• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবায়ন

Reporter Name / ১৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতির বহুমুখী অভিঘাত, মূল্যস্ফীতির লাগামহীন চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি সংকটের আবর্তে বাংলাদেশের প্রান্তিক ও মেহনতি মানুষ এক নীরব লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। রাষ্ট্র যখন একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের প্রত্যয়ে অগ্রগামী, তখন সাধারণ মানুষের জীবনমানের সুরক্ষা এবং মৌলিক অধিকার সুদৃঢ় করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। এই পটভূমিতে সরকার-প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, কার্ডগুলোর অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হলো প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর জীর্ণ কাঠামোগুলো সংস্কার করে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা এবং সরাসরি প্রকৃত অংশীজনের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। চলতি জাতীয় বাজেটে এটিকে সরকারের অন্যতম প্রধান ‘সিগনেচার প্রোগ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই জনকল্যাণমুখী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন প্রান্তিক মানুষকে কতটা সুসংহত সুরক্ষা দিতে পারবে?

.

বাংলাদেশে অতীতে বহু কল্যাণমুখী উদ্যোগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও দীর্ঘসূত্রতার আবর্তে পড়ে মূল অভীষ্ট থেকে বিচ্যুত হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড সেই ত্রুটিপূর্ণ বলয় ভেদ করে একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ কল্যাণকাঠামো গড়ে তোলার সাহসী এবং কিছুটা উচ্চাভিলাষী অঙ্গীকার। অতীতে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমসমূহ ছিল মূলত জীবনচক্রভিত্তিক। যেমন বয়স্ক ভাতা বা মাতৃত্বকালীন ভাতা। কিন্তু এবারের উদ্যোগের লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে সামাজিক নায্যতা প্রতিষ্ঠা, যার সরাসরি সুবিধাভোগী হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। 

এবারের বাজেট বক্তব্যে সামাজিক সুরক্ষা জালের ব্যাপ্তি সম্প্রসারণ এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করার তাগিদে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ নারীকে এই কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে; যেখানে প্রতিটি খানা বা পরিবারের নারী প্রধানের অনুকূলে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সুচারুভাবে সম্পাদনের জন্য বাজেটে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

.

কৃষক কার্ড হলো গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষির ভিত্তি আরও টেকসই করার চাবিকাঠি। চলতি বাজেটে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে এই কার্ডের বৃত্তে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সার, বীজ, ডিজেল, কীটনাশক ও সেচের ভর্তুকি যখন ডিজিটাল মাধ্যমে কৃষকের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অথবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হবে, তখন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের শ্রমের অর্জিত ফসল কুক্ষিগত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের (আরএপিআইডি) দারিদ্র্য হ্রাসের মাইক্রো-সিমুলেশন মডেল এবং খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (এইচআইইএস) অনুযায়ী, প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে যদি শতভাগ নির্ভুলভাবে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং উল্লিখিত টার্গেট অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তা বাস্তবায়িত হলে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে ১১.৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে প্রাক্কলন করা যায়। তবে এই প্রাক্কলনের সম্ভাব্যতা নির্ভর করছে সফল বাস্তবায়নের ওপর।

.

বাজারদর ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি জর্জরিত। এই প্রেক্ষাপটে মাসিক নগদ সহায়তা বা ভর্তুকিযুক্ত কার্ড প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধক বা নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে কাজ করে তাদের ন্যূনতম পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তবে যেকোনো জনকল্যাণমূলক নীতির তাত্ত্বিক উৎকর্ষ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার সফল প্রয়োগের ওপর। এই কর্মসূচি থেকে সর্বোচ্চ সুফল আহরণের জন্য জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাপ্রসূত পদক্ষেপ অনুসরণ করা অপরিহার্য। বিশেষ করে নিখুঁত ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ডেটাবেজ প্রণয়ন করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। অতীতের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নয় (ইনক্লুশন এরর) এমন মানুষের হার ছিল উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রে এই ত্রুটির মাত্রা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে।

স্থানীয় সামাজিক প্রভাব বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব সম্পূর্ণ পরিহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমটি) বা বৈজ্ঞানিক মাপকাঠির ভিত্তিতে একটি সর্বাধুনিক ও স্বচ্ছ ডেটাবেজ তৈরি করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে দেশজুড়ে কাজ করছে। চলতি বাজেটেও এ ধরনের কঠোর ও মেধার ভিত্তিতে ডিজিটাল যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা বিতরণে কোনো অবস্থাতেই নগদ বা ম্যানুয়াল হস্তান্তরের অবকাশ রাখা যাবে না। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে অর্থ প্রেরণের মধ্য দিয়ে দুর্নীতির সুযোগ সংকোচন করতে হবে।

.

বৃহৎ পরিসরের সামাজিক সুরক্ষার সফল রূপায়ণের জন্য শক্তিশালী তদারকি ও মূল্যায়ন কাঠামো অপরিহার্য। এই ব্যবস্থার স্বরূপ হতে হবে বহুস্তরীয় ও স্বাধীন। সমাজের সব অংশীজনকে বিশেষ করে স্থানীয় তরুণ সমাজ ও কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা বাঞ্ছনীয়, যারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের গুণগত মান মূল্যায়ন করবে। বরাদ্দকৃত সহায়তা নির্ধারিত সময়ে সঠিক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিকস ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। কার্ড প্রাপ্তি বা প্রক্রিয়াকরণে কোনো অনিয়ম কিংবা হয়রানির শিকার হলে নাগরিকেরা যেন তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিকার চাইতে পারেন, সে জন্য একটি জবাবদিহিমূলক হটলাইন ও হেল্পডেস্ক ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা আবশ্যক।

উন্নত ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে সামাজিক সুরক্ষা কোনো কৃপা বা সাময়িক অনুকম্পা নয়, বরং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের (এসএনএপি) মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে অত্যন্ত কঠোর ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় সুনির্দিষ্ট খাদ্যসহায়তার কার্ড প্রদান করা হয়, যা কেবল পুষ্টিকর খাদ্য ক্রয়ে ব্যবহৃত হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশ ইউনিভার্সাল সোশ্যাল সিকিউরিটি সিস্টেমের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনযাত্রার মান রাষ্ট্র নিশ্চিত করে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের অর্থনৈতিক প্রোফাইল ও প্রয়োজন রাষ্ট্রের নিখুঁত ডিজিটাল তথ্যের অধীনে পরিচালিত হয়। উন্নত বিশ্বের এই সফল প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা, জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনার আর্থিক সক্ষমতা এবং বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সুচিন্তিত নীতিগত পরামর্শগুলো সমন্বিত করে আমাদের নিজস্ব আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের একটি আধুনিক মডেল গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে এই প্রকল্পের ব্যয় সংকোচন ও সরকারের অর্থ সাশ্রয়ের জন্য ম্যানুয়াল কার্ডের পরিবর্তে কিউআর কোড–সংবলিত ডিজিটাল কার্ড একটি টেকসই সমাধান হতে পারে।

.

এই বিশাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। প্রথমত, প্রশাসনিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব মাঠপর্যায়ে কার্ড বণ্টনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, উপকারভোগী নির্ধারণে ডেটাবেজ তৈরির সময় ভুল অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি প্রকৃত যোগ্যদের বাদ পড়ার ঝুঁকি থাকে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। পাশাপাশি সুশীল সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও অডিট প্রক্রিয়ার কঠোর প্রয়োগই এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারে।

একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের চূড়ান্ত মাপকাঠি নিহিত থাকে তার সাধারণ মানুষের স্বস্তি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের ওপর। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড যদি মাঠপর্যায়ে এর প্রকৃত স্পিরিট বজায় রেখে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা জাতীয় জীবনে এক বহুমুখী ইতিবাচক রূপান্তর ঘটাবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে সরাসরি নগদ অর্থ বা ভর্তুকিযুক্ত পরিষেবা পৌঁছানোর ফলে তাদের ভোগ ব্যয় ও সামগ্রিক কার্যকর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই বর্ধিত চাহিদা দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং খুচরা পণ্যের বাজারকে প্রাণবন্ত করে তোলে। দারিদ্র্য বিমোচনের কাঠামোগত রূপান্তরের এই উদ্যোগ সাময়িক ত্রাণের সংস্কৃতি বা হিতৈষী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজকে মুক্ত করে একটি কাঠামোগত ও মর্যাদাপূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তির পথ উন্মোচন করে।

.

বাজারদর ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি জর্জরিত। এই প্রেক্ষাপটে মাসিক নগদ সহায়তা বা ভর্তুকিযুক্ত কার্ড প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধক বা নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে কাজ করে তাদের ন্যূনতম পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে

.

ফ্যামিলি কার্ডের আর্থিক সুবিধা পরিবারের নারীপ্রধানের নামে হস্তান্তরিত হলে ঘরে ও বাইরে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এটি কেবল পারিবারিক কাঠামোটাই বদলে দেবে না, বরং সমাজে নারীর সামগ্রিক অবস্থান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। 

তবে মনে রাখতে হবে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কাঠামোগত সংকট উত্তরণের একটি সোপান, বিশেষ করে দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত, বিপন্ন পরিবারগুলো যারা সামগ্রিক জীবনচক্রের কোনো পর্যায়ে আর্থিক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে, তাদের জন্য এটি সাময়িক সুরক্ষাবলয় মাত্র। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্ডভিত্তিক ভর্তুকি বা নির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে অর্থনীতিকে সফলভাবে উত্তরণের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য সুদূরপ্রসারী কৌশল প্রণয়ন জরুরি।

প্রান্তিক পরিবারের কর্মক্ষম সদস্য ও যুবসমাজকে আধুনিক কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা ও সহজ শর্তে বিনিয়োগ সহায়তা প্রদান করে তাদের জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। মানুষ যখন নিজে আয়বর্ধক কার্যক্রমে যুক্ত হবে, তরুণ উদ্যোক্তারা স্বল্প ও মাঝারি বিনিয়োগভিত্তিক বাণিজ্যে যুক্ত হবে, তখন তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সহায়তার ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে ফেলতে পারবে। এ কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য পুঁজি এবং উৎপাদিত পণ্যের আধুনিক বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

.

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে নির্দিষ্ট কিছু তালিকাভুক্ত পরিবারের জন্য চিরস্থায়ী কোনো সমাধান হিসেবে না নিয়ে শুধু দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রয়োজনভিত্তিক সমাধান হিসেবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের আর্থিক কাঠামোতে বহাল রাখতে হবে যেকোনো আর্থিক সংকটগ্রস্ত পরিবারের আপৎকালীন সহায়তার জন্য। একটি নির্দিষ্ট সময় পর যখন কোনো পরিবার বা কৃষক অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে নির্দিষ্ট আয়সীমা অতিক্রম করবে, তখন তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে এবং তাদের স্থলাভিষিক্ত হবে অন্য কোনো নতুন দুস্থ পরিবার। এভাবে একটি ঘূর্ণমান, গতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চক্র নির্মিত হবে।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কেবল একটি সরকারি অনুদান নয়, এটি একটি বৈষম্যহীন, নায্যতাভিত্তিক এবং মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এক কল্যাণমুখী উদ্যোগ। বাজেটে এর জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার, সুচিন্তিত সুপারিশমালার প্রায়োগিক প্রতিফলন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি এই কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিত মানে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের জীবনধারায় এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী বিপ্লব সাধনে সক্ষম হবে।

.

* এম আবু ইউসুফ: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, র‍্যাপিড

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!