
ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, যুক্তির আলোয় সমালোচনা আর চিন্তার মুক্ত প্রকাশ—বিতর্কের সৌন্দর্য এখানেই। ভৈরব উপজেলায় সেই সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে ভৈরব বন্ধুসভা। ছয় বছরের ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠবারের মতো ৯ অক্টোবর শুরু হয়েছে ‘প্রথম আলো ভৈরব বন্ধুসভা বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২৬’ (স্কুল পর্যায়)। ভৈরব উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে আটটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিতর্ক দল। প্রথম রাউন্ড ও সেমিফাইনালের লড়াই শেষে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ব্লু বার্ড স্কুল ও এমবিশন পাবলিক স্কুল।
৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটায় ভৈরব বন্ধুসভার সভাপতি জান্নাতুল মিশুর সভাপতিত্বে বিতর্ক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ। তিনি ভৈরব বন্ধুসভার জ্ঞাননির্ভর আয়োজনের প্রশংসা করে এ ধরনের প্রতিযোগিতার বিস্তৃতি ঘটুক, এই প্রত্যাশা করেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও বন্ধুসভার উপদেষ্টা সুমন মোল্লা, উপদেষ্টা লুবনা হক, ওয়াহিদা আমিন, জাহিদুল হকসহ বন্ধুসভার বন্ধুরা।
.
প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয় ৯ ও ১১ অক্টোবর। প্রথম রাউন্ডের সব কটি বিতর্কের বিষয় ছিল ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের চেয়ে নাগরিক সচেতনতাই বেশি কার্যকর’। জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বক্তব্যের জবাব দিয়েছে অংশগ্রহণকারী দলগুলো। পাল্টাপাল্টি যুক্তি আর সাবলীল উপস্থাপনায় জমে ওঠে প্রতিটি পর্ব।
প্রথম দিনের প্রথম বিতর্কে মুখোমুখি হয় ব্লু বার্ড স্কুল ও গাজীপুর শাহীন ক্যাডেট একাডেমি ভৈরব শাখা। ভৈরব বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি প্রিয়াঙ্কার সঞ্চালনায় এবং ইউএনও কে এম মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় বিতর্কটি। দুই দলের যুক্তিতর্কের পর বিজয়ী হয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় ব্লু বার্ড স্কুল।
একই দিনের দ্বিতীয় বিতর্কে অংশ নেয় আফছর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় ও ভৈরব সরকারি কাদির বকস পাইলট মডেল হাইস্কুল। ভৈরব বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাফিস রহমানের সঞ্চালনায় এবং প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ পর্বে বিজয়ী হয় ভৈরব সরকারি কাদির বকস পাইলট মডেল হাইস্কুল।
.
প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় দিনেও যুক্তির লড়াইয়ে মুখর হয়ে ওঠে বিতর্কের মঞ্চ। দিনের প্রথম বিতর্কে মুখোমুখি হয় ভৈরব পৌর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কমলপুর হাজী জহির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়। ভৈরব বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি প্রিয়াঙ্কার সঞ্চালনায় এবং ভৈরবের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিতর্কসুহৃদ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বিতর্কে বিজয়ী হয় ভৈরব পৌর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।
দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় বিতর্কে অংশ নেয় এমবিশন পাবলিক স্কুল ও বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চবিদ্যালয়। ভৈরব বন্ধুসভার সভাপতি জান্নাতুল মিশুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ পর্বে বিজয়ী হয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় এমবিশন পাবলিক স্কুল।
প্রথম রাউন্ডের চারটি পর্ব শেষে সেমিফাইনালে ওঠে ব্লু বার্ড স্কুল, ভৈরব সরকারি কাদির বকস পাইলট মডেল হাইস্কুল, ভৈরব পৌর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও এমবিশন পাবলিক স্কুল। এরপর ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল রাউন্ড। দুটি পর্বেই বিতর্কের বিষয় ছিল ‘শিশু নির্যাতন বন্ধে আইনের প্রয়োগের চেয়ে পারিবারিক সচেতনতা বেশি কার্যকর’।
.
সেমিফাইনালের প্রথম পর্বে পক্ষ দল হিসেবে অংশ নেয় ব্লু বার্ড স্কুল এবং বিপক্ষ দল হিসেবে অংশ নেয় ভৈরব সরকারি কাদির বকস পাইলট মডেল হাইস্কুল। মোশাররফ রাব্বির সঞ্চালনায় এবং সত্যজিত দাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ পর্বে পাল্টাপাল্টি যুক্তির লড়াই শেষে বিজয়ী হয় ব্লু বার্ড স্কুল। এর মধ্য দিয়ে দলটি ফাইনালে পৌঁছে যায়।
সেমিফাইনালের দ্বিতীয় পর্বে মুখোমুখি হয় ভৈরব পৌর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও এমবিশন পাবলিক স্কুল। মহিমা মেধার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ পর্বে বিজয়ী হয় এমবিশন পাবলিক স্কুল। ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে দলটি। দুই পর্বের ফলাফলে ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ব্লু বার্ড স্কুল ও এমবিশন পাবলিক স্কুল।
ফাইনালে পক্ষ দল হিসেবে অংশ নেবে এমবিশন পাবলিক স্কুল এবং বিপক্ষ দল হিসেবে অংশ নেবে ব্লু বার্ড স্কুল। ফাইনালের বিতর্কের বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ’।
.
এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ছয়টি পর্বে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বিতর্ক শিক্ষক ও অভিজ্ঞ বিতর্ক সংগঠকেরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শিমুলকান্দি ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাফর হোসেন, সরকারি হাজী আসমত কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পান্না সুলতানা, বাংলা বিভাগের প্রভাষক লুবনা ফারজানা এবং দর্শন বিভাগের প্রভাষক নাজিয়া আফনুজ লুনা; সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ইমরান হোসাইন, রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক নিলুফার ইয়াসমিন ও জোনায়েদ বোস্তামী; জিল্লুর রহমান প্রিমিয়ার ব্যাংক স্কুল অ্যান্ড কলেজের কৃষিশিক্ষা বিভাগের প্রভাষক মাহবুবা রহমান, আফছর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রিপন, ভৈরব উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির বিতর্ক শিক্ষক সৈয়দ মারুফ আহমেদ, সাবেক বিতার্কিক ও সংগঠক জান্নাতুল মিশু এবং বিতর্ক সংগঠক নাফিস রহমান।
এবারের প্রতিযোগিতায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে বিতর্কের সৌহার্দ্যপূর্ণ দিকটি। প্রতিটি বিতর্ক শেষে দুই দলের বিতার্কিকেরা পরস্পরের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় এবং প্রতিপক্ষ দলের ভালো দিক নিয়ে একটি করে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। বিতর্ক কর্মশালায় শেখানো এই চর্চা প্রতিযোগিতার মঞ্চেও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরেও যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের জায়গা থাকে, সেই বিষয়টিকেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে ভৈরব বন্ধুসভা।
প্রতিযোগিতার প্রতিটি পর্ব ভৈরব বন্ধুসভার ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন সাবেক সভাপতি নাহিদ হোসাইন ও তাঁর কারিগরি দল।
আহ্বায়ক, বিতর্ক প্রতিযোগিতা কমিটি–২০২৬, ভৈরব বন্ধুসভা