• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৯ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

রাষ্ট্র যখন তার স্রষ্টাদের সম্মান জানাতে সংকটে পড়ে

Reporter Name / ১৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সীমিতকরণ প্রক্রিয়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে হয়তো দেশ-বিদেশে সবাই প্রায় মেনে নিয়েছে, তবে এর সামাজিক ফল হতে পারে উদ্বেগজনক। সার্বভৌমত্ব সীমিতকরণ প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে ‘ডি-সভেরেনাইজেশন’ বলে উল্লেখ করা যায়। এটা হতে পারে স্বেচ্ছামূলকভাবে, জবরদস্তিমূলক পথেও। বাংলাদেশে উভয়ের মিশ্র পদ্ধতিতে হচ্ছে। ফলাফল একই দাঁড়াচ্ছে। 

রাজনীতি ও সমাজজীবনে এ দেশে ঐতিহাসিকভাবে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্তাপ ও ব্যবহার অত্যধিক। তার আড়ালেই সার্বভৌমত্ব সংকোচন বহুকাল ধরে ধীরলয়ে এগোচ্ছে এবং এখন লাজলজ্জার মোড়ক ভেঙে সেটা বেশ স্পষ্ট অবয়ব পেয়েছে।

সার্বভৌমত্ব হাতছাড়া হওয়ার বিষয় বহু বিশ্বগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতায় আছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক অনেক কাঠামো সার্বভৌমত্বের পরম ধরন বহু আগে খাটো করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন, বিভিন্ন সনদে সম্মতির জন্য দেশীয় বিধিবিধান সংশোধন নিয়ন্ত্রিত সার্বভৌমত্বের কথা জানায়। রাষ্ট্রসমূহ অনেক সময় লাভ-লোকসানের তুলনামূলক হিসাব কষে কর্তৃত্বের ছাড় দেয় অনেকটা জাতীয় সম্মতিতে। ইইউর মতো আঞ্চলিক ‘মুক্তাঞ্চল’ রাষ্ট্রীয় একক সার্বভৌমত্বকে সীমিত করে ভিন্ন ধাঁচের যৌথ সার্বভৌমত্বের মডেলও তুলে ধরছে।

.

তবে বাংলাদেশে ঘটছে ভিন্ন ধরনের কিছু। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা যেভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে শুল্কচুক্তি করল এবং এর পক্ষে যেভাবে সমাজের একটা সমর্থক গোষ্ঠী দেখা গেল কিংবা সম্প্রতি যেভাবে সৌদি আরব তথ্য-উপাত্ত না দিয়ে দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল এবং বাংলাদেশের একজন নীতিনির্ধারক যেভাবে এতে শিক্ষণীয় উপাদান দেখলেন বা অতীতে যেভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এসে ভোটের ধরন বাতলে দিতেন, এসবই ডি-সভেরেনাইজেশনের বার্তা দেয়।

গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা লিজ, ভাড়া বা বেসরকারীকরণও সার্বভৌমত্বের কমবেশি সংকোচন কি না, সেটা বোঝা যেত, যদি ওই সব চুক্তি জনসমক্ষে আসত। রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে বা জনগণের সম্পদ বড় আয়তনে ব্যয় হয়, এমন যেকোনো ধরনের চুক্তি যে ঘোষণা দিয়ে গোপন রাখতে হচ্ছে, সেটা স্পষ্টত সার্বভৌমত্বের ঘাটতির কথা জানায়। তবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিশ্চিতভাবে আরও বড় আয়তনে নাজুকতার কথাও বলছে, যখন সে তার স্রষ্টা মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে গার্ড অব অনার দেয়। পিরোজপুরের মানিক পশারীর বেলায় তেমনটা বেশ স্পষ্ট দেখা গেল। এ–ও একধরনের ডি-সভেরেনাইজেশন কি না, সেটা রাষ্ট্রচিন্তায় উঠতে বাধ্য। কিন্তু এ তো স্পষ্ট, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ‘কর্তৃত্বের’ প্রয়োগ অভ্যন্তরীণভাবে যেমন বাধার মুখে সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও নিজস্ব অধিকারের সার্বভৌম প্রকাশ থমকে যাচ্ছে।

.

জাতীয়তাবাদী জনপদে সার্বভৌমত্বের আবেগ বেশ তীব্র থাকে। সে জন্য আস্তে আস্তে তাদের জোয়াল পরানো হয়। অভ্যস্ত হওয়ার পালা শুরু হয় সীমিত সংকোচনের মাধ্যমে। সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জকারী রাজনৈতিক শক্তি যেমন এ অবস্থা তৈরি করতে পারে, তেমনি নানান প্রাপ্তি ও সমৃদ্ধির স্বপ্নও সার্বভৌমত্বের সীমিতকরণকে গতি দিতে পারে। 

একদা আমাদের এখানে ইপিজেডগুলোয় দেশীয় শ্রম আইনের ঊর্ধ্বে কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ইপিজেড কর্মসংস্থান বাড়াবে, প্রযুক্তি হস্তান্তর ঘটাবে। সে জন্য বিশেষ আইন করা হয় এ রকম উদ্যোগের জন্য। তাতে এসব শিল্পাঞ্চলে সংঘ গঠনের অধিকার, শ্রম পরিদর্শনের বাধ্যবাধকতা শর্তাধীন করা হয়। অর্থাৎ জাতীয় শ্রম আইন, মৌলিক অধিকারের সাংবিধানিক হাত সীমিত করা হয় সেখানে। সেটা অনেকাংশে মেনেও নিয়েছি আমরা। এভাবে এগোতে এগোতে এখন বিমান কিনব কি কিনব না, সেই নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার বেলাতেও অন্যের নির্দেশনা শুনি। ইপিজেড গড়তে দিয়েছি আমরা হয়তো বেকারি কমানো ও প্রযুক্তিগত দারিদ্র্য ঘোচাতে; কিন্তু এত এত বোয়িং কিনছি কেন, সেটা কম নাগরিকই জানে বা জানতে চায়। তারা ডি-সভেরেনাইজেশনে অভ্যস্ত এখন।

.

আশপাশের কোনো দেশ সীমান্তভূমির দু–এক শতক জায়গা দখল করলে আমাদের জাতীয় অহং নিশ্চিতভাবেই জেগে উঠত এবং সেটাই সংগত। কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্তের অধিকার বিঘায় বিঘায় বেদখল হলেও তার ন্যায্যতা দিতে জাতীয় বুদ্ধিজীবীর অভাব হয় না আজকাল। 

একসময় জনগণকে নিরন্তর বোঝানো হয়েছিল, পাটকল ও চিনিকলগুলো বন্ধ করা বা বেসরকারি খাতে দেওয়া কেন জরুরি। সেই অধ্যায়ের দু–তিন দশক পর আজ পাট ও চিনি খাতের অবস্থা স্পষ্ট। একই বুদ্ধিজীবী দল এখন বোঝাচ্ছে, বন্দর ইত্যাদি লিজ দেওয়া কতটা লাভজনক হবে। 

আগের আমলে বোঝানো হয়েছিল, প্রতিবেশীদের করিডর দিয়ে আমরা কত উপায়ে লাভবান হতে পারি। অথচ শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা নির্বিঘ্ন করতেই সেসব দেওয়া হচ্ছিল। একদিকে সিগন্যাল দিয়ে অন্যদিকে গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়া বাংলাদেশের কুলীন সমাজের কৌশল হিসেবে নতুন নয়।

আজকে গুরুত্বপূর্ণ খাত ও সংস্থা ইজারার পেছনে পণ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার কথাই জোরেশোরে প্রচারিত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে বিদেশিদের উপস্থিতি সহজতর করার কথা নিশ্চয়ই এখন আমরা কোনো বিশেষজ্ঞ থেকে জানার আশা করতে পারি না। সেটা জানবে হয়তো পরের প্রজন্ম।

গত মাসেই অন্তত কয়েক ডজন টক শো হয়েছে সৌদিদের মক্কা সামরিক জোটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে উপকৃত হতে পারে, ওই বিষয়ে। কিন্তু ওই দেশে দুজন বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের বিষয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলো খুব যত্নের সঙ্গে মুখে সিলমোহর মেরে রেখেছে। অচিন্তনীয় এই রাষ্ট্রীয় অপমানে নাগরিক সমাজও নিশ্চুপ।

অনেকের হয়তো মনে আছে, ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ২০২৩ সালে কাতারে আটজন ভারতীয়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে নয়াদিল্লি অবিশ্বাস্য এক উদ্যোগে তার নাগরিকদের আইনি প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করে বড় ধরনের দেশীয় সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিল। যদিও পুরো ঘটনায় তাদের নাগরিকেরা ছিল অপরাধে অভিযুক্ত।

.

অথচ শিরশ্ছেদ হওয়ার আগে বাংলাদেশ তার নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আখতারের অপরাধটুকুর কথাও জানতে পারল না। আমাদের জাতীয় বিদেশনীতি কীভাবে ডি-সভেরেনাইজেশনের কবলে আছে, তার মোটাদাগের এক নজির এটা।

বাংলাদেশ এখনো বলতে পারছে না তার নাগরিকেরা প্রাণবধের শিকার হলো কেন? এ রকম ‘না জানতে পারা’ হলো ডি-সভেরেনাইজেশনের পদ্ধতিগত ফল। নীতিগত অবক্ষয়ের শিকার দেশগুলোর সরকার ক্রমে ক্রমে এভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতীয় স্বার্থ দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এমনকি তার নাগরিক সমাজও এ রকম অপমানে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এর বড় একটা ক্ষতিকর অভ্যন্তরীণ পার্শ্বফলও থাকে। যেটা দেখলাম আমরা পিরোজপুরে।

.

নাগরিকদের সুরক্ষা ও সম্মান জানাতে রাষ্ট্রের অভিভাবকতুল্য ভূমিকা না থাকলে জনগণের মধ্যে স্থায়ী নৈরাজ্যিক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গণবিশৃঙ্খলার যেসব আলামত ক্রমে বাড়ছে, তার সঙ্গে সমকালীন ‘সার্বভৌমত্ব সংকোচন’ বাস্তবতার গভীর যোগ আছে। রাষ্ট্রীয় গৌরব এবং নীতিনির্ধারকদের অভিভাবকতুল্য সামর্থ্য হারিয়ে যাচ্ছে বলেই মানুষ এখন আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন মানতে চাইছে না। 

সার্বভৌমত্বের পুনঃপুন সংকোচন দেশবাসীর মন থেকে জাতীয় গৌরববোধ লুপ্ত করে। এতে সমাজ থেকে জাতীয় সরকারের নৈতিক কর্তৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা লোপ পেতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে অপমানের ট্রমা এ রকম দেশের নাগরিক সমাজকে যেকোনো অবস্থায় প্রটোকলের বাইরে চালিত করে। মানসিক হতাশাগ্রস্ত এরূপ জনসমাজ সহিংসতার ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। 

সার্বভৌমত্বের সংকোচন বাংলাদেশের জনসমাজকে আত্মবিশ্বাসহীন, আত্মমর্যাদাহীন নৈরাজ্যিক এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করছে। অথচ এ অবস্থার জন্য দায়ী সাধারণ জনগণ নয়, কুলীন সমাজ—তথা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা।

● আলতাফ পারভেজ গবেষক ও লেখক

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!