• বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪০ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

কংগ্রেস হাতছাড়া, বড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

Reporter Name / ১০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিভিন্ন জরিপ যে আভাস দিয়েছিল, ভোটের ফলাফলে সেটাই নিশ্চিত হলো। মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ হাতছাড়া হলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিদ্বেষ ছড়ানো, বিভেদ সৃষ্টিসহ নানা অপকৌশলের পরও ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে রায় দিয়েছেন মার্কিন জনগণ। ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হলো, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর সহজ হবে না ট্রাম্পের জন্য।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে বলা হয় প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কাজ নিয়ে জনগণের মূল্যায়ন। ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতি, দুর্নীতির অভিযোগসহ নানা বিষয় ঘিরে জন-অসন্তোষ যে এই মূল্যায়নে বড় প্রভাব ফেলবে, তা বিভিন্ন জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকেরা আগে থেকেই বলে আসছিলেন। বেশির ভাগ জরিপে বলা হচ্ছিল, কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে এই পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে গেছে নির্বাচনের ফল।

.

প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫ আসনে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছিল ২১৮ আসন। ডেমোক্র্যাটদের ছিল ২১৪টি। এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে গতকাল বুধবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা) প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২২৫ আসন। রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৮ আসন। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১৮টি আসন প্রয়োজন। ৭৩ আসনের ফলাফল ঘোষণা বাকি থাকতেই এই ‘ম্যাজিক ফিগার’ পেরিয়ে গেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি।

প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে ভোট হলেও সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫ আসনে ভোট হয়েছে। এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য অন্তত ৫১টি আসন পেতে হয়। গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের দখলে ছিল ৫৪টি আসন। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির দখলে ছিল ৪৪টি। নির্বাচনের আগে সিনেটের চিত্র ছিল রিপাবলিকান পার্টি ৫৩ আসন, ডেমোক্রেটিক পার্টি ৪৫ আসন। এর বাইরে স্বতন্ত্র দুই সিনেটর সমর্থন দেন ডেমোক্র্যাটদের।

.

দুই কক্ষেই পরাজয় ট্রাম্পের জন্য বড় একটি ধাক্কা। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আগামী জানুয়ারিতে শপথ নেবেন। এরপর প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা চাইলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। তদন্তের আওতায় পড়তে পারে ট্রাম্পের পরিবার ও মিত্ররাও। আর আইন প্রণয়নে বাধা তো আছেই। অন্যদিকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে ট্রাম্পের বিভিন্ন নিয়োগে বাধা দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। মোটকথা, আইন পাস কিংবা কংগ্রেসের অনুমোদনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মার্কিন জনগণ পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক লরেল র‍্যাপ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, আগামী দুই বছর ট্রাম্পকে নীতি নির্ধারণে বেশ কিছু বাধার মুখে পড়তে হবে। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত, মার্কিন সেনা মোতায়েন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর হাতে এখনো বড় ক্ষমতা রয়েছে।

.

ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় বসেন ২০১৭ সালে। সেই মেয়াদ শেষে নির্বাচনে হেরে যান তিনি। তবে এর পরের নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০২৫ সালে। এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একটি জরিপ প্রকাশ করেছিল রয়টার্স/ইপসস। তাতে দেখা যায়, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সবচেয়ে কম, ৩১ শতাংশে নেমেছিল।

জনপ্রিয়তায় এই ধসের পেছনের কারণগুলোই মূলত নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে। প্রথমেই আসে ইরান যুদ্ধের কথা। ট্রাম্পের কথামতো এই যুদ্ধ দ্রুত তো শেষই হয়নি, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক চাপিয়ে ট্রাম্প যে ফায়দা লোটার কথা বলেছিলেন, তা-ও বাস্তবে হয়নি। সঙ্গে আছে ট্রাম্প পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগ। ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী প্রচারে এগুলো ভালোমতোই কাজে লাগিয়েছেন।

নির্বাচন ঘিরে ট্রাম্পের নিজের সিদ্ধান্তেও কিছু গলদ আছে। নির্বাচনের আগে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় বেশ কিছু জায়গায় হস্তক্ষেপ করেছেন তিনি। তাঁদের অনেককে নিয়েই রিপাবলিকান শিবিরে ব্যাপক অসন্তোষ ছিল। যেমন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি টেক্সাসের সিনেটর প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর প্রার্থী ডারলিন গ্রাহাম। দুজনই হেরেছেন।

নির্বাচনে সরাসরি ভোট গ্রহণ হয় গত মঙ্গলবার। ভোট গ্রহণ শেষ হলে বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করে জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এসএসআরএস। জরিপে অংশ নেওয়া তিন-চতুর্থাংশ ভোটার জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তাঁরা মোটেও ‘সন্তুষ্ট নন’। এ ছাড়া ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় কংগ্রেসের আরও সক্রিয় ভূমিকা চান তাঁরা।

.

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯০ সালে পরিষদে ২৬৭ আসন পেয়েছিলেন তাঁরা। এবারের নির্বাচনে ধনী বা দরিদ্র, শিক্ষার হার বেশি বা কম-নির্বিশেষে অনেক এলাকাতেই সমর্থন হারিয়েছেন রিপাবলিকানরা। অপর দিকে লাতিন-অধ্যুষিত, সীমান্তবর্তী ও কৃষি-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেশি ভালো করেছেন ডেমোক্র্যাটরা।

এবারের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের পাশাপাশি ৫০ অঙ্গরাজ্যের ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচন হয়েছে। সেখানেও ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৫০ অঙ্গরাজ্যের ২৮টি এখন ডেমোক্র্যাটদের দখলে। রিপাবলিকানদের দখলে ২০টি। পাঁচ অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদ হারিয়েছেন তাঁরা। প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে এবার কিছু ইতিহাসও সৃষ্টি করেছেন ডেমোক্র্যাটরা।

ইতিহাস সৃষ্টির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত আবদুল আল-সাইদের কথা। মিশিগানের এই প্রার্থীকে পরাজিত করতে কম চেষ্টা হয়নি। মিসরীয় বংশোদ্ভূত আল-সাইদকে নিয়ে ট্রাম্প মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করতে ছাড়েননি। এমনকি নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর ওপর থেকে সমর্থন সরিয়ে নেন স্থানীয় ডেমোক্র্যাট নেতা হেইলি স্টিভেনস।

.

অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ডেব হালান্ড। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর হিসেবে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। মিনেসোটা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী সিনেটর হয়েছেন পেগি ফ্ল্যানাগান। জর্জিয়ায় নির্বাচিত কেইশা ল্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন। আর প্রথম লাতিন গভর্নর হচ্ছেন টেক্সাস থেকে নির্বাচিত জিনা হিনোজোসা।

বিজয়ের পর ডেমোক্র্যাট শিবিরে এখন উৎসবের আমেজ। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, মার্কিন নাগরিকেরা ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছেন, তাঁরা কট্টরপন্থা ও দুর্নীতি আর সহ্য করবেন না। সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি কংগ্রেসের স্পিকার হতে যাচ্ছেন। আর সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, পরিবর্তনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের জামার হাতা গুটিয়ে কাজে নামতে হবে।

.

এবারের নির্বাচনের আগে কম বাগাড়ম্বর করেননি ট্রাম্প। একের পর এক অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে গেছেন। ডেমোক্র্যাটদের ‘সমাজতন্ত্রী, সন্ত্রাসী, বিপজ্জনক’—নানা তকমা দিয়েছেন। জনমত জরিপে কান না দিতে সমর্থকদের অনুরোধও করেছেন। সম্ভাব্য পরাজয় আঁচ করতে পেরে বলেছিলেন, যদি নির্বাচনে তাঁর দল হেরে যায়, তাহলে একের পর এক ভেটো দেবেন তিনি, থামবেন না।

তবে গতকাল নির্বাচনের ফল যতই রিপাবলিকান পার্টির প্রতিকূলে যেতে থাকে, ততই সুর নরম করেন ট্রাম্প। দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয়ও মেনে নেন তিনি। পরে সিবিএস নিউজকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার বার্তা হলো, ডেমোক্র্যাটদের প্রতি অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমাদের দেশের কল্যাণে আপনাদের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকেও ডেমোক্র্যাটদের স্বাগত জানানো হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এমন সব সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, যেগুলো মানুষকে আরও দরিদ্র করে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এই জয়কে ‘নতুন যুগের সূচনা’ বলেছেন। নির্বাচনে লাতিন প্রার্থীর জয়কে স্বাগত জানিয়েছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি অবশ্য বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফল ওয়াশিংটন-তেহরান শত্রুতায় পরিবর্তন আনবে না।

.

আগেই বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডিন বেকার আল-জাজিরাকে বলেন, মানুষের এই উদ্বেগ কমাতে ডেমোক্র্যাটরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপ নিতে পারেন, তার একটি হলো ইরান যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় যে বাড়তি ভর্তুকি দেওয়া হতো, ২০২৫ সালে তার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এতে অনেক মার্কিন নাগরিককে এখন স্বাস্থ্যবিমার বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব ভর্তুকি ফেরানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে বরাদ্দ কমানোর যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছেন, তা-ও বাতিল করতে পারেন তাঁরা।

এ ছাড়া ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহারের চেষ্টা করতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পেলে নিত্যপণ্যের দাম, বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি—এসব বিষয়ে তদন্ত করতে পারবেন। তবে এসব উদ্যোগে রাতারাতি পণ্যের দাম না-ও কমতে পারে বলে মনে করেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের গবেষক অ্যালেক্স জ্যাকুয়েজ। তিনি বলেন, ‘দাম অনেকটা রকেট ও পালকের মতো। দাম রকেটের গতিতে বাড়ে, কিন্তু নিচে নামে পালকের মতো ধীরে ধীরে।’

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!