• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৭ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

বন্ডে বিনিয়োগ কতটা লাভজনক, কী বিবেচনা করতে হবে

Reporter Name / ৯ Time View
Update : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

ব্যাংকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর), সঞ্চয়পত্র কিংবা শেয়ারবাজার—সঞ্চয়ের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করবেন, তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। যাঁরা তুলনামূলক পূর্বানুমানযোগ্য মুনাফা চান, তাঁদের জন্য বন্ড হতে পারে বিনিয়োগের আরেকটি মাধ্যম। তবে এর লাভ নির্ভর করে মুনাফার হার, মেয়াদ, কর-সুবিধা, ঝুঁকি ও প্রয়োজনে বিনিয়োগ বিক্রি করার সুযোগের ওপর।

বন্ড মূলত ঋণপত্র। সরকার, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান বন্ড ইস্যু করে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। বিনিময়ে শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ দেয় অথবা মেয়াদ শেষে অর্থ ফেরত দেয়। শেয়ারে বিনিয়োগ করলে কোম্পানির মালিকানার অংশ পাওয়া যায়, কিন্তু বন্ডে বিনিয়োগ করলে তা পাওয়া যায় না।

.

সাধারণভাবে আমাদের দেশে বন্ড দুভাবে পরিচিত—প্রথমটি ট্রেজারি বন্ড, দ্বিতীয়টি করপোরেট বন্ড। করপোরেট বন্ডের মধ্যে আবার দুটি ভাগ আছে। যেমন ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বন্ড, বর্তমানে যা সুকুক বন্ড হিসেবে পরিচিত। অন্যটি প্রচলিত বা কনভেনশনাল বন্ড। কনভেনশনাল বন্ড আবার কয়েক ধরনের। তার মধ্যে রয়েছে পারপিচুয়াল বন্ড ও জিরো কুপন বন্ড।

সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ইস্যু করেছে। দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে এ ধরনের বন্ড ইস্যু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব ভবন ও শিল্পকারখানায় জ্বালানির দক্ষতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগে অর্থায়নে ব্যবহার করা হবে।

.

ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডটি তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন বন্ড। এতে নির্দিষ্ট বিরতিতে সুদ দেওয়া হয় না। বরং অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বন্ড কিনে মেয়াদ শেষে পুরো অভিহিত মূল্য পাওয়ার মাধ্যমে মুনাফা হয়।

বন্ডটির অভিহিত মূল্য ১০ লাখ টাকা। তবে এটি কিনতে বিনিয়োগকারীকে দিতে হবে ৮ লাখ ৪ হাজার ৯৬১ টাকা। তিন বছর পর পাওয়া যাবে ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মুনাফা হবে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯ টাকা। তবে পুরো মুনাফা পেতে বিনিয়োগকারীকে মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আগেই বিক্রি করলে প্রকৃত আয় নির্ভর করবে বাজারদরের ওপর।

.

বন্ডের অন্যতম সুবিধা হলো, অনেক ক্ষেত্রে মুনাফার হার, মেয়াদ ও অর্থ পরিশোধের শর্ত আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। ফলে মেয়াদ শেষে কত অর্থ পাওয়া যেতে পারে, তার হিসাব করা তুলনামূলক সহজ। কিছু বন্ডে নিয়মিত সুদ পাওয়া যায়, আবার জিরো-কুপন বন্ডে কম দামে কিনে মেয়াদ শেষে অভিহিত মূল্য পাওয়ার মাধ্যমে মুনাফা হয়।

সরকারি ট্রেজারি বন্ড, ব্যাংকের বন্ড ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট বন্ড—এগুলোর সুদহার, মেয়াদ ও ঝুঁকি এক নয়। কোনো বন্ডের মুনাফার হার বেশি হলেই তা বেশি লাভজনক হবে, এমন নয়। ইস্যুকারীর ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি বেশি হলে তা সুদ বেশি হতে পারে। আবার মেয়াদ কিংবা বাজার পরিস্থিতির প্রভাবে তা হতে পারে। তাই কর ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রকৃত আয় কত থাকবে, তা বিবেচনা করা জরুরি।

এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে তুলনা করার সময়ও শুধু ঘোষিত মুনাফার হার দেখলে হবে না। এসব বিনিয়োগের কর, নগদায়নের নিয়ম ও মেয়াদ আলাদা। বন্ডের ক্ষেত্রে ইস্যুকারীর আর্থিক সক্ষমতা ও মেয়াদপূর্তির আগে বিক্রির সুযোগও বিবেচনায় নিতে হবে।

.

বিনিয়োগের প্রকৃত আয় কত, তা নির্ধারণে করের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষিত মুনাফার হার বেশি হলেও কর ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর আয় কমে যেতে পারে। আবার কর-সুবিধা পাওয়া গেলে তুলনামূলক কম মুনাফার বিনিয়োগ থেকেও আকর্ষণীয় আয় হতে পারে।

ব্র্যাক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন বন্ডটির মুনাফার ওপর অগ্রিম আয়কর প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কর রেয়াতের সুবিধা পাওয়া যাবে। আবার যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে বিনিয়োগকারী মেয়াদের আগেই বাজার থেকে বন্ড বিক্রি করে সহজেই নগদ টাকা তোলা যাবে।

.

বন্ডের মুনাফা ও মেয়াদ শেষে প্রাপ্য অর্থ আগে থেকে নির্ধারিত থাকলেও বিনিয়োগ একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং সুদ ও আসল পরিশোধের সামর্থ্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বন্ডের ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব সরকারের; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বন্ডে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।

ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডটি জামানতহীন। ফলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এ বন্ডের ঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বাজারে সুদের হার বাড়লে নির্দিষ্ট সুদহারের বন্ডের দাম কমতে পারে। মেয়াদপূর্তির আগে বিক্রি করলে লোকসানও হতে পারে। তাই বেশি মুনাফার প্রস্তাবের বিপরীতে কতটা ঝুঁকি নিতে হচ্ছে, তা বিবেচনা করা জরুরি।

.

ব্যাংক বা পুঁজিবাজার থেকে ট্রেজারি বন্ড কেনা যায়। তবে সব ব্যাংক ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে না। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োজিত ডিলার ব্যাংকই ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে। যে ব্যাংক ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে, সেই ব্যাংকে হিসাব খুলে এ বন্ড কেনা যাবে। এ ছাড়া শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বন্ড কেনার ক্ষেত্রে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স বা বিও হিসাব থাকতে হবে।

সব মিলিয়ে বন্ডে বিনিয়োগের মুনাফা নির্ভর করে শুধু মুনাফার হারের ওপর নয়। কর-পরবর্তী আয়, ইস্যুকারীর আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগের মেয়াদ ও নগদায়নের সুযোগের ওপরও তা নির্ভর করে। তাই বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট বন্ডের শর্ত যাচাই করা এবং সব সঞ্চয় এক মাধ্যমে না রেখে বিভিন্ন মাধ্যমে করার পরামর্শ দেন বিশ্লেষকেরা।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!