
ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ইতালিতেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন হাজারো তরুণ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। ১৭ অক্টোবরের সহিংস বিক্ষোভের পর শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানী রোম, মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া, ফ্লোরেন্সসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিন পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের ঘটনা ঘটলেও আগের সপ্তাহের মতো ব্যাপক লুটপাট হয়নি।
ইতালির জননিরাপত্তা বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিক্ষোভ–সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় ৪ হাজার ২৯২ জনের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে। ৩৭১ জনকে পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ৬৯ জন বিদেশি নাগরিক।
.
ইতালির সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন-জির অনেকেই মনে করছেন, তাঁদের মা-বাবার প্রজন্ম যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল, তা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের এই অসন্তোষের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, অনিশ্চিত চাকরির বাজার এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ।
.
অক্টোবরের মাঝামাঝি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মুভিমেন্তো ১৭ অত্তোব্রে’ নামে একটি আন্দোলনের প্রচার শুরু হয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও বিভিন্ন অনলাইন চ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে তরুণদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আন্দোলনকারীদের প্রধান অভিযোগ, ইতালিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও বাসাভাড়ার ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। বিশেষ করে মিলান, রোম ও বোলোনিয়ার মতো বড় শহরগুলোতে শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিজীবীদের জন্য আবাসন ব্যয় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সব বিক্ষোভ একই আন্দোলনের অংশ নয়। শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলোও পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামরিক ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সরকার সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
.
ইতালির সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেন–জির অনেকেই মনে করছেন, তাঁদের মা–বাবার প্রজন্ম যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল, তা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের এই অসন্তোষের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, অনিশ্চিত চাকরির বাজার এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ।
ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের সংগঠন ‘উনিয়নে দেইলিঁ উনিভেসিতারি’–এর জাতীয় সমন্বয়ক সাবরিনা ব্রিৎসোলা সম্প্রতি এক সমাবেশে নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ; শুধু শিক্ষার সুযোগ পেলেই হবে না, সেই শিক্ষা হতে হবে মানসম্মত এবং শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রয়োজন। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস ফিন্টেলমান সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ইউরোপের রাজনীতি নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, এমন অনুভূতি থেকেই দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরিগুলো আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
.
ইতালির আন্দোলনের সঙ্গে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কিছু মিল রয়েছে। দুই দেশেই শিক্ষার মান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। ৭ অক্টোবর রোমের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করে। আন্দোলনকারীদের প্রকাশিত বিবৃতির শুরুতেই ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানানো হয়। তবে ইতালির সরকার দুই দেশের পরিস্থিতিকে এক করে দেখতে রাজি নয়। চলতি মাসের শুরুতে ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা বলেন, ইতালির পরিস্থিতি ফ্রান্সের চেয়ে অনেক আলাদা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর বক্তব্যে দুই দেশের তরুণদের দাবির মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের কৌশল পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। তাঁর মতে, শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসন এবং তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির দাবি বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
.
সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল রাজপথের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর মধ্য দিয়ে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রজন্মের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষও সামনে আসছে।
.
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া। ‘১৭ অক্টোবর আন্দোলন’-এর আয়োজকেরা ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের স্থান শেষ মুহূর্তে জানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এর ফলে সম্ভাব্য জমায়েতস্থল নির্ধারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিকল্পনা তৈরিতে পুলিশের জন্য বাড়তি জটিলতা তৈরি হয়। এই বিক্ষোভের আগের দিন দেশটির ১৮টি শহরে পুলিশ তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে। আগের সপ্তাহের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে প্রায় ১০০ জনকে শনাক্ত করা হয়, যাঁদের প্রায় অর্ধেক অপ্রাপ্তবয়স্ক।
রাজধানী রোমে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ঐতিহাসিক কলোসিয়ামে প্রবেশ করে। শহরের কেন্দ্রস্থলে কুইরিনালে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি এলাকায় পুলিশের দিকে বোতল নিক্ষেপের পর সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। উত্তর ইতালির তুরিনে সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রায় চার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশের বাধা অতিক্রমের চেষ্টা এবং সংঘর্ষের ঘটনায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। সেখানে দুজনকে গ্রেপ্তার এবং ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। বোলোনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের একাংশ সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। স্থানীয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হিসাবে সেখানে অন্তত ১৯ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন।
.
ফ্লোরেন্সেও বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বিলাসবহুল দোকানপাটের এলাকার দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। অন্যদিকে মিলানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ বিক্ষোভে অংশ নিলেও পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। সন্ধ্যায় বিভিন্ন মিছিল একত্র হওয়ার পর অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছায় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। নাপোলি, পাদোভা ও বারিসহ আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হলেও বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
.
ইতালির সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম আলোচিত সংগঠন ‘মুভিমেন্তো ১৭ অত্তোব্রে’ বা ‘১৭ অক্টোবর আন্দোলন’-এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩০ বছর বয়সী ইউসেফ সিহেরকে আটক করেছে মিলানের পুলিশ। ইতালির সংবাদমাধ্যম ইল জর্নো জানিয়েছে, মরোক্কান বংশোদ্ভূত ইতালীয় নাগরিক ইউসেফ সিহের একজন সাংবাদিক ও গবেষক। তিনি মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
.
তদন্তকারীদের ধারণা, সিহের আন্দোলনের ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামভিত্তিক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধে উসকানি এবং সন্ত্রাসী উদ্দেশ্যে অপরাধে উসকানির অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগে তদন্ত চলছে বলে ইতালির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁকে মিলানের সান ভিত্তোরে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। ২৬ অক্টোবর তাঁর আটকের বৈধতা পর্যালোচনার জন্য বিচারকের সামনে হাজির করা হয়। তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। তাঁর স্ত্রী, ৩২ বছর বয়সী লেবানিজ বংশোদ্ভূত সাজিয়া হাম্মুদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে তদন্ত চলছে।
.
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস ফিন্টেলমান সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, ইউরোপের রাজনীতি নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, এমন অনুভূতি থেকেই দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরিগুলো আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
.
এদিকে আন্দোলনের প্রকাশিত ইশতেহার থেকে জানা যায়, সংগঠনটি প্রচলিত রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠনটি নিজেদের কোনো স্থায়ী সভাপতি বা মুখপাত্র ছাড়াই পরিচালিত একটি বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। তবে সংগঠনটির ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানকে ইতালির সব বিক্ষোভকারীর অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
.
শুধু তরুণ ও শিক্ষার্থীরাই নন, ইতালির পরিবহন খাতের শ্রমিকেরাও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ইতালিতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ট্রাকচালকেরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহসংকটের কারণে সমস্যার মুখে পড়েছেন। পরিবহনশ্রমিকদের অবরোধের কারণে কিছু এলাকায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাতেও। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ইতালির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অসন্তোষ শিক্ষার্থী ও তরুণদের বাইরে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও বিস্তৃত হচ্ছে।
.
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি বিক্ষোভের সময় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ২৪ অক্টোবরের ঘটনার পর তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শনের অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি নাগরিকদের নিরাপদে বসবাসের অধিকারও রক্ষা করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি জানিয়েছেন, সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। সরকার বিক্ষোভের আগে বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, তল্লাশি এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষস্থলে নজরদারি বাড়ায় এবং মিলানের কেন্দ্রস্থলে সেনাসদস্যদেরও নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ পুলিশের কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করেছে। তাঁদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময়ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
.
ইতালির বিভিন্ন শহরে সহিংসতার আশঙ্কায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। মিলানে ২৪ অক্টোবর কয়েকটি দোকান আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ত্রিয়েস্তেতে সম্ভাব্য বিক্ষোভের আশঙ্কায় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দোকানের কাচ কাঠের আবরণ দিয়ে সুরক্ষিত করে। কয়েকটি দোকান সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ত্রিয়েস্তেতে ঘোষিত বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়নি, তবু সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলে। ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফলমূলের দোকান, মিনিমার্কেট, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর বাণিজ্যিক এলাকায় যাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাঁদের জন্য এ ধরনের অস্থিরতা বাড়তি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। দোকান বন্ধ রাখা, ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যাওয়া কিংবা পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ফলমূল ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে বাংলাদেশি মালিকানাধীন কোনো দোকানে সরাসরি হামলা হয়েছে কি না, কিংবা কোনো বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বিক্ষোভের কারণে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মোট আর্থিক ক্ষতির কোনো নির্দিষ্ট হিসাবও পাওয়া যায়নি। ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়া ৩৭১ জনের মধ্যে ৬৯ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন। তবে ইতালির জননিরাপত্তা বিভাগের প্রকাশিত তথ্যে তাঁদের জাতীয়তা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিক্ষোভে বাংলাদেশিদের সংগঠিত অংশগ্রহণের বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
.
২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের পরও আন্দোলন থামানোর কোনো ঘোষণা আসেনি। তুরিনে সামরিকীকরণবিরোধী আন্দোলনের আয়োজকেরা ৩০ অক্টোবর সাধারণ ধর্মঘট উপলক্ষে আবারও রাস্তায় নামার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। একদিকে ইতালির সরকার আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং আবাসনসংকটের সমাধান দাবি করছেন। ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল রাজপথের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর মধ্য দিয়ে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রজন্মের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষও সামনে আসছে। এখন দেখার বিষয়, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবিগুলো মোকাবিলায় মেলোনি সরকার কী পদক্ষেপ নেয়।