হয়ে থাকে।

.মব–সংস্কৃতি: ক্ষোভের প্রকাশ, নাকি সংগঠিত সন্ত্রাস.

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ আক্রমণাত্মক ভাষার বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। একসময় রাজনৈতিক বক্তব্য সীমাবদ্ধ ছিল সভা-সমাবেশে। আজ প্রতিটি মুঠোফোন একেকটি মঞ্চ। প্রতিটি ফেসবুক পোস্ট, প্রতিটি ভিডিও, প্রতিটি মন্তব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে। ডিজিটাল জগৎ মানুষের সবচেয়ে শান্ত অংশটিকে নয়, অনেক সময় সবচেয়ে রাগী অংশটিকে সামনে নিয়ে আসে। কারণ, ক্রোধের বাজারে ক্রেতা বেশি। একটি পরিমিত বক্তব্য হাজারজন পড়ে।

একটি অপমানজনক বক্তব্য লাখো মানুষ শেয়ার করে। ফলে রাজনৈতিক ভাষাও ক্রমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বভাব গ্রহণ করেছে। এই ভাষা সংক্ষিপ্ত, তীব্র, উত্তেজক এবং বিভাজনমূলক।

কিন্তু এর চেয়েও গভীরে রয়েছে একধরনের ঐতিহাসিক অভিমান। বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে স্মৃতি ও বেদনার রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, রাষ্ট্র গঠনের স্মৃতি, শাসন ও নির্যাতনের স্মৃতি, বিশ্বাসঘাতকতার স্মৃতি, আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ের স্মৃতি আমাদের রাজনৈতিক চেতনাকে গড়ে তুলেছে। স্মৃতি যেমন শক্তি দেয়, তেমনি অনেক সময় ক্ষোভও ধরে রাখে। 

.স্পিকার রাষ্ট্রের জমে থাকা ক্ষত উন্মুক্ত করে দিলেন.

একসময় বাংলার রাজনৈতিক ভাষা ছিল ভিন্ন। ভাষা আন্দোলনের মিছিলে ভাষা ছিল মর্যাদার। তখন শব্দ মানুষকে বিভক্ত করেনি; একত্র করেছিল। তখন ভাষা ছিল প্রদীপের আলো। আজ অনেক সময় তা আগুনের শিখা।

এই পরিবর্তনের মধ্যে একধরনের সামাজিক ক্লান্তিও কাজ করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত মানুষকে বদলে দেয়। যখন একটি জাতি বছরের পর বছর একই ধরনের দ্বন্দ্ব, অভিযোগ এবং পরস্পরবিরোধী বয়ানের মধ্যে বাস করে, তখন তার ভাষাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সৌন্দর্যের জায়গা সংকুচিত হয়। সহনশীলতা কমে আসে। মানুষ সহজ উত্তর খোঁজে। আর সহজ উত্তরের সঙ্গে প্রায়ই আসে কঠোর ভাষা। কারণ, জটিল বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে ধৈর্য লাগে; কিন্তু শত্রু তৈরি করতে লাগে না। একটি শব্দই যথেষ্ট। একটি স্লোগানই যথেষ্ট। একটি অভিযোগই যথেষ্ট।

কখনো কখনো মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা আসলে দেশের মানুষের নয়; বরং তাদের ভয়, ক্ষোভ ও অপূর্ণতার ভাষা। গ্রামের কৃষক, নদীর মাঝি, কারখানার শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কিংবা শহরের রিকশাচালক প্রতিদিন যেভাবে জীবনযুদ্ধ করে, তাদের ভাষায় এত বিদ্বেষ নেই।

.ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার অসুখ.

তারা বরং বেঁচে থাকার কথা বলে, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বলে, ফসলের কথা বলে, নদীর ভাঙনের কথা বলে। কিন্তু রাজনৈতিক মঞ্চে উঠে যেন অন্য এক ভাষার জন্ম হয়। যে ভাষা মানুষের নয়, ক্ষমতার ভাষা। যে ভাষা হৃদয়ের নয়, হিসাবের ভাষা।

তবু আশার কথা হলো, ভাষা কোনো স্থির বস্তু নয়। নদী যেমন পথ বদলায়, ভাষাও বদলায়। রাজনীতিও বদলাতে পারে। যেদিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝবে যে আক্রমণাত্মক ভাষা সাময়িক করতালি এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সমাজকে ক্লান্ত করে; যেদিন নাগরিকেরা বুঝবে যে বিরোধিতা মানেই শত্রুতা নয়; যেদিন আমরা ভিন্নমতকে ভয় না পেয়ে তাকে শুনতে শিখব, সেদিন রাজনৈতিক ভাষার ভেতরও পরিবর্তন আসবে।

এই দেশের আত্মা কুয়াশাভেজা ভোর, শালুকফোটা বিল, ধানগন্ধী বাতাস, নদীর নীল জল, হাওরের নিঃশব্দ বিকেল কিংবা কার্তিকের সোনালি আলো। সেই নরম প্রকৃতির দেশ একদিন হয়তো তার রাজনীতিকেও কোমল হতে শেখাবে। হয়তো একদিন নেতারা বুঝবেন, সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ সেটি নয়, যা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে; বরং সেটি, যা বিভক্ত মানুষকে এক টেবিলে বসতে শেখায়।

● মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!