
গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয় মাধ্যম রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’। কিন্তু সেই অ্যাপের সূত্র ধরে তৈরি হওয়া পরিচয়ই যে এক তরুণীর জীবনে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। এক পাঠাও চালকের ওপর সরল বিশ্বাস রাখার চরম মাশুল দিতে হলো ২২ বছর বয়সী এক তরুণীকে। রাজধানীর হাতিরঝিল থানাধীন সোনারগাঁও হোটেল ভবন সংলগ্ন একটি বেসরকারি কনসাল্টিং প্রতিষ্ঠানে আটকে রেখে ওই তরুণীকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
(এফআইআর) থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই তরুণী গত ০৬ জুন, ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ০৫:০৯ ঘটিকায় হাতিরঝিল থানাধীন হোটেল সোনারগাঁও ভবনে অবস্থিত ‘Courtyard Building’ এর রুম নং-এল ১১২-তে অবস্থিত ‘Bangladesh Business Consulting’ অফিসের ভেতরে ধর্ষণের শিকার হন।
এজাহারে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, গত ২৬ মে, তারিখে অনলাইন রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’-এর মাধ্যমে ১নং বিবাদী মোঃ নিপু (২৪)-এর মোটরসাইকেলে চড়ে উত্তরা থেকে নিজের বর্তমান ঠিকানায় যান। সেই সুবাদে চালক নিপুর সাথে তার সাধারণ পরিচয় হয় এবং তারা পরস্পরের মোবাইল নম্বর বিনিময় করেন। পরবর্তীতে গত ০৫জুন, ২০২৬ তারিখে বিবাদী নিপু হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে বাদীর সাথে যোগাযোগ করেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে বাদী জানান যে, তার পরদিন (০৬ জুন) কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ইউসিবি একাডেমিতে একটি ক্লাস রয়েছে। ক্লাসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলে ১নং বিবাদী নিপু তাকে মোটরসাইকেলে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং পরীক্ষা শেষে পুনরায় নামিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। একজন পেশাদার চালক এবং পরিচিত মনে করে সরল বিশ্বাসে বাদী উক্ত প্রস্তাবে রাজি হন।
কৌশলে মিষ্টির দোকানে বসিয়ে রেখে অফিসে নিয়ে ধর্ষণ
পরীক্ষা শেষে দুপুর আনুমানিক ০৩:৩০ ঘটিকায় বিবাদী নিপু কৌশলে অন্য এক বন্ধুর মোটরবাইক আনার অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করেন এবং বাদীকে কারওয়ান বাজারের একটি মিষ্টির দোকানে বসিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে বিকেল আনুমানিক ০৫:০০ ঘটিকায় নিপু তার মোটরবাইকটি হোটেল সোনারগাঁওয়ের পার্কিংয়ে রাখা আছে জানিয়ে বাদীকে সাথে নিয়ে উক্ত হোটেলের চত্বরে প্রবেশ করেন। সেখানে গাড়ি না নিয়ে তিনি হোটেল সোনারগাঁওয়ের ৩নং গেটের পাশে অবস্থিত ‘Bangladesh Business Consulting’ নামক অফিসে বাদীকে নিয়ে প্রবেশ করেন।
অফিসে প্রবেশের পর সেখানে উপস্থিত ২নং বিবাদী মোঃ সোহেল রানা (২৯) বাদীর সাথে পরিচিত হন এবং চা-কফির অফার করেন। কিছু সময় পর সোহেল রানা অফিসের অন্য রুমে যাওয়ার নাম করে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর ফাঁকা অফিসে ১নং বিবাদী পাঠাও চালক মোঃ নিপু বাদীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষণের পর ২নং বিবাদী সোহেল রানা কক্ষে প্রবেশ করে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।
ঘটনার পর লোকলজ্জা এবং আসামিদের হুমকির কারণে তাৎক্ষণিক মামলা করতে না পারলেও, গত ০৭ জুন, ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ০৮:৩০ ঘটিকায় বাদী তুরাগ থানা এলাকায় ১নং বিবাদী নিপুকে কৌশলে নিয়ে আসে একপর্যায়ে নিপুর সাথে এসব বিষয়ে কথা বলার সময় সে ঘটনাটি বুঝতে পারে এবং তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে নিপু পালানোর চেষ্টা করলে বাদীর চিৎকারে স্থানীয় জনতা নিপুকে হাতেনাতে আটক করে এবং মারধর করে তুরাগ থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে। পরবর্তীতে তুরাগ থানা পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শেষে ঘটনাস্থল হাতিরঝিল থানা এলাকায় হওয়ায় আসামি ও বিষয়টিকে হাতিরঝিল থানায় হস্তান্তর করে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩)-এর ৯(১)/৩০ ধারা।
১নং আসামি (গ্রেফতারকৃত ধর্ষক): মোঃ নিপু (২৪), পিতা: মো: রুহুল আমিন শিকদার, পেশা: পাঠাও চালক। স্থায়ী ঠিকানা: বাউফল, পটুয়াখালী। বর্তমান ঠিকানা: কাওলা, বিমানবন্দর, ঢাকা।
২নং আসামি (সহযোগী): মোঃ সোহেল রানা (২৯), পিতা: আমির হোসেন, স্থায়ী ঠিকানা: মহেশপুর, ঝিনাইদহ। বর্তমান ঠিকানা: বাড্ডা, ঢাকা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ: হাতিরঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আসাদুজ্জামান এজাহারটি গ্রহণ করে মামলা রুজু করেছেন এবং সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) সুমন মিয়াকে মামলার তদন্তভার প্রদান করা হয়েছে।
হাতিরঝিল থানা পুলিশ জানিয়েছে, প্রধান আসামি নিপুকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ঘটনার সাথে জড়িত পলাতক ২নং আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সময়ের কণ্ঠস্বর কে বলেন, একজন সাধারণ যাত্রী হিসেবে ২৬ মে পাঠাও অ্যাপের মাধ্যমে উত্তরা থেকে নিপুর মোটরসাইকেলে উঠেছিলাম। সেই সুবাদে তার সাথে পরিচয় । গত ৩ জুন কারওয়ান বাজারে আমার ক্লাস থাকায় নিপু নিজেই আমাকে পৌঁছে দেয় এবং ক্লাস শেষে আবার নামিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। একজন চালক হিসেবে তাকে আমি সরল বিশ্বাসে বিশ্বাস করেছিলাম।
কিন্তু ক্লাসে শেষে সে কৌশলে অন্য বাইক আনার নাম করে সময় নষ্ট করে এবং গাড়ি পার্কিংয়ে আছে বলে আমাকে হোটেল সোনারগাঁও চত্বরের ভেতরের একটি বেসরকারি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে ২নং বিবাদী সোহেল রানা আমাদের চা-সিগারেটের অফার করে অন্য রুমে যাওয়ার নাম করে বাইরে থেকে দরজা লক করে দেয়। এরপর ফাঁকা অফিসে নিপু আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক আমাকে ধর্ষণ করে। আমি চিৎকার করতে চাইলে সোহেল রানা রুমে এসে আমাকে কান্না করতে নিষেধ করে এবং বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নানা ভয়ভীতি ও হুমকি দেখায়।
লোকলজ্জা আর তাদের হুমকির ভয়ে আমি প্রথমে কাউকে কিছু বলতে পারিনি। কিন্তু ৭ জুন রাতে তুরাগ এলাকায় আমি নিপুকে
কৌশলে নিয়ে আসি একপর্যায়ে নিপুর সাথে এসব বিষয়ে কথা বলার সময় সে ঘটনাটি বুঝতে পারে এবং তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে নিপু পালানোর চেষ্টা করলে আমি চিৎকার করি অতঃপর স্থানীয় জনতা নিপুকে ধরে ঘটনাটি শুনতে চায় কিন্তু সে বিষয়টি নিয়ে সেখানে বিশৃঙ্খল এবং উগ্র মেজাজ তৈরি করলে সেখানকার মানুষজন তাকে মারধর করে এবং তুরাগ থানা পুলিশের কাছে দিয়ে দেয়।
আমি আমার ওপর হওয়া এই পাশবিক নির্যাতনের তীব্র বিচার চাই এবং এই ঘটনার সাথে জড়িত দুই আসামিরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
হাতিরঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আসাদুজ্জামান সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু হয়েছে। প্রধান আসামি সহ আরও এক জনকে আমরা হেফাজতে নিয়েছি। রাইড শেয়ারিং অ্যাপের আড়ালে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ঘটনার সুষ্ঠু
ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে।