
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার অপ্রত্যাশিত জয়ের পর দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দর এক দিনে ৮ শতাংশ কমেছে। গতকাল সোমবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের এই দরপতন ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ।
এদিকে দেশটির শেয়ারবাজারেও বড় ধস নেমেছে। পাশাপাশি সরকারি ঋণ আর ব্যয় নিয়েও বেশ উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত রোববার দ্বিতীয় দফার ভোটে কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুলা। পরদিন সোমবার দেশটির মুদ্রাবাজার অস্থিরতা দেখা দেয়। প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রাজিলীয় রিয়ালের বিনিময় হার কমে ৫ দশমিক ৪১-এ নেমে যায়।
দেশটির সাও পাওলো স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক বোভেসপা কমেছে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। একপর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে লেনদেন সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়। কিছু বন্ডের সুদহার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে ২০২০ সালে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর এটাই হলো বোভেসপার সবচেয়ে খারাপ দিন।
.
বার্তা সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে বিরোধী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোর ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রচলনের প্রতিশ্রুতিতে ব্রাজিলের বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপক দরপতনে তার অনেকটাই মুছে গেছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন, ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে বড় বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেবেন। বিনিয়োগকারীদের আশা ছিল, ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে সুদের হার কমবে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান আরবিসি ব্লুবের সিনিয়র সভরেন স্ট্র্যাটেজিস্ট গ্রাহাম স্টক বলেন, স্থানীয় বাজারে ব্যাপক দরপতন ঘটেছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, সরকারি অর্থব্যবস্থায় সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারের বিষয়।
নির্বাচনে লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। ফ্লাভিও কারাবন্দী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে।
নির্বাচনী প্রচারে লুলা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিনা মূল্যে গণপরিবহন, ব্যক্তিগত ঋণ মওকুফ ও সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেন। সমালোচকদের মতে, ভোটারদের সমর্থন পেতে তিনি এসব ব্যয়বহুল কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।
.
সরকারি ঋণ ও ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে কর আদায় ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির নীতি অনুসরণ করেছেন লুলা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ব্রাজিলের রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশে উঠতে পারে। এরই মধ্যে দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৮৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে অনেকটাই বেশি।
এ পরিস্থিতিতে ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে রেখেছে। বর্তমানে নীতি সুদহার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই এত বেশি সুদের কারণে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। ঋণের বোঝা বেড়েছে পরিবারগুলোর।
ডয়চে ব্যাংকের গ্লোবাল ম্যাক্রো বিভাগের প্রধান জিম রিড বলেন, বিনিয়োগকারীরা একপ্রকার ধরে নিয়েছিলেন, ফ্লাভিও বলসোনারো জিতবেন। তাঁরা সেভাবেই বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছেন। বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরবে।
.
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ফেডারেটেড হার্মিসের শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আলদো রুইজ বলেন, লুলা রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নিলে সুদের হার বেশি থাকতে পারে। এতে রিয়ালের দর আরও কমতে পারে। পরিণামে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, রক্ষণশীলদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে লুলাকে। এতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখন নতুন অর্থমন্ত্রী নিয়োগের দিকে তাকিয়ে আছেন বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, নতুন অর্থমন্ত্রী নিয়োগের মধ্য দিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হবে।
.
ব্যাংকের শেয়ারে বড় পতন
গতকাল সোমবার ব্রাজিলের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে আর্থিক খাত। এ খাতের শেয়ারের সূচক সার্বিকভাবে এক দিনেই ২২ শতাংশ কমেছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর আরও বেশি কমেছে। যেমন বিনিয়োগ ব্যাংক বিটিজি প্যাকচুয়ালের শেয়ারের দাম কমেছে ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যাংকো দো ব্রাজিলের ২৯ শতাংশ কমেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্রাজিলের ডিজিটাল ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এক্সপির শেয়ারের দাম কমেছে ৪৮ শতাংশ। এ ছাড়া আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নুব্যাঙ্কের শেয়ারের দর ১৭ শতাংশ কমেছে।
.
নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে চলতি বছর মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রাজিলের মুদ্রা রিয়ালের দর বেড়েছে ১০ শতাংশ। একই সময়ে ডলারের হিসাবে দেশটির শেয়ারবাজারের সূচক বেড়েছিল ৩৮ শতাংশ। ফলে বিশ্বের ভালো শেয়ারবাজারগুলোর কাতারে উঠে এসেছিল ব্রাজিলের বাজার। যদিও এখন পতনের ধারা দেখা যাচ্ছে।
ব্রাজিলের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। আগামী ২০৩৬ সালে মেয়াদ পূর্ণ হবে, ডলারে ইস্যু করা ব্রাজিলের এমন বন্ডের সুদ ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়েছে।
স্পেনের ব্যাংক সান্তান্দারের বড় ব্যবসা রয়েছে ব্রাজিলে। সোমবার ব্যাংকটির শেয়ারের দাম কমেছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ।