• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৮ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

খেলাপি ঋণের জালে আটকা ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ কী

Reporter Name / ৭ Time View
Update : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

একটি দেশের ব্যাংকব্যবস্থা তার অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনতন্ত্র। সেই তন্ত্রের এক-তৃতীয়াংশ যদি জমাট বেঁধে যায়, শরীর কত দিন সচল থাকে—বাংলাদেশ আজ ঠিক এই প্রশ্নের মুখোমুখি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

অর্থাৎ ব্যাংকের প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই আর নিয়মিত ফেরত আসছে না। মার্চ থেকে জুন—মাত্র তিন মাসে খেলাপি বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, আর ডিসেম্বর থেকে ছয় মাসে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।

.নামেই ইসলামি ব্যাংকিং? সমস্যা ধারণায় নাকি প্রয়োগে?.ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার প্রকল্প কতটা কঠোর হবে.

দুই বছর আগের ছবির পাশে রাখলে উদ্বেগের মাত্রা বোঝা যায়। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, হার ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

দুই বছরে টাকার অঙ্কে তা প্রায় তিন গুণ, হারে আড়াই গুণের বেশি। তবে এর পুরোটা নতুন খেলাপি নয়।

বছরের পর বছর পুনঃ তফসিল আর বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে অনেক ঋণ নিয়মিত দেখানো হতো, ৯০ দিনের আন্তর্জাতিক শ্রেণীকরণ নীতি চালুর ফলে সেগুলো প্রকাশ্যে এসেছে।

প্রকৃত চিত্র প্রকাশ নিঃসন্দেহে সাহসের কাজ। কিন্তু রোগনির্ণয়ের পর সঠিক চিকিৎসা না হলে রোগী কখনো সুস্থ হয় না।

.

বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ৮৮টি দেশের ২০২৫ সালের গড় খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ; বাংলাদেশের হার তার প্রায় ৯ গুণ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) হিসাবে এশিয়ার গড় ১ দশমিক ৬ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ভারতের হার নেমেছে ২ শতাংশের নিচে; সংকটে থাকা পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও আমাদের চেয়ে বহুগুণ ভালো অবস্থানে।

ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ও এশিয়ায় বাংলাদেশ এখন নিঃসঙ্গ শীর্ষে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আর্থিক স্থিতিশীলতা সূচকের দেশভিত্তিক সর্বশেষ তথ্যের তুলনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বেও প্রথম—চাদ (৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ), নিরক্ষীয় গিনি (৩০ শতাংশ), আলজেরিয়া ও ঘানার ওপরে।

অথচ ২০২৪ সালের জুনে ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ নিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে ছিল না; ইউক্রেন, চাদ, নিরক্ষীয় গিনি, ঘানার মতো দেশ তখন এগিয়ে ছিল।

ওই বছরের শেষে এডিবি বাংলাদেশকে এশিয়ার সবচেয়ে ভঙ্গুর ব্যাংকব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে।

শিক্ষণীয় হলো, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন পূর্ণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখা পুরোনো ঋণ অবলোপন, আদায় ও ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়িয়ে হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়েছে। আর আমরা যুদ্ধ ছাড়াই উঠে গেছি শীর্ষে।

.ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের সিদ্ধান্তটা অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক.ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার প্রকল্প কতটা কঠোর হবে.

খেলাপির পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি পাহাড়-রাষ্ট্রের দেনা। সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সরকারের ঋণ ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ হিসাবে ২০২৬ সালের জুনে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে এ দেনা প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা ছুঁয়েছে।

অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন বলছে, চলতি অর্থবছর শেষে তা দাঁড়াতে পারে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকায়। গত অর্থবছরে শুধু সুদ বাবদই গুনতে হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই দেনার বড় জোগানদার ভঙ্গুর ব্যাংক খাতই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, যা সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের মোট বকেয়া ঋণ ৬ লাখ ৮১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, যা দেশের মোট খেলাপি ঋণের চেয়ে বেশি।

দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের জুনে, এই অঙ্ক ছিল প্রায় ৪ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। চলতি বাজেটে আরও ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

একদিকে এক-তৃতীয়াংশ ঋণ আটকে, অন্যদিকে তারল্যের বড় অংশ সরকারি বিল-বন্ডে-মাঝখানে চিড়েচ্যাপটা বেসরকারি খাত।

.

খেলাপি ঋণকে ব্যাংকের খাতার বিষয় মনে হলেও এর দাম শেষ পর্যন্ত দেয় সাধারণ মানুষ। আমানতকারী দুর্বল ব্যাংক থেকে নিজের টাকা তুলতে না পারার যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, তা আস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

খেলাপির ক্ষতি পোষাতে ব্যাংক সুদহার বাড়ায়; সৎ উদ্যোক্তা, বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আগের মতো ঋণ পায় না, পেলেও তুলনামূলক চড়া সুদে। এতে কর্মসংস্থান কমে, তরুণদের বেকারত্ব বাড়ে।

ব্যাংক বাঁচাতে মূলধন জোগান বা তারল্য সহায়তা দিতে হয় করদাতার টাকায় কিংবা টাকা ছাপিয়ে, যা মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেয়। আর সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ চলে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ সংকুচিত হয়।

ব্যাংক খাতের ঝুঁকিও কম নয়। ২০২৩ সালের শেষে এ খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ; মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে, ২০২৫ সালের শেষে, তা নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে।

অথচ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় এই অনুপাত ১৭ থেকে ২১ শতাংশ। অর্থাৎ খেলাপির ক্ষতি সামলাতে গিয়ে খাতটির সম্মিলিত মূলধন পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছে।

মাত্র ১৫টি ব্যাংকে মোট খেলাপির ৮৫ শতাংশ কেন্দ্রীভূত; একীভূত পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ৮০ শতাংশের বেশি।

এ অবস্থায় তিনটি ধাক্কার আশঙ্কা প্রবল: এক বা একাধিক বড় ব্যাংকের তারল্যসংকট সংক্রামক হয়ে আমানত উত্তোলনের হিড়িক; ঋণমান অবনমনে বিদেশি ব্যাংকের ঋণপত্র (এলসি) নিশ্চিতকরণ খরচ বেড়ে আমদানি-রপ্তানি ব্যয়বহুল হওয়া; এবং শিল্পের অর্থায়ন শুকিয়ে প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা।

নতুন করে ঢালাও পুনঃ তফসিলের সুযোগ দিলে কাগজে খেলাপি কমবে, কিন্তু পুরোনো ভুলেরই পুনরাবৃত্তি হবে।

.

প্রথমত, আইন করে একটি স্বাধীন ও পেশাদার জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গড়তে হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ক্যামকো ও মালয়েশিয়ার দানাহার্তার মতো এটি স্বচ্ছ বাজারমূল্যে খেলাপি ঋণ কিনে জামানত বিক্রি ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে আদায় করবে।

পূর্ণ প্রভিশন থাকা পুরোনো ঋণ অবলোপন করে ব্যাংকের স্থিতিপত্র পরিষ্কার হবে, কিন্তু আদায়ের আইনি অধিকার বহাল থাকবে। লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে খেলাপির হার ২০ শতাংশের নিচে এবং ২০৩১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশের নিচে নামানো।

দ্বিতীয়ত, আদায় ও বিচারব্যবস্থায় আমূল সংস্কার দরকার। অর্থঋণ আদালতে ঝুলে থাকা প্রায় পৌনে এক লাখ মামলা নিষ্পত্তিতে বিশেষ বাণিজ্যিক বেঞ্চ গঠন করে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে।

ভারতের দেউলিয়াত্ব আইনের আদলে আধুনিক দেউলিয়া কাঠামো চাই। ইচ্ছাকৃত খেলাপির সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রা, নতুন ব্যবসা নিবন্ধন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা কাগজে নয়, মাঠে কার্যকর করতে হবে। নগদ ডাউন পেমেন্ট ছাড়া কোনো পুনঃ তফসিল নয়।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে দক্ষ গভর্নরের নির্দিষ্ট মেয়াদ ও অপসারণে সংসদীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটাতে হবে এবং মূলধনঘাটতিতে পড়া ব্যাংকের বিরুদ্ধে সময়াবদ্ধ সংশোধনমূলক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, ব্যাংকের মালিকানা ও পর্ষদে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। বেনামি ঋণের পথ রুদ্ধ করে একক গ্রাহক ও গ্রুপ ঋণসীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।

একীভূতকরণের পরও দেশে তফসিলি ব্যাংক ৫৭টি, যা এই অর্থনীতির তুলনায় বেশি। দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মতো একীভূতকরণ বা বিকল্প পুনর্গঠনের পথ খুঁজতে হবে।

এসব ব্যাংকের শীর্ষ পদে রাজনৈতিক নিয়োগের অবসান ঘটিয়ে আংশিক শেয়ার শেয়ারবাজারে ছাড়লে জবাবদিহিও বাড়বে। তবে সর্বক্ষেত্রেই কর্মরত সবার চাকরির নিরাপত্তা সুনিশ্চিত থাকতে হবে।

পঞ্চমত, রাজস্ব শৃঙ্খলা ফিরিয়ে ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নের কাতারে থাকা কর-জিডিপি অনুপাত পাঁচ বছরে অন্তত ১০ শতাংশে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে করদাতারা যেন বিনিময়ে মানসম্মত সরকারি সেবা পান, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ জিডিপির একটি নির্দিষ্ট সীমায় বেঁধে দিয়ে বন্ডবাজার গভীর করা দরকার।

প্রতি প্রান্তিকে অগ্রগতি প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ ও শীর্ষ খেলাপিদের তালিকা সংসদে উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

.বিদায়ী গভর্নরের মনোবেদনা ও ব্যাংকিং খাতের নেতৃত্ব.প্রবাসীরা কেন ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাবেন.

হতাশ হওয়ার আগে ইতিহাসে একবার চোখ রাখা দরকার। স্বাধীনতার দুই দশক পর, ১৯৯১ সালে, তৎকালীন সরকার প্রথমবারের মতো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করে।

দেশজুড়ে তখন হইচই পড়ে যায়; মানুষ প্রথম জানতে পারে, কারা ব্যাংকের টাকা নিয়ে ফেরত দেন না। তবু সংকট থামেনি।

১৯৯৯ সালে খেলাপির হার উঠেছিল ৪১ দশমিক ১ শতাংশে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অথচ এক যুগের ব্যবধানে, ২০১১ সালে, সেই হার নেমে আসে ৬ দশমিক ১ শতাংশে।

আমরা পেরেছিলাম, কারণ আমাদের ইচ্ছা ছিল। ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ তাই অর্থনীতির অঙ্কের চেয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর বেশি নির্ভরশীল।

ক্ষমতা বদলালে নীতি বদলাবে না—এই অঙ্গীকার ছাড়া কোনো এএমসি, আদালত বা আইন কাজ করবে না।

খেলাপি ঋণের জাল এখনই ছিঁড়তে না পারলে সেই জালে একসময় পুরো অর্থনীতিই আটকে যাবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাই এখনই।

  • এম এম মাহবুব হাসান ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!