• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৪ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাচার প্রতিরোধ কর্মকর্তা ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব গম আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিষ্ঠানের দর যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত সেপ্টেম্বরে প্রায় এক লাখ ভারতীয় হেলমেট আমদানি, হঠাৎ আমদানি বাড়ল কেন আরব দলগুলোর চমক, তৈরি হতে পারে নেতানিয়াহুর বিদায়ের পথ জিনস প্যান্ট ও অন্তর্বাসে পাচারের চেষ্টা, শাহজালালে মিলল ২৪ কোটি টাকার সোনা যশোরে ভেজালমুক্ত খেজুর গুড় উৎপাদনে গাছিদের শপথ র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠার দিনে ইয়ানসেনের মাইলফলক ময়মনসিংহে নিহত সেলুনমালিকের গলা-বুক-পিঠে ১০ ছুরিকাঘাত, একজন গ্রেপ্তার ‘আকাশমণি’ থেকে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সূত্রপাত কি না, খতিয়ে দেখছে কমিটি বাংলাদেশ-জাপান ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯ কোটি ৫৫ লাখ ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি

‘আকাশমণি’ থেকে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সূত্রপাত কি না, খতিয়ে দেখছে কমিটি

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার একটি অংশসহ চট্টগ্রাম পর্যন্ত বেশ কিছু জেলা মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। তবে এটি বিদ্যুতের চাহিদা-ঘাটতির সমন্বয়ের জন্য করা কোনো লোডশেডিং ছিল না; বরং বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পায়নি বহু মানুষ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এ বিপর্যয়ের সূত্রপাত মেঘনা ঘাট-হরিপুর সঞ্চালন লাইনে।

এই বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে পাওয়ার গ্রিড পিএলসির চারজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের মধ্যে আছেন বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ জানতে গঠিত তদন্ত কমিটির দুজন। তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ সঙ্গে সঙ্গে জানা যায় না। এটি বের করতে কয়েক দিন সময় লাগে। তবে প্রাথমিকভাবে একটি উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। যেখানে হাইভোল্টেজ গ্রিড লাইনের নিচে কয়েকটি আকাশমণি গাছ পাওয়া গেছে।

সঞ্চালন কাজে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রিডে নানা কারণে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সিতে (কম্পাঙ্ক) সামান্য হেরফের; লাইনে ক্ষমতার চেয়ে কম বা বেশি বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হওয়া; এমনকি সক্রিয় লাইনে পাখি বসা, গাছের ডালপালা ভেঙে পড়া বা কোনো জৈব পদার্থের সংস্পর্শ থেকেও গ্রিড বন্ধ হয়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত গ্রিড বিপর্যয় হলে অবকাঠামোগত ক্ষতি চোখে পড়ে। এবারের বিপর্যয়ে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না।

.

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাওয়ার গ্রিডের কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, গ্রিড লাইনের দুর্ঘটনা এড়াতে নিয়মিত টহল দল কাজ করে। লাইনের কাছাকাছি গাছের ডাল থাকলে তা কেটে দেওয়া হয়। মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনের মাঝামাঝি একটি এলাকায় কয়েকটি আকাশমণি গাছ আছে। কাটার দু-তিন দিন পরেই হয়তো একটি গাছের ডাল বেড়ে উঠেছে। যদিও লাইন স্পর্শ করেনি গাছটি। কিন্তু হাইভোল্টেজ লাইনের ২ মিটারের মধ্যে গাছের ডাল এলে ‘ফ্লাশ ওভার’ হয়ে শর্টসার্কিট হতে পারে। এই লাইনে এমনটি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে একটি সার্কিট বন্ধ হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে পাশের সার্কিটে সব লোড পড়ায় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই লাইনের অধীনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়। তবে এ কারণেই বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পাওয়ার গ্রিড।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি ও তদারকির বিষয়ে জানতে ফোন করলে মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এমরান আলী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাধারণত দুটি সার্কিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনে দুটি সার্কিটের ২০০ মেগাওয়াট করে ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা আছে। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আগে দুটি লাইনে ১৫০ মেগাওয়াট করে সরবরাহ হচ্ছিল। একটি বন্ধের পর অন্যটিতে ৩০০ মেগাওয়াট লোড চলে যায়। সক্ষমতার বাড়তি এ চাপ নিতে না পারায় ওই লাইনও বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হতে থাকে। লাইন খুব দ্রুত সচল করা হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরু করে সরবরাহ করতে সময় লেগে যায়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিডের তথ্য বলছে, গতকাল দুপুর ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। পৌনে একটার দিকে গ্রিড বিপর্যয় হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেমে যায় ১০ হাজার মেগাওয়াটে। এর ফলে ঢাকার পূর্বাঞ্চল (ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন, মতিঝিল, মগবাজার, বনশ্রী, খিলগাঁও, বাংলামোটর ইত্যাদি) এবং চট্টগ্রামের একাংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। পৌনে দুই ঘণ্টা পর জাতীয় গ্রিড আবার পুরোপুরি চালু হয়। তবে সব গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। রাত ২টার সময়ও ২ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে।

.

তদন্ত কমিটি ও পাওয়ার গ্রিডের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো সব তথ্য পাওয়া যায়নি। সঞ্চালন লাইনের বিভিন্ন জায়গায় ডেটা রেকর্ডার আছে। এগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। তবে গ্রিড বিপর্যয়ের পর সুরক্ষা সিস্টেম কাজ করেছে, তাই বিপর্যয় বড় হয়নি। তবে একসঙ্গে একাধিক ঘটনা ঘটায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ধরে রাখা যায়নি। এ ছাড়া গতকাল গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও একটু বেশি ছিল।

বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনসহ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় সম্পর্কে মতামত ও সুপারিশমালা দিতে গত মঙ্গলবার রাতে প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে হবে।

তদন্ত কমিটির প্রধান সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলী প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তকাজ শুরু করেছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

এদিকে আজ বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক আদেশে বলা হয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণ উদ্‌ঘাটন ও সুপারিশ দিতে অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজাকে প্রধান করে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।

.

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জমা করে রাখার সুযোগ নেই। এটি সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ করতে হয়। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তা সঞ্চালন করা হয় জাতীয় গ্রিডে। সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে এ গ্রিড বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত। দেশের জাতীয় গ্রিড দুটি ভাগে বিভক্ত। যমুনা নদীর এপারে ঢাকাসহ সব জেলায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয় পূর্বাঞ্চল গ্রিডের মাধ্যমে। আর যমুনা নদীর ওপারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয় পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের মাধ্যমে। পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের চেয়ে তিন গুণ বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পূর্বাঞ্চল গ্রিড।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় দেশে সব বিদ্যুৎ উৎপাদন করত শুধু পিডিবি। এখন বেসরকারি খাতে নানা ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও বিদ্যুৎ এসে যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। এতে যথাযথ সমন্বয় না হলে ফ্রিকোয়েন্সির হেরফের হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার কোনো কোনো বৃহৎ শিল্পকারখানা সরাসরি গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছে। তারা হঠাৎ উৎপাদন বন্ধ করলে বা বেশি হারে বিদ্যুৎ নিলে এনএলডিসির চাহিদা নির্ধারণে ভুল করার সুযোগ থাকে। গ্রিড ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।

.

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক সহ–উপাচার্য আবদুল হাসিব চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, নানা কারণে লাইন ট্রিপ করতে পারে (বিদ্যুৎ–সংযোগ বন্ধ হওয়া)। সঞ্চালন লাইনের একটি যদি বন্ধ হয়ে যায়, আরেকটির পুরো লোড নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হয়। কিন্তু তার জন্য বিনিয়োগের ঘাটতি আছে। পাওয়ার সিস্টেম সিকিউরিটি মূল্যায়ন করা জরুরি। না হলে বারবার বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাওয়ার সিস্টেম সিকিউরিটি হলো এমন এক ব্যবস্থা, যাতে কোনো ত্রুটি বা দুর্ঘটনা ঘটলেও যেন পুরো বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা নিরাপদ ও স্থিতিশীল থাকে, সেই সক্ষমতা।

দেশে এর আগেও জাতীয় গ্রিডে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর বেলা ২টা ৫ মিনিটে পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিডে বিপর্যয় শুরু হয়। এতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বড় অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। ২০১৭ সালের ৩ মে উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের ৩২টি জেলা কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালে। এতে গোটা দেশ প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে। প্রতিবারই বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!