• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৩ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

মহাবিপন্ন বৃক্ষ চালমুগরা

Reporter Name / ১০ Time View
Update : রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

আমাদের বন–পাহাড়ের সুদর্শন বৃক্ষ চালমুগরা বা ডালমুগরি বর্তমানে মহাবিপন্ন। ২০১৪ সালে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে গাছটি প্রথম দেখি। পরের বছর খাগড়াছড়ির আলুটিলা ডাউনের বটগাছ দেখতে গিয়ে প্রাকৃতিক আবাসে আবার গাছটি দেখার সুযোগ হয়। তখন গাছটি ভালোভাবে চিনতে পারিনি। এতটা বিপন্ন, তা–ও বুঝতে পারিনি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম এবং আইইউসিএন প্রকাশিত রেড লিস্টে গাছটিকে মহাবিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

রেড লিস্টে মহাবিপন্নতার তথ্য দেখে আবার গাছটির কথা মনে পড়ল। এই গাছ বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজারের কিছু বনাঞ্চলে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ১০টি স্থানে প্রাকৃতিক আবাসে এ গাছের বেঁচে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপে প্রতিটি স্থানেই ১ থেকে ৩টি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ দেখা গেছে এবং বর্তমানে সেগুলো হুমকির মুখে রয়েছে। বর্ণিত স্থানগুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রাকৃতিক আবাসে মোট উদ্ভিদের সংখ্যা ১০০–এর কম পাওয়া গেছে। গড়পড়তা প্রতিটি স্থানে এই সংখ্যা ৫-এর নিচে; যা ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নির্ধারিত সূচকের চেয়েও অনেক কম। গাছটির দ্রুত বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর বীজের অত্যধিক আহরণ। কারণ, বীজের তেল কুষ্ঠ ও অন্যান্য চর্মরোগের চিকিৎসায় কার্যকর। তা ছাড়া চালমুগরার প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির হারও অত্যন্ত কম বলেই পরিলক্ষিত হয়েছে।

.

স্থানীয় পরিসরে গাছটি বান্দরবানের পলি ও রেমাক্রি প্রাংসা; চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাজারীখিল, বারোইয়াধলা ও ধোপাছড়ি; কক্সবাজারের ভোমারিঘোনা; খাগড়াছড়ি আলুটিলার কাছে; রাঙামাটির রামপাহাড়, দামাইছড়ি, ফারুয়া, কাসালং-মাসালং, পাবলাখালী ও মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া এবং শ্রীমঙ্গলে দেখা যায়। সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে এ গাছ রোপণ করা হয়েছে।

চালমুগরা (Hydnocarpus kurzii) চিরসবুজ মাঝারি আকারের বৃক্ষ। এই গাছ ১২ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গাছের কাণ্ড সরল, গোলাকার ও সোজা। বাকল মসৃণ ও পুরু; রং সবুজাভ ধূসর। পাতা পুরু, ভল্লাকার বা আয়ত ভল্লাকার, আগা সুচালো, কিনারা সমান, তবে পাতার দুই পাশ ঢেউখেলানো। রং গাঢ় সবুজ। শিরা স্পষ্ট। হালকা হলুদ রঙের সুগন্ধি ফুলগুলো কখনো এককভাবে, আবার কখনো থোকায় থোকায় ফোটে। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা ফুল ফোটার সময়। হেমন্তকালে ফল পরিপক্ব হয়। ফল গোলাকার, পাকা ফল শক্ত, পুরু ও বাদামি। ফলের ভেতর কয়েকটি বীজ থাকে।

বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উৎস থেকে গাছ সংগ্রহ করা হলেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চলেও এ গাছ চাষাবাদ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারতে গত ১০ বছরে এই প্রজাতির সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

.

এটি আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের বৃক্ষ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মাতে পারে। যেখানে দিনে তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে এবং বছরে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি থাকে, সেখানে এই গাছ ভালোভাবে জন্মে ও বেড়ে উঠতে পারে। পূর্ণ সূর্যালোক এবং হালকা ছায়াযুক্ত স্থানও পছন্দ। প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মাতে পারে; তবে সুনিষ্কাশিত বেলে-পলিযুক্ত সমতল ভূমি অথবা আর্দ্র কিন্তু সুনিষ্কাশিত পরিবেশেও ভালো বৃদ্ধি পায়।

চালমুগরা মহাবিপন্ন উদ্ভিদ হলেও গাছটি চমৎকার ঔষধি গুণসম্পন্ন। এই গাছ বিচিত্র রোগে মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। শরীরের কোথাও চুলকানি বা চুলকানির কারণে শরীর লাল হয়ে ফুলে গেলে চালমুগরার তেল চুলকানির স্থানে ভালোভাবে লাগিয়ে দিলে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যাবে। আমাশয় নিরাময়ে চালমুগরার পাতা পানিতে সেদ্ধ করে পানিটা ছেঁকে গরম করে পান করলে উপকার পাওয়া যায়। কুষ্ঠরোগে চালমুগরার বীজতেল গরম করে সকাল–বিকেল খেলে উপশম হয়। চুলে খুশকি হলে চালমুগরার তেল মাথায় লাগিয়ে এ অবস্থায় আধা ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। তারপর মাথা
ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। তাহলে খুশকি কমে যাবে। চর্মরোগে চালমুগরার পাতা বেটে নিয়ে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে চর্মরোগ ভালো হয়ে যায়। ডায়াবেটিসের প্রথম অবস্থায় চালমুগরার ১ গ্রাম বীজগুঁড়া প্রতিদিন সকাল–বিকেল গরম পানিসহ খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। চালমুগরার তেল গরম করে তাতে মৌচাকের মোম মিশিয়ে মলম তৈরি করে খোসপাঁচড়া ও সাধারণ ঘায়ে লাগালে সেরে যায়। চীন ও আর্জেন্টিনায় চালমুগরা তেল ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

  • মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!