• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

গ্রামীণ বাণিজ্যের ‘জীবন্ত’ জাদুঘর

Reporter Name / ৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

২০০ বছরের পুরোনো হাটের নাম ‘রামসুন্দর মিস্ত্রির হাট’। পরে পরিচিতি পায় থানার হাট নামে।

.

প্রবীণদের স্মৃতিতে সেই বটতলার হাটটি এখনো জমজমাট। গাছের চারপাশে ছোট ছোট ঝুপড়ি। মাটির ঘরে বিক্রেতাদের পসরা। মটকায় রাখা শুঁটকি। পাশে চাল-ডাল, সুপারি আর মাছ-মাংসের দোকান। দিনভর হাঁকডাক, বেচাকেনা–গল্প।

বিকেল হলে বটতলায় বসত গানের আসর। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন শিল্পীরা। গান শুনতে মানুষ জড়ো হতেন। সন্ধ্যা নামলেও হাটের আসর সাঙ্গ হতো না। বিক্রেতারা চেরাগ জ্বালিয়ে দিতেন। দিনের আয়োজন তখন আলো পেত ছোট ছোট শিখায়। কেনাবেচা চলত সেই আলোতেই।

ইতিহাস গ্রন্থে চট্টগ্রামের পটিয়ার এই হাটের নাম পাওয়া যায় ‘রামসুন্দর মিস্ত্রির হাট’। পরে পরিচিতি পায় থানার হাট নামে। দীর্ঘ পথচলায় হাটটির সঙ্গে জড়িয়েছে পটিয়ার গ্রামের উৎপাদন, মানুষের প্রয়োজন আর বহু পরিবারের জীবিকা। গ্রামের পথ পেরিয়ে কৃষকেরা আসতেন ফসল নিয়ে। বেচাকেনার ফাঁকে পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা–সাক্ষাতেরও কেন্দ্র হয়ে ওঠে হাটটি।

.

আরাকান সড়কের ধারে ছিল এই হাট। পথের যাত্রী, গ্রামের কৃষক আর নানা এলাকার ব্যবসায়ীর আনাগোনায় একসময় মুখর বটতলা এখন নীরব। পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে গাছটি দাঁড়িয়ে আছে একা। তার নিচে আর হাট বসে না। পুরোনো হাটের স্মৃতি খুঁজতে সেখানে কথা বললাম প্রবীণ শিক্ষক ও বাসিন্দাদের সঙ্গে। তাঁদের কথায় ফিরে এল ঝুপড়ি, মাটির ঘর, গানের আসর আর চেরাগের আলোয় কেনাবেচার সেই দিনগুলো।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত (১৫৮১-১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) চট্টগ্রাম অঞ্চল সরাসরি আরাকান রাজাদের অধীনে শাসিত হতো। সে সময় চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের যাতায়াতের প্রধান সড়ক ছিল আরাকান সড়ক। বহু বদলের পর এটি এখন চট্টগ্রাম–কক্সবাজার সড়ক হিসেবে পরিচিত। সাবেক এই আরাকান রোডের ধারেই বসত রামসুন্দর মিস্ত্রির হাট। 

.

হাটের চারপাশের জনজীবন বুঝতে ফিরে তাকাতে হয় আরাকান সড়কের দিকেও। এই পথের গাছপালা আর গ্রামীণ সৌন্দর্যের একটি ছবি পাওয়া যায় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক দক্ষিণারঞ্জন বসু সম্পাদিত ছেড়ে আসা গ্রাম বইতে। তিনি স্মৃতিচিত্রে বলছেন, ‘সুদীর্ঘ আট-দশ হাত চওড়া আরাকান সড়কের দু-ধারে সারবন্দি বড় বড় গাছ-অশ্বত্থ, বট, আম, সোনালু আর গামার। নব কিশলয়ে ফুলে ফুলে তাদের বসন্তশ্রী মনে জাগায় সৃষ্টিকর্তার রস মাধুর্য। কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরি রং ধরায় মানুষের মনে, ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস বকুল ফুল কুড়োবার জন্যে ডাকে।’

আরাকান সড়কের ধারে বটতলায় গড়ে ওঠা বাণিজ্য মানুষের প্রয়োজনেই বিস্তৃত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে হাটের ঠিকানা বদলেছে। কিন্তু প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো এই বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে গ্রামের সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। এখনো এখানে আসে খেতের ফসল, পুকুরের মাছ, ঘরে পালিত গবাদিপশু। পণ্যের হাতবদলের সঙ্গে কৃষক পান ফসলের দাম। ব্যবসায়ীর লাভ হয়। শ্রমিক পান মজুরি। হাটের কেনাবেচা এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে বহু পরিবারের সংসারে।

.

রামসুন্দর মিস্ত্রির হাট থেকে থানার হাট

পটিয়ার প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, থানা প্রতিষ্ঠার আগেই পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের এলাকায় হাটটি বসিয়েছিলেন রামসুন্দর মিস্ত্রি নামের এক জমিদার। স্থানীয় প্রশাসনিক ইতিহাসের বিবরণে পটিয়ায় থানা প্রতিষ্ঠার সাল উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৪৫। প্রবীণদের ভাষ্য, পরে থানাকে ঘিরে হাটের বিস্তার ঘটে। মানুষের মুখে পরিচিতি পায় থানার হাট নামে।

হাটের স্মৃতি খুঁজতে বটতলায় গিয়ে কথা হলো মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে। পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক তিনি। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও ছিলেন। তাঁর স্কুলজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বটতলার বাজার।

.

এক টাকায় এক সের গরুর মাংস কেনার কথা মনে আছে তাঁর। মিজানুর রহমান বলেন, ‘তখন স্কুলে পড়ি। সালটা ১৯৭৫-৭৬। সে সময় বটগাছের নিচেই বসত হাট। সপ্তাহে দুই দিন—সোম ও শুক্রবার। প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হতো কেনাবেচা। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসত হাটে। শঙ্খ নদের পাড়ে হওয়া সবজি নিয়েও আসতেন কৃষকেরা। জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিকভাবেই ছিল কম।’

থানার হাটের বিস্তারে যাতায়াতের ভূমিকা ছিল বড়। কাছেই রেলস্টেশন। কিছুটা দূরে চাঁনখালী খাল। প্রবীণদের স্মৃতিতে আছে খালে নৌকা ভেড়ার দৃশ্য। ট্রেনে আসত গরু-ছাগল। গরুর গাড়ি ও জিপেও আসতেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

পটিয়ার পাশাপাশি বোয়ালখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চকরিয়া উপজেলা থেকে মানুষ আসতেন। ফলে স্থানীয় উৎপাদক বেশি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ পেতেন। এলাকার মানুষও পেতেন দূরের পণ্য। জলপথ, সড়ক ও রেলের সংযোগে হাটটি হয়ে উঠেছিল আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র।

.

বিনোদনের কেন্দ্র

পটিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল আলিমের স্মৃতিতে পুরোনো হাটের আরেক ছবি আছে। বিকেলে বটগাছের নিচে বসত গানের আসর। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন শিল্পীরা। পুরুষেরা নারীর বেশে নেচেও আনন্দ দিতেন হাটে আসা মানুষকে। তিনি নিজেও এমন আয়োজন দেখেছেন। অধ্যাপক আবদুল আলিম জানালেন, গান ও নাচ দেখতে মানুষ জড়ো হতেন। ভিড় বাড়লে বেচাকেনাও বাড়ত। সন্ধ্যা নামলে কুপি জ্বালিয়ে চলত কেনাবেচা। হাট তাই শুধু পণ্য বিনিময়ের জায়গা ছিল না। পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা, গল্প আর লোকজ বিনোদনেরও উপলক্ষ ছিল।

.

সময়ের সঙ্গে পালাবদল

জীবনের ৯ দশক পেরিয়েছেন আবদুস সোবহান। বয়সের ভারে ভারী বোঝা বহনের শক্তি কমেছে। হাটে ঘুরে বাজার করার টানটুকু কমেনি। তাই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন থানার হাটে। শৈশব থেকে চেনা এই হাটের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ জীবনের কত স্মৃতি। বটতলা থেকে রেলস্টেশনের পেছনের আজকের বাজার—হাট যতবার ঠিকানা বদলেছে, সোবহানও সেই পথে হেঁটেছেন।

হাটে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে দেখতে সোবহান ফিরে গেলেন পুরোনো দিনে। তাঁর ছোটবেলার বাজার ছিল ছোট পরিসরের। সময়ের সঙ্গে দোকান বেড়েছে। পণ্যের তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে। তিনি জানালেন, তখন গাছের চারা মিলত না। এখন চারা ও বীজ পাওয়া যায়। মুদিদোকানে এসেছে নানা রকমের পণ্য। শৈশবের পরিচিত হাটটি তাঁর চোখের সামনেই বড় হয়েছে, বদলে নিয়েছে নিজের চেহারা।

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের দিকে হাটটি বর্তমান ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে নেওয়া হয়। সেখানে ছিল ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত। আদালত নির্মাণের প্রয়োজনে আবারও স্থানান্তর করা হয়। পটিয়া রেলস্টেশনের পেছনে প্রায় চার একর জায়গায় গড়ে ওঠে নতুন থানার হাট।

.

হাটের একটি অংশ নিয়ে যাওয়া হয় পটিয়া সরকারি কলেজের দক্ষিণ পাশে। সেই জায়গাও পুরোনো থানার হাট নামে পরিচিত। কিছু অবকাঠামো আছে। কিন্তু নিয়মিত কেনাবেচার আগের ব্যস্ততা নেই। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরোনো থানার হাট এবার ৫২ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।

পুরোনো ও নতুন—দুই জায়গায় বাণিজ্যের ধরনও আলাদা হয়েছে। কোথাও গুরুত্ব পেয়েছে মৌসুমি পশুর বাজার। কোথাও নিয়মিত কেনাবেচা হয়। পৌরসভা ও থানার হাট পৌর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, হাটবারে নতুন থানার হাটে দুই থেকে আড়াই লাখ ক্রেতা-বিক্রেতা সমবেত হন। এক হাজারের বেশি বিক্রেতা পণ্য নিয়ে বসেন। আর ক্রেতাদের মধ্যে ৪০ শতাংশই নারী।

.

মাঠের ফসল, ঘরের সম্বল

থানার হাটের পসরা আসে মূলত পটিয়ার বিভিন্ন গ্রাম থেকে। সেখানে মিষ্টিকুমড়া, আলু, টমেটোসহ নানা সবজির আবাদ হয়। গোবিন্দারখিলের কৃষক আবু তোরবের প্রায় চার কানি জমি। কখনো মিষ্টিকুমড়া, কখনো আলু-টমেটো, কখনো ধান। ফলানো ফসল নিয়ে আসেন থানার হাটে। চাষের কথা বলতে বলতে তিনি খুলে বসেন সংসারের গল্পও। এই ফসলের আয়েই দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন ঘরে তিনি আর তাঁর স্ত্রী। আয় অল্প, তাতেই দিন চলে।

কৃষকের জমি থেকে হাটের দোকান পর্যন্ত পণ্য পৌঁছানোর কাজে আছেন ব্যবসায়ীরাও। আবদুল হাকিম আখ আনেন চন্দনাইশ থেকে। পটিয়ার এই বাসিন্দা প্রায় ৩৫ বছর ধরে আখ বিক্রি করছেন। বাবার হাত ধরে ব্যবসায় এসেছিলেন। এখন প্রতি হাটবারে তাঁর বেচাকেনা হয় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা।

মাঠের ফসলের বাইরে হাটের আরও পণ্য আছে। কেলিশহরের কুমারপাড়ায় এই হাটের জন্যই তৈরি হয় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, থালা ও ঢাকনা। এই পাড়ার বাসিন্দা পাখিজা বেগম (৫০) চার দশক ধরে মাটির তৈজসপত্র তৈরি করছেন। তাঁর তৈরি পাত্র খুচরা বিক্রেতারা কিনে নিয়ে যান থানার হাটে। পাখিজার মাস শেষে সব খরচ বাদে থাকে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। মাটিকে গৃহস্থালির পাত্র করে তোলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে তাঁর; তবে উপার্জন সামান্য।

.

পুরোনো হাটের নতুন দিনের আশা

একসময় নৌকা ও গরুর গাড়িতে পণ্য আসত থানার হাটে। এখন বদলেছে পরিবহনের ধরন, বেড়েছে মানুষের সমাগম। সেই সঙ্গে হাটকে আরও গোছানো করে তোলার প্রয়োজনও এসেছে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—সবার জন্যই কেনাবেচা সহজ হবে।

থানার হাট পৌর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলামের সঙ্গে হাটের অতীত ও বর্তমান নিয়ে আলাপ হলো। তিনি বলেন, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থানার হাট গ্রামের উৎপাদন আর মানুষের জীবিকার মধ্যে যোগসূত্র হয়ে আছে। কৃষক এখানে ফসলের ক্রেতা পান, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করেন। এই ঐতিহ্য নিয়ে আমরা গর্ব করি।’

.

হাটটিকে আরও সুন্দর ও গোছানো করে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। প্রায় চার একর আয়তনের এই হাটের কিছু অংশ দখল হয়ে গেছে বলে জানালেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দখল হওয়া অংশ উদ্ধার হলে চলাচলের পরিসর বাড়বে। ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং নিয়মিত অপসারণের ভালো ব্যবস্থাও প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা মিলে কাজ করলে এই পুরোনো হাট আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

বটতলার হাট আজ পটিয়ার পৌর এলাকার বড় বাজার। এই যাত্রা গ্রামের সঙ্গে শহরের সম্পর্ক বদলে যাওয়ারও গল্প। পটিয়া শহর বেড়েছে, মানুষের চাহিদা বেড়েছে। সেই চাহিদার জোগান দিতে গ্রামও তার উৎপাদন নিয়ে এগিয়ে এসেছে। প্রায় দুই শ বছরের থানার হাট দাঁড়িয়ে আছে এই দুইয়ের সংযোগস্থলে। তাকে ঘিরে আগামী দিনের সম্ভাবনাও এখানেই—পটিয়া যত এগোবে, তার গ্রামের মানুষ সেই অগ্রযাত্রার কতটা অংশীদার হতে পারবেন।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!