• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৬ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবে? সুন্দরবনের সুরক্ষা ও পানির সংকট নিরসনে বরাদ্দের দাবি তিন মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৪২ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশের আকাশে এক টুকরা কাঞ্চনজঙ্ঘা স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং, এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড় ইরান কি বিদেশে মার্কিনদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, হাতে কী কী ভয়ংকর অস্ত্র টুথপেস্ট আবিষ্কারের আগে মানুষ যেসব বিচিত্র জিনিস দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করত ক্ষমতা হারানোর ভয়েই কি আরব দলগুলোর ওপর আক্রমণ বাড়িয়েছেন নেতানিয়াহু কর্মকর্তাদের গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ কমাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি এসআরবির অভিযানের সময় তরুণের মৃত্যু, গুলি করেছে কে

ইরান কি বিদেশে মার্কিনদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, হাতে কী কী ভয়ংকর অস্ত্র

Reporter Name / ৬ Time View
Update : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের অনেকে সপরিবার তড়িঘড়ি অন্যত্র চলে যান, সন্তানদের জন্য নতুন স্কুলের ব্যবস্থা করেন। ঝক্কি কাটিয়ে তাঁদের অনেকে আবার পরে কর্মস্থলে ফেরেন। এখন আবার তাঁদের চলে যেতে বলা হচ্ছে। কী এমন হলো যে যুক্তরাষ্ট্র এতটা সতর্ক অবস্থায় চলে গেল?

মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের নিশানা করার তৎপরতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে’ ইরান। ইরান যদি এমন হামলা চালায় তাহলে কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে তা নিয়ে এই প্রতিবেদন।

.

বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মার্কিন দূতাবাস ও মিশন থেকে নিজেদের কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি তাঁরা নিজেদের দপ্তরে ফিরে কাজ খানিকটা গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তাঁদের আবার সরে যেতে বলা হয়েছে।

একজন মার্কিন কূটনীতিক সিএনএনকে বলেছেন, ‘পরিস্থিতিকে (ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যক্রম) বিশৃঙ্খল বললেও সেটা কম বলা হবে।’

এ নিয়ে আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএসএ) মুখপাত্র নিকি গেমার বলেছেন, ‘এ বছরের শুরুর দিকে পরিবারগুলো যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, এবারও তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কেউ কেউ ফিরে এসে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার পরপরই আবার চলে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন। তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই হতাশ, বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ।’

.

২১ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটি নির্দেশ জারি করে সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাস থেকে জরুরি নয়—এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে সৌদি আরবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলা বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়।

.

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের শুরুর কয়েক সপ্তাহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, সে সময় আগ্রাসনের জবাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোয় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।

.

বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলা হলেও ওই সময়ের মতো তীব্র হচ্ছে না। তারপরও কেন ওয়াশিংটন হুড়োহুড়ি করে দূতাবাস ও মিশনগুলো থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে, উঠেছে সেই প্রশ্ন।

২১ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটি নির্দেশ জারি করে সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাস থেকে জরুরি নয়—এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে দেশটিতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলা বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বারবার সতর্ক করে বলা হয়, ‘এসব সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তবে শুধু সৌদি আরব নয়; বরং জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননে অবস্থিত দূতাবাস ও মিশন থেকেও নীরবে কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এএফপি, সিএনএনসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিভিন্ন সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে।

.

পরিস্থিতিকে (ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যক্রম) বিশৃঙ্খল বললেও সেটা কম বলা হবে।

.

কী কারণে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দুদিন পর এর উত্তর পাওয়া যায়।

২৩ অক্টোবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্র দপ্তরে একটি মেমো (নথি/স্মারক) পাঠিয়েছেন। মেমোতে তিনি একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন, যা নিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের ভেতর একধরনের চাপা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জে ক্লেটনের পাঠানো ‘অগোপনীয়’ মেমোর অনুলিপি অ্যাক্সিওসসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের হাতে আছে।

মেমোতে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের নিশানা করার তৎপরতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে’ ইরান। এমনকি প্রাণঘাতী হামলার কিছু পরিকল্পনা ‘প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে।

জে ক্লেটন ২৩ অক্টোবর মেমোটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠান বলে জানায় অ্যাক্সিওস।

.

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি ইরানের হুমকি এখন ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এমন উচ্চমাত্রার হুমকি আর দেখা যায়নি।

.

কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলছেন, এ গোয়েন্দা তথ্যের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে সেখানকার বেশ কয়েকটি মার্কিন দূতাবাস ও মিশনের কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে।

ক্লেটনের এ সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। জবাবে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, নতুন করে হামলা হলে এবার তাদের পাল্টা জবাব আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হবে।

.

ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ২১ মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। এ ছাড়া ৭৫০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন।

ইরানের যে পরিকল্পনা কথা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক বলছেন, যদি তেহরান সত্যিই সে পথে হাঁটে তবে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়; বরং অন্যান্য দেশেও মার্কিনরা হামলার নিশানা হতে পারেন।

.

মেমোতে বিদেশের মাটিতে মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলা পরিকল্পনা নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস ওই মেমো নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে নাম প্রকাশ না করা মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ অন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হামলার হুমকির বিষয়টি মূল্যায়ন করে দেখা গেছে, ইরান ইউরোপেও সম্ভাব্য কিছু লক্ষ্যবস্তু ঠিক করেছে।

.

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস আরও বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি ইরানের হুমকি এখন ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এমন উচ্চমাত্রার হুমকি আর দেখা যায়নি।

এমনকি, কিছু গোয়েন্দা তথ্যে এ ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে যে ইরানি এজেন্টরা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

মেমোটি নিয়ে ওয়াশিংটন এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।

নিউইয়র্ক টাইমসকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, হুতিদের হামলার হুমকি এবং ‘মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা’—দুই কারণেই বিভিন্ন দেশে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে কর্মীর সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যদিও আরেক মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর ও অন্যান্য দেশে হামলার এ পরিকল্পনা কার্যকরের সক্ষমতা ইরানের সীমিত। তাঁর ভাষ্য, ইরানের যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, তার সব কার্যকর করার সক্ষমতা দেশটির নেই।

আসলেই কি ইরানের সেই সক্ষমতা নেই। যদি না থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কেন কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে? ইরানের হাতে যেসব অস্ত্র রয়েছে, সেগুলোর সক্ষমতা দেখে নেওয়া যাক:

.

ইরান আবার আক্রান্ত হলে পাল্টা হামলার ‘কোনো সীমারেখা থাকবে না’। যোগাযোগের ভূগর্ভস্থ তার থেকে শুরু করে সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত, সবকিছুই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

.

ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারই সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময়। ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ—দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে দেশটির হাতে।

ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। অর্থাৎ এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় আঘাত হানতে সক্ষম। তবে এগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারা নিয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

.

ইরানের স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ফাতেহ, জলফাগর, কিয়াম-১ এবং শাহাব-১ ও শাহাব-২। এগুলোর পাল্লা প্রায় ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার। কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত হামলার জন্য এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।

ইরানের মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, এমাদ, গাদর-১, খোররামশাহ ও সেজিল। নতুন নকশার খাইবার শেকান ও হজ কাসেমও রয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ কিলোমিটার।

সেজিলের বিশেষত্ব, এটি কঠিন জ্বালানি (সলিড ফুয়েল) ব্যবহার করে। ফলে তরল জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা যায়।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেজিলের পাল্লা প্রায় ২০০০ কিলোমিটার, এমাদের ১৭০০, গাদরের ২০০০, শাহাব-৩-এর ১৩০০ এবং খোররামশাহর ২০০০ কিলোমিটার।

ইরান প্রতিনিয়ত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ, গত ২০ মার্চ ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার চেষ্টা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

.

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরান ওই দ্বীপে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। একটি মাঝপথে নিজেই ভেঙে পড়ে। অন্যটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে বলে ধারণা করা হয়। ইরান অবশ্য এ হামলার দায় অস্বীকার করেছে।

দিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। এটি ইরানের ঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লার প্রায় দ্বিগুণ।

.

দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার চেষ্টা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইরান এত দিন বলে এসেছে, তারা নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২০০০ কিলোমিটারে সীমিত রেখেছে। কিন্তু ইসরায়েল বারবারই দাবি করেছে, ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৪০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

.

এমনটি হলে ইউরোপের বড় অংশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় চলে আসতে পারে। অর্থাৎ লন্ডন বা প্যারিসের মতো বড় ও জনবহুল শহরে তারা হামলা চালাতে পারে। যদিও এ নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দিয়েগো গার্সিয়ায় ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের একটি প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পেরেছিল। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইরান তার ঘোষিত সীমার চেয়ে বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কাজ করছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইরানের খোররামশাহ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণ দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। এটির পাল্লা ২০০০ কিলোমিটারের বেশি। তবে হালকা ওয়ারহেড ব্যবহার করলে এর পাল্লা প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব।

.যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে.

ইরানের সামরিক সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ড্রোন। দেশটির ড্রোনভান্ডার বড় ও বৈচিত্র্যময়। একমুখী হামলা, নজরদারি ও বহুমুখী কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের ড্রোন রয়েছে।

ইরানের ড্রোন কর্মসূচির সূচনা হয় ১৯৮০-এর দশকে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। প্রচলিত যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ইরান ড্রোনকে অসম যুদ্ধকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

ইরানের তিনটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বড় সামরিক ড্রোন তৈরি করে। শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করে শাহেদ সিরিজের ড্রোন। ইরান এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ বা হেসা তৈরি করে আবাবিল সিরিজ। আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রতিষ্ঠান কুদস এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ তৈরি করে মোহাজের সিরিজ।

ইরানের অনেক ড্রোন মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীর কাছেও গেছে। শাহেদ-১৩৬ ড্রোন রাশিয়া গেরান-২ নামে ব্যবহার করে। হুতিরাও এটি ওয়াইদ-২ নামে ব্যবহার করে।

.

ইরানের একমুখী হামলার ড্রোনের অনেকগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে ওড়ানো হয়। বিস্ফোরক বহন করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পর এগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।

ধীরগতির হলেও ড্রোনের একটি বড় সুবিধা, এগুলো তুলনামূলক সস্তা এবং অনেক সংখ্যায় একসঙ্গে পাঠানো যায়। ফলে একের পর এক ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলা সম্ভব।

ইরানের ড্রোনভান্ডারে শাহেদ-১০১, শাহেদ-১২৯, শাহেদ-১৪৯, শাহেদ-১৭১, আরাশ-২, আবাবিল ও মোহাজের সিরিজের বিভিন্ন ড্রোন রয়েছে। কিছু ড্রোন নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হয়, কিছু হামলায় এবং কিছু দুই ধরনের কাজেই ব্যবহার করা যায়।

.

ইরানের ড্রোন কর্মসূচির সূচনা হয় ১৯৮০-এর দশকে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। প্রচলিত যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ইরান ড্রোনকে অসম যুদ্ধকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। দেশটির তিনটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বড় সামরিক ড্রোন তৈরি করে।

.

যুদ্ধের সময় শুধু কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তা-ই নয়; কত দিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান কয়েক বছর ধরে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কিছু অংশ ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, গোপন ঘাঁটি ও সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্রে রেখেছে। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত পাঁচটি ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ রয়েছে। এর মধ্যে কেরমানশাহ ও সেমনানও আছে।

.

ভূগর্ভস্থ এসব স্থাপনা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র–সক্ষমতা একবারে ধ্বংস করে দেওয়া কঠিন করে তুলেছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির আরেকটি বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন ও সংরক্ষণের অবকাঠামোও ভূগর্ভে গড়ে তোলা। ২০২০ সালে ইরান প্রথমবার ভূগর্ভ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা জানিয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা পরিবর্তন, বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং হালকা উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্লা বাড়ানোর কাজও করেছে ইরান।

ইরান ২০২৩ সালে নিজেদের তৈরি প্রথম ‘হাইপারসনিক’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচনের কথা জানায়। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর ভাষ্য অনুযায়ী, এর গতি শব্দের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ হতে পারে। তবে এসব অস্ত্রের কার্যকর সক্ষমতা নিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।

.মার্কিন দূতাবাসের কিছু কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ.

ইরানের হুমকি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগের তারেও (কেবল) হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছে তেহরান।

দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে উপসাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগের তারগুলো নিশানা করার বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে ইরান।

এ কর্মকর্তাদের একজন বলেন, হামলার পর যাতে দ্রুত তার মেরামত করা না যায়, সে ব্যবস্থাও করার চেষ্টা করা হবে। এতে ইন্টারনেটসহ যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটতে পারে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিভাগের উপপ্রধান ইয়াদউল্লাহ জাভানি বলেছেন, ইরানের অবকাঠামোয় হামলা হলে হরমুজ প্রণালির নিচে থাকা সাতটি বড় ইন্টারনেট কেবল লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ইরান আবার আক্রান্ত হলে পাল্টা হামলার ‘কোনো সীমারেখা থাকবে না’। যোগাযোগের ভূগর্ভস্থ তার থেকে শুরু করে সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত, সবকিছুই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

.সৌদি-ইসরায়েলে হামলা চালাতে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করছে চীন.

ইরানের হাতে সমুদ্রপথে চাপ তৈরিরও নানা উপায় রয়েছে। উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। তাই এখানে সামান্য অস্থিরতাও বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করতে সক্ষম।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে পাল্টা জবাব দিতে তারা নতুন ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশল নেবে।

বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, এবার ইরান শুধু পাল্টা হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মান, পাল্লা ও শক্তি বেড়েছে।

.

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই আশঙ্কার কথা বলেছেন। মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে গত ২৬ অক্টোবর এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাঁর দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরগুলোতেও হামলা চালানো সম্ভব।

আগেই বলা হয়েছে, ইরানের হাতে রয়েছে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নানা ধরনের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি এবং সমুদ্রপথে চাপ তৈরির সক্ষমতাও তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে যোগাযোগ অবকাঠামোয় হামলার পরিকল্পনাও।

হয়তো ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেনি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা, সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক স্থাপনা, কূটনীতিক ও তাদের পরিবার এবং মিত্রদেশগুলোর অবকাঠামো ইরানের অস্ত্রের আওতার মধ্যে রয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ইউরোপে পৌঁছাতে পারার শঙ্কাও বাড়ছে। তাই নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের এ সক্ষমতাই ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

{তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি ও দ্য কনভারসেশন}

.ইরান যুদ্ধের খরচ ও অস্ত্রের মজুত নিয়ে ট্রাম্পের দাবি কি আসলেই সত্যি

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!