• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

ফ্ল্যাটজীবন

Reporter Name / ১৬ Time View
Update : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

চার ইউনিটের আটতলা বাড়ি। বত্রিশ পরিবারের ছোট একটা গ্রাম যেন আকাশে। কিন্তু এই গ্রামের লোকজনের মাঝে খুব একটা চেনাজানা নেই। দেখা হলে ‘কেমন আছেন… ভালো আছি’ পর্যন্তই। মাঝে মাঝে ওটুকুও থাকে না। পাঁচতলার দক্ষিণ-পশ্চিমের ইউনিটটা হাবিবাদের। অনেক ভেবে আড়াই লাখ টাকা বেশি দিয়ে দক্ষিণ দিকের রাস্তার পাশের এই ইউনিটটা নিয়েছিল একটু দখিনা হাওয়া খাবে বলে। এখন মনে হয় ওটাই ছিল বড় ভুল। জানালা খুললে হাওয়া খাওয়া যায়, সেইসঙ্গে ধুলাও খেতে হয়। শুনতে হয় গাড়ির প্যাঁ-পোঁ, মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি তো আছেই—লাগিয়ে দিয়েও পুরোপুরি নিস্তার পাওয়া যায় না।দখিন-দুয়ার, তাই খুব প্রয়োজন না হলে খোলে না হাবিবা। বিকেলের চা-টা বারান্দায় বসে খাওয়ার ইচ্ছে হলে হাবিবা তাই পশ্চিমের বারান্দায় এসে বসে। সমস্যা এখানেও আছে। বারান্দা তো নয় যেন ধানক্ষেতের বাতর। চেয়ার পেতে বসার জো নেই। বসতে হয় ছোট্ট মোড়া পেতে। পা মেলে দেওয়ার আয়েশটুকু করতে হয় লম্বালম্বিভাবে। সামনে তাকাতে হয় ঘাড় ঘুরিয়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে কতক্ষণ আর থাকা যায়—মাঝে মাঝে তাই উঠে দাঁড়িয়ে থাকে।ফ্ল্যাটটা কেনার পর নিজেদের একটা বাড়ি হয়েছে ভেবে আনন্দে বেলুনের মতো ফুলে উঠেছিল বুকটা। তারপর দিন যত যেতে লাগল আনন্দ-বেলুনটা তত ছোট হতে লাগল বাচ্চাদের জন্মদিনে ঘরে ঝুলিয়ে দেওয়া বেলুনের মতো।নিজঘরেও কত খরচ—লিফট বিল, দারোয়ান বিল, সিঁড়ি ঝাড়ুর বিল।কিছুদিন আগে চারতলার ফ্ল্যাটে চুরি হয়েছে। এত সিসি ক্যামেরা, দারোয়ান কিছুই করতে পারল না।মেয়ে বড় হয়েছে। সেদিন একটা আলমিরা কিনে আনা হলো মেয়ের জন্য। তার ঘরে ছিল শুধু খাট আর ছোট্ট একটা ওয়্যারড্রোব। আলমিরা বসানোর পর এখন মেয়ে বলছে, ‘আম্মা, ঘরে তো জায়গাই নেই। জায়নামাজটাও বিছাতে পারি না ঠিকমতো।’চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে বসল হাবিবা।ফাল্গুন প্রায় শেষ। দু-এক দিন আছে হয়তো। কোথায় যেন কোকিল ডাকছে। ফাঁকেফুকে কিছু গাছপালা আছে এখনো। তিনটা বাড়ি পরে একটা জামগাছ। ডাকটা ওদিক থেকেই আসছে। কোকিলের ডাকে সবার মনেই একটু হলেও বসন্তের টোকা লাগে। হাবিবার মনেও লাগল। সে টোকা বেশিক্ষণ টিকল না। নয় মাসেই বারান্দার দেয়ালে নোনা ধরে গেছে। নোনা-ধরা দেয়ালে করুণ চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কাপে আবার চুমুক দিল হাবিবা।নিচের একতলা বাড়ির ছাদটা গাছপালা-লতাপাতায় ভরা। এক বুড়ো আর বুড়ি মিলে কত রকম ফল, শাকসবজি যে ফলায় এই ছোটখাটো ছাদটাতেই। ছাদে কলার ছড়ি এই প্রথম দেখল হাবিবা। না দেখলে তো বিশ্বাসই করতে পারত না। ছাদে কলাগাছ! কোনার একটা ড্রামে এখন শজনে ঝুলছে। দেখেই শান্তি! আরেকটা ড্রামে একটা মেহেদিগাছও আছে। গাছভরা মেহেদি পাতায় ঝুলে পড়েছে ডাল। এক মৌসুমের ফসল শেষ হতেই আরেক মৌসুমের আবাদ শুরু করে দেয়। বুড়ো-বুড়ির খুরপি নাড়াচাড়া, পানি ছিটানো, সবজি তোলা আর ফল ছেঁড়া দেখতে কী যে শান্তি লাগে! আজ এখনো বুড়ো-বুড়ি আসেনি। সময় হয়ে গেছে। একটু পরেই এসে পড়বে। এ রকম একটা বাড়িরই খুব শখ ছিল হাবিবার। নিজেদের একটা বাড়ি—একেবারে নিজেদের। একটা ছাদ বত্রিশ জনে ভাগাভাগি করতে হবে না। কিন্তু কপালে না থাকলে যা হয়। এক টুকরো মাটির আশায় শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত কত দৌড়াদৌড়ি করল তারা দুজন। জায়গা পছন্দ হলে টাকায় হয় না; টাকায় হলে জায়গা পছন্দ হয় না। শেষে সব টাকা এই ফ্ল্যাটেই ঢেলে দিয়েছে দুজন মিলে। এখন মনে হয় মস্ত ভুল হয়েছে। ওই যে উঠে এসেছে বুড়োবুড়ি। কী শান্তি-সুখের বাড়িটা!বুড়ির নাম কুলসুম। কুলসুম বেগম। ‘ল’ তুলে দিয়ে বুড়া ইয়াসিন আলী ডাকে ‘কুসুম’; প্রথম দিন থেকেই। কুলসুম বেগম আর ইয়াসিন আলীর দুই ছেলে। ছোট ছেলে থাকে আমেরিকার অরিগান স্টেটে। সে এখন টুইন বেবির বাবা। ছেলে বেবি। সুখেই আছে তারা। আর ফিরবে বলে মনে হয় না। ছেলে গেছে আমেরিকায়; নাতিরা হয়তো চলে যাবে ইউরোপে। যাক। নিয়তি যাকে যেখানে টেনে নেবে, সে তো সেখানেই যাবে।বড় ছেলে কাছেই আছে। ঢাকায়। একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। মহাখালী ব্রাঞ্চের ইনচার্জ। দূর থেকে নিয়মিতই খোঁজখবর রাখে তারা।এখন প্রতিদিনই আট-দশটা টমেটো পাকছে। পাকা টমেটোগুলো তুলে কুলসুম বেগম ইয়াসিন আলীর কাছে নিয়ে গেলেন দেখাতে। ইয়াসিন আলী গত রাতে বাতাসে হেলে পড়া মরিচগাছটা সোজা করে একটা কঞ্চির খুঁটির সঙ্গে বাঁধছিলেন। কুলসুম বেগম হাতের টমেটোগুলো দেখিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘এই দেখো, সাতটা। কাল তুলেছিলাম ছয়টা। এ বছর এক কেজি টমেটোও কিনতে হয়নি তোমার। টমেটো কেনার টাকা পুরোটা বাঁচিয়ে দিয়েছি।’‘টমেটো আর কয় টাকার। তুমি তো আমার জীবনটাই বাঁচিয়ে রেখেছ। তুমি না থাকলে আমি কবেই মরে যেতাম।’‘তওবা, তওবা। জীবন বাঁচানোর আমি কে? বাঁচিয়ে রাখার মালিক ওপরওয়ালা,’ বলে কুলসুম বেগম ওপরে তাকালেন। তখনই নজর পড়ল হাবিবার ওপর। মেয়েটার চা খাওয়াটা যেন একটা শিল্প। প্রায় প্রতি বিকেলেই পরিপাটি করে একটা শাড়ি পরে চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে বসে। তারপর নাটকের নায়িকার মতো খুব আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিতে থাকে। চোখ নামিয়ে কুলসুম বেগম স্বামীর উদ্দেশে বললেন, ‘ওই যে দেখো।’‘কী?’‘ওই পাঁচতলায়।’ইয়াসিন আলী ঘাড় ঘোরালেন। আগেও দেখেছেন। কুসুম কেন দেখাচ্ছে সেটাও বুঝলেন। একটু রসিকতা করার লোভ হলো তার; বললেন, ‘এই বয়সে আর দেখে কী হবে? যখন দেখতে মন চাইত তখন তো ডানে-বামে তাকাতেই দিতে না।’‘এখন তো কথা ঘোরাবেই। আসল জায়গায় হাত দিয়েছি যে।’ইয়াসিন আলী আসল জায়গাতেই গেলেন, ‘তুমি খাও না কেন? তুমিও খাও। আমাদের বারান্দা কমপক্ষে ওটার তিন গুণ বড়। কামরাঙা গাছের ছায়ার নিচের শীতল বারান্দা ‘‘এত শীতল যে গরমকালেও বরফ পড়ে। বর্ষায় তো বন্যা।’খোঁচাটা পুরোনো। এই বাড়ির তিন দিকই তিনটা উঁচু বাড়ি সৈনিকের মতো ঘিরে ফেলেছে। সামনের দিকে রাস্তা বলে ওদিকে কোনো সৈনিক দাঁড়াতে পারেনি। সারা বছরই স্যাঁতসেঁতে থাকে বাড়িটা। বর্ষায় সামনে পানি জমে যায়। ঘরের কোনো ফার্নিচার বেশিদিন টেকে না। ড্যাম হয়ে যায়। চাইলেই ভেঙে ফেলা যায়। ডেভেলপাররা এক পায়ে খাড়া। ইয়াসিন আলীর মন সায় দেয় না। বাপের যৌবনে করা বাড়ি। স্মৃতির একটা ব্যাপার তো আছেই। কিন্তু ওটাকেও বড় করে দেখেন না ইয়াসিন আলী। পৈতৃক ভিটায় কোথাকার কোন অজানা-অচেনা লোকজন এসে কর্তৃত্ব ফলাবে, এটা ভাবতেই তার কষ্ট হয়।নিজেই ডুপ্লেক্সের মতো কিছু করতে পারলে ভালো হতো। কুসুমের শখটাও পূরণ হতো। কিন্তু সেটা আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। জমানো কোনো টাকা নেই। গ্রামের বাড়ির সামান্য কৃষিজমিই এখন বেঁচে থাকার সম্বল। ছেলেদের কখনো বিষয়টা বলেননি। বলার সুযোগও নেই। বড় ছেলে বিশাল লোনের বোঝা মাথায় নিয়ে উত্তরায় প্রায় কোটি টাকার ফ্ল্যাটে উঠে পড়েছে। ছোট ছেলেও ছিটিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তার নাকি মাসে একবার চুল কাটাতেই চলে যায় পাঁচ-সাত হাজার টাকা। তাই ‘বাঁচবই আর কয় দিন’ বলে কুসুমকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কুলসুম বেগম সব জানেন, বোঝেনও। তারপরও মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন…।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!