• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

ব্রাজিলের ফুটবলাররা কেন ব্যালন ডি’অর জিততে পারছেন না

Reporter Name / ২৮ Time View
Update : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

একসময় ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ানদের ছিল রাজকীয় উপস্থিতি। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও, কাকা। একের পর এক নাম। একেকজন ফুটবলের জাদুকর। তাঁদের পায়ের শিল্পে মুগ্ধ হয়েছে পৃথিবী। বিশ্বসেরার সোনালি বলটাও উঠেছে তাঁদের হাতে। সেই দিন কোথায় হারিয়ে গেল!

লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে পরশু রাতের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান যেন সেই হারানো দিনের কথাই মনে করিয়ে দিল। মঞ্চে উঠলেন রোনালদো নাজারিও। ছেলেদের ব্যালন ডি’অর ট্রফি তুলে দিতে। সঞ্চালক ও ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির সে কী উচ্ছ্বাস! বড় পর্দায় দেখানো হলো রোনালদোর বর্ণাঢ্য অতীত। দৃশ্যটা প্রতীকীও বটে। ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিল এখন বেঁচে আছে অতীতের আলোয়। বর্তমানটা বড় বিবর্ণ।

.

গত এপ্রিলে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোমারিও বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর জিততে পারবে না।’

কথাটা তখন অনেকের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। বিশেষ করে গত মাসে ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় যখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মার্কিনিওসের নাম দেখা গেল। ভিনিসিয়ুস তো কিছুদিন আগেও অনেকের চোখে পুরস্কার জয়ের ফেবারিট ছিলেন। অথচ লন্ডনের অনুষ্ঠানে ভিনিসিয়ুসই নেই! হয়তো আগেই বুঝেছিলেন, এবার তাঁর হাতে সোনালি বল উঠছে না।

.

সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না। ভোটে শীর্ষ দশেও জায়গা হয়নি রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডের। হয়েছেন ১৭তম। মেয়েদের ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ দশেও নেই কোনো ব্রাজিলিয়ান। ছেলে ও মেয়েদের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের পুরস্কারে শীর্ষ পাঁচেও কেউ নেই। গোলকিপারদের পুরস্কারেও একই দশা হতো, রক্ষা করেছেন ব্রাজিল নারী দলের গোলকিপার লোরেনা। মেয়েদের বর্ষসেরা গোলকিপারের তালিকায় পঞ্চম হয়েছেন তিনি। অথচ একসময় এই পুরস্কার ছিল ব্রাজিলিয়ানদের প্রায় নিজস্ব সম্পত্তি!

একটা প্রশ্ন করা যাক। ছেলেদের ব্যালন ডি’অরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে সর্বশেষ কবে পুরস্কার জিতেছেন ব্রাজিলের কেউ? স্মৃতির পাতা অনেকটা উল্টাতে হবে। সাত বছর আগে, ২০১৯ সালে। সেবার সেরা গোলকিপার হয়েছিলেন আলিসন বেকার। কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবলপ্রেমীদের মন কি গোলকিপারের পুরস্কারে ভরে? যে দেশের ফুটবল মানেই আক্রমণের ফুলঝুরি, ড্রিবলিংয়ের জাদু, সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার আর দুরন্ত ফুলব্যাক, সেই দেশের সমর্থকদের কাছে গোলকিপারের পুরস্কার তো সান্ত্বনা মাত্র।

.

মূল ব্যালন ডি’অর? শেষবার কোনো ব্রাজিলিয়ানের হাতে উঠেছিল ২০০৭ সালে। জিতেছিলেন কাকা। তারপর কেটে গেছে ১৯ বছর। ব্রাজিলের ফুটবলে কত জল গড়িয়েছে, কত প্রতিভা এসেছে, হারিয়েও গেছে। কিন্তু বিশ্বসেরার সেই সোনালি বল আর ফেরেনি।

১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর ছিল শুধু ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য। ইউরোপের ক্লাবে খেললেও অন্য মহাদেশের কেউ বিবেচিত হতেন না। ১৯৯৫ সালে নিয়ম বদলায়। ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলারের জন্য খুলে যায় পুরস্কারের দরজা। তারপর?

.

১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মাত্র চারবার ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তিনে কোনো ব্রাজিলিয়ান ছিলেন না। বছরগুলো ২০০০, ২০০১, ২০০৩ ও ২০০৬। এই সময়ে ব্রাজিলিয়ানরা পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। বিজয়ীদের নাম রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকা। ব্রাজিল তখন বিশ্ব ফুটবলের প্রতিভা তৈরির কারখানা। এক জাদুকর বিদায় নিলে হাজির আরেকজন। তারপর যেন কারখানাটার উৎপাদনই কমে গেল।

দোষটা চাইলে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে দিতে পারেন! বিশ্ব ফুটবলে তাঁদের এমন রাজত্ব শুরু হলো যে অন্যদের জন্য ব্যালন ডি’অর জেতাই কঠিন হয়ে পড়ল। ১১ বছর পর ২০১৮ সালে সেই আধিপত্যে প্রথম বড় ধাক্কা দিলেন লুকা মদরিচ।

.

এই সময়ে ব্রাজিলের হয়ে লড়াই করেছেন নেইমার। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে ব্যালন ডি’অরে তৃতীয় হয়েছেন। অথচ প্রতিভার বিচারে নেইমারকে মেসি কিংবা রোনালদোর চেয়ে পিছিয়ে রাখেননি অনেকেই। কিন্তু প্রতিভা আর তাঁর পূর্ণ বিকাশ তো এক জিনিস নয়। মাঠের পারফরম্যান্সে দুই মহাতারকার পেছনেই থেকে গেছেন নেইমার।

কাকার পর নেইমার ছাড়া আর মাত্র একজন ব্রাজিলিয়ান ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তিনে উঠেছেন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ ২০০৭ সালের পর ১৯ বছরে মাত্র তিনবার শীর্ষ তিনে দেখা গেছে ব্রাজিলের কাউকে। দুবার নেইমার, একবার ভিনিসিয়ুস। রাফিনিয়া, এস্তেভাওরা উঠে আসছেন। কিন্তু তাঁদের নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার সময় এখনো আসেনি। এই সময়ে ভিনিসিয়ুসই শুধু একবার ব্রাজিলকে বিশ্বসেরার আসনে বসিয়েছেন। সেটাও ব্যালন ডি’অর নয়, ২০২৪ সালের ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কারে।

.

কিন্তু কেন এমন হলো? যে ব্রাজিল একসময় ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই দেশ এখন বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরিতে পিছিয়ে পড়ছে কেন? ক্রীড়া বিপণন, যোগাযোগ ও খেলাধুলায় উদ্ভাবনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ব্রাজিলে ফ্ল্যাশস্কোরের আঞ্চলিক পরিচালক আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোস সমস্যাটা দেখছেন একেবারে গোড়ায়। তাঁর বিশ্লেষণ, ‘বিশ্বসেরা পর্যায়ে ব্রাজিলের সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার, ফুলব্যাক ও সেন্টার ফরোয়ার্ডের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত ফুটবলার তৈরির কাঠামোগত গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। ফুটবলার গড়ার মূল ভিত্তি অর্থাৎ বয়সভিত্তিক পর্যায় ঢেলে সাজানো ছাড়া গতি নেই। বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় এর ইতিবাচক প্রভাব দেখতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’

.হাতে ব্যালন ডি’অর, মাথায় ব্যবসার বুদ্ধি—যেভাবে দুই ভুবনের ‘রাজা’ কেইন.

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) একাডেমির অধ্যাপক ও কোচ রজার মাচাদোর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কথা। তাঁর ভাষায়, ‘বিশ্বের সেরা ১০ খেলোয়াড়ের তালিকায় কোনো ব্রাজিলিয়ানের না থাকাটাই প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক ফুটবল কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন, জার্মানি ও পর্তুগাল কুশলী ফুটবলার তৈরিতে অনেক এগিয়ে গেছে। ক্রোয়েশিয়া ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতেও একটি যুগে ব্রাজিলের চেয়ে বেশি বিশ্বমানের ফুটবলার উঠে আসতে দেখা গেছে।’

.

রোমারিও অবশ্য সমস্যাটা দেখছেন একটু অন্যভাবে। ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার। অথচ তখনকার নিয়মের কারণে ব্যালন ডি’অর জেতার সুযোগই পাননি। সেই রোমারিও মনে করেন, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের কাঠামো এতটাই বদলে গেছে যে আপাতত দেশটির কোনো ফুটবলারের ব্যালন ডি’অর জেতার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই। তাঁর কথা, ‘ব্রাজিলিয়ান ফুটবল আর আগের জায়গায় নেই। ১৫ বা ২০ বছর আগে যেভাবে ফুটবলারদের ব্যালন ডি’অরের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হতো, এখন আর সেই পরিবেশ নেই।’

কোন পরিবেশের কথা বলছেন রোমারিও? ব্রাজিলের সেই রাস্তার ফুটবল। গলিতে, সমুদ্রসৈকতে, খোলা মাঠে বল নিয়ে ছেলেদের ছুটে বেড়ানো। যেখানে কোচের বাঁধাধরা নির্দেশনা ছিল না। ছিল না কৌশলের জটিল হিসাব। ছিল শুধু বল, পা আর কল্পনা। সেই স্ট্রিট ফুটবল থেকেই উঠে এসেছেন কত জাদুকর! রোমারিওর মতে, কম বয়সীদের সৃষ্টিশীলতা বিকাশে রাস্তার ফুটবলের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। কিন্তু অতিরিক্ত নিয়মতান্ত্রিকতা ও কৃত্রিম পরিবেশ তরুণদের সহজাত প্রতিভা নষ্ট করে দিয়েছে।

.কেইন কীভাবে ব্যালন ডি’অর জিতলেন, ইয়ামাল-এমবাপ্পে কেন পারলেন না.

যোগ হয়েছে আধুনিক ফুটবলে শারীরিক সামর্থ্যের বাড়তি চাহিদা। শিল্পের চেয়ে এখন গতি ও শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। রোমারিও মনে করেন, এতে সহজাত প্রতিভাবান ফুটবলারদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আরও একটি সমস্যার কথা বলেছেন তিনি, ‘শুধু একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করা যায় না। সেটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’
কথাটা শুনলে কাকার পরের ব্রাজিলের কথাই মনে পড়ে। প্রথমে নেইমার, তারপর ভিনিসিয়ুস। যেন একজনের কাঁধেই পুরো দেশের ফুটবলের স্বপ্ন।

.

অথচ পৃথিবীর অন্য দেশগুলো থেমে নেই। প্রতি বছর কেউ না কেউ ব্যালন ডি’অর জিতছেন। নতুন নতুন প্রতিভা উঠে আসছে। শুধু সৃষ্টিশীলতার ঘাটতি নয়, প্রশ্নটা আরও বড়। বিশ্বসেরাদের সমমানের ফুটবলারও কি যথেষ্ট তৈরি করতে পারছে ব্রাজিল? ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স জিতেছে আটবার করে। পর্তুগাল, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস সাতবার করে। ব্রাজিল, ইতালি ও ইংল্যান্ড পাঁচবার করে।

অথচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দেশ ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ইউরোপের ক্লাবগুলোতে প্রতিবছর অসংখ্য ফুটবলার রপ্তানি করে তারা। কিন্তু সেই বিপুল প্রতিভার ভিড় থেকে বিশ্বসেরা উঠে আসছেন কজন?

একসময় ব্রাজিলিয়ানদের পায়ের জাদু দেখতে অপেক্ষা করত ফুটবল–বিশ্ব। এখন ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে রোনালদোর অতীত দেখতে হয়।

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!