• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline

মার্কিন ও জাপানি ব্র্যান্ডের ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ তৈরি হচ্ছিল রাজশাহীর এক বাড়িতে

Reporter Name / ১৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

একটি বোতলের গায়ে লেখা যুক্তরাজ্যে উৎপাদিত আর বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ময়নসিংহের ভালুকায়। আরেকটি গায়ে দেওয়া রয়েছে জাপানি কোম্পানির নাম আর উৎপাদনের সিরিয়ালে লেখা যুক্তরাষ্ট্রের নাম। এভাবে দেশি–বিদেশি নামীদামি ব্র্যান্ডের নামে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট (খাদ্য পরিপূরক—ভিটামিন বা ওষুধ) তৈরির একটি কারখানার সন্ধান মিলেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার তেঁথুলিয়া মাঠে।

আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে ওই কারখানার প্রায় দুই ট্রাক ওষুধ মাঠেই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। আরও তিন ট্রাক সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।

সন্ধ্যার পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বাঘা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহানের নেতৃত্বে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল বাঘা থানা–পুলিশের সহায়তায় এ অভিযান পরিচালনা করছেন। কারখানা খুলে মালামাল জব্দ করা হচ্ছে। এর মধ্যে তৈরি পণ্য, পণ্য তৈরির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র রয়েছে।

.

প্রাথমিক ধারণা থেকে সহকারী কমিশনার নুসরাত জাহান প্রথম আলোকে বলেন, যে রকম দামের একেকটি প্যাকেট পাওয়া যাচ্ছে, তাতে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের নকল ওষুধ তারা জব্দ করেছেন। এগুলোর মধ্যে প্রায় দুই ট্রাক মাঠেই পোড়ানো হয়েছে। বাকিটা নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

নুসরাত জাহান বলেন, মালিককে ঘটনাস্থলে না পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তা এখানে এসেছেন। তিনি দেখছেন, নিয়মিত মামলা করা যায় কি না।

.

জব্দ করা মালামাল নিতে আড়ানী পৌরসভার একটি ট্রাক নিয়ে আসা হয়। কারখানার তালা খুলে দেখা যায়, ভেতরে বিপুল পরিমাণ ওষুধের কার্টন থরে থরে সাজানো। সেই সঙ্গে রয়েছে ওষুধ তৈরি করার যন্ত্রপাতিও। জব্দ করা সব জিনিসপত্র নিতে পারলেও ট্যাবলেট প্রস্তুতকারী যন্ত্রটা নিতে পারেননি।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল প্রথম আলোকে বলেন, এত ওজনের একটা যন্ত্র নিয়ে যাওয়া আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। তবে তিনি যন্ত্রটি অকেজো করে দিয়েছেন।

.

যেভাবে কারখানার সন্ধান

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী থানা–পুলিশ ওই থানায় করা একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার নুসরাত জাহানের নেতৃত্বে এই কারখানায় অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে আটক করেন। বনানী থানার মামলায় অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে নিয়ে যায় তারা।

নুসরাত জাহান জানান, বনানী থানা এলাকার পুলিশ ‘কারকুমা’ নামের একটি পণ্যের সূত্র ধরে এসেছিল। কারখানায় পাওয়া নকল ‘কারকুমা’র সব পণ্য তারা জব্দ করে নিয়ে যান। তবে আটক করে নিয়ে যাওয়া দুই ব্যক্তির নাম তিনি বলতে পারেননি। তিনি এ ব্যাপারে বনানী থানা–পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

.

এরা মস্ত বড় প্রতারক। তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিদেশি নামীদামি কোম্পানির ব্র্যান্ড নকল করে এখানে ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করছে। এগুলোর দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা।

মেহেদী আফজাল, তত্ত্বাবধায়ক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, রাজশাহী জেলা  

.

যোগাযোগ করা হলে বনানী থানার (ওসি) মো. সালাউদ্দিন বলেন, জুলাই মাসের একটি মামলায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাঘায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির একটি কারখানা পাওয়া গেছে। সেখান থেকে মামলার অন্যান্য আলামত জব্দ করে নিয়ে আসা হয়েছে। সহকারী কমিশনার নুসরাত জাহান বলেন, বুধবার রাতে আটক বাকি নয়জনের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেন। বাকি চারজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা তাৎক্ষণিক আদায় করা হয় এবং কারখানা সিলগালা করে রেখে যান।

.

জরিমানার রশিদে সই করেছেন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চকলক্ষ্মীপুর গ্রামের আবু সৈয়দ হোসেনের ছেলে খালিদ হাসান। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯–এর ৪১ ধারায় এই জরিমানা করা হয়। সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন দুই শ্রমিক—নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার লক্ষ্মীকুল গ্রামের দিলু মিয়া ও হাসমত। অন্য ছয় শ্রমিকের বাড়িও নাটোরে।

.

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল বলেন, এরা মস্ত বড় প্রতারক। তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিদেশি নামীদামি কোম্পানির ব্র্যান্ড নকল করে এখানে ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করছে। এগুলোর দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা। তিনি বলেন, মোড়কে বা কৌটার গায়ে সরাসরি ওষুধ না লেখার কারণে তারা মামলা করতে পারছেন না। কিন্তু অনুমোদন না থাকার কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হয়েছে।

.

‘কারকুমা’ নামের যে পণ্যের সূত্র ধরে বনানী–থানা পুলিশ অভিযান চালিয়েছিল, তার প্রতিটি প্যাকেটের দাম ২ হাজার ১৭০ টাকা। কোরিয়ায় প্রস্তুত করা লেখা একটি প্যাকেটের গায়ে দাম ২ হাজার ৩৯৯ টাকা আর মালোয়েশিয়া লেখা একটি প্যাকেটের গায়ের দাম লেখা রয়েছে ২ হাজার ২৯০ টাকা।

এসব ওষুধ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্রেতার কাছে পাঠানো হয়। অনলাইনের মাধ্যমে মূলত এই ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। কারখানায় তার কয়েকটি নমুনাও পাওয়া গেছে। বিভিন্ন কুরিয়ারে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত প্যাকেটও জব্দ করা হয়েছে অভিযানে।

.

বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকত কারখানাটি

স্থানীয় লোকজন জানান, আধাপাকা কারখানাটি বাইরে থেকে তাঁরা সব সময় তালাবদ্ধ দেখেন। পেছনের একটি দরজা দিয়ে হয়তো সেখানকার লোকজন ভেতর ঢোকেন। বাড়িটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, শোবার খাট, খাওয়ার থালাবাসন। নলকূপটিও কারখানার ভেতরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়ির মালিক হায়দার আলী চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। তাঁর ভাই শামীম ও মা রিনা বেগম জানান, প্রায় ছয় মাস আগে নাটোরের রেজাউল করিম মাসে আট হাজার টাকা ভাড়ায় বাড়িটি নেন। তবে বাড়ির ভেতরে কী ধরনের কাজ চলত, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।

শামীম আরও জানান, রেজাউল করিম ‘নাটোর ভেষজ মার্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি বাড়ির মালিকের কাছে জমা রেখেছিলেন। লাইসেন্সটি নাটোরের খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর দাবি। এই লাইসেন্সের মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ৫ মে পর্যন্ত। ফোন নম্বর বন্ধ থাকার কারণে রেজাউলের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!