• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
লুলার জয়ে ব্রাজিলের মুদ্রার দরপতন, শেয়ারবাজারে ধস ইসরায়েলে ৫০ বছরের মধ্যে রেকর্ড ভোট, বেশি ভোটার উপস্থিতি কার পক্ষে যেতে পারে ‘নন্দিত নরকে’: মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পে মানবজীবনের বেদনা জামায়াতের এমপি মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিল প্রশাসন লুলার জয়ে ব্রাজিলের মুদ্রার দরপতন, শেয়ারবাজারে ধস গ্রামীণ বাণিজ্যের ‘জীবন্ত’ জাদুঘর ইসরায়েলে ৫০ বছরের মধ্যে রেকর্ড ভোট, বেশি ভোটার উপস্থিতি কার পক্ষে যেতে পারে ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘নন্দিত নরকে’: মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পে মানবজীবনের বেদনা সন্ধ্যায় সারা দিনের খবর

একটি আঙুল তুলে মুনতাহা বলল, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে’

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

বাড়ির সামনে উড়ছে দুটি বেলুন। একটি মুরগির আকৃতির, অন্যটি হাঙরের। চার বছরের মুনতাহা জামান প্রান্তি জানাল, মুরগির বেলুনটি তার। অন্যটি ছোট ভাইয়ের। বেলুন দুটি কিনে দিয়েছিলেন বাবা। বাবা কোথায়, জানতে চাইলে আকাশের দিকে তাকাল মুনতাহা। হাতের একটি আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে।’

‘স্কাই’ মানে আকাশ। মুনতাহা আবার বলল, বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। কিন্তু বাবা যে আর কখনো ফিরবেন না, সেটি বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার।

মুনতাহার বাবা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়ায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। শ্বশুরবাড়ির কাছেই গুলিবিদ্ধ হন তিনি। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ওই বাড়িতেই থাকতেন আলিফ।

.

‘স্কাই’ মানে আকাশ। মুনতাহা আবার বলল, বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। কিন্তু বাবা যে আর কখনো ফিরবেন না, সেটি বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার।

.

গত শুক্রবার দুপুরে আলিফের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, টিনের ঘরের সামনের উঠানে খেলছে মুনতাহা। পরনে লাল গেঞ্জি আর নীল রঙের হাফপ্যান্ট। কোঁকড়া চুলের শিশুটির মুখে হাসি। বাড়িতে অপরিচিত মানুষ এসেছেন, তাতে তার কোনো সংকোচ নেই। কখনো খেলছে, কখনো কথা বলছে।

উঠানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা রঙের খেলনা। লাল রঙের একটি দোলনা মোটরসাইকেল। পাশে পুতুল, টেডি বিয়ার, প্লাস্টিকের সিংহ, খেলনা চুলা। রয়েছে খোলা বই-খাতাও। একবার মোটরসাইকেলে চড়ে দুই হাতে হাতল ধরে দোল খাচ্ছে মুনতাহা। একটু পরেই নেমে বসছে খেলনাগুলোর পাশে। কখনো টেডি বিয়ার, কখনো পুতুল হাতে নিয়ে খেলছে। একটি পুতুলের মাথায় পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

উঠানের এক পাশে মাটিতে গাছের ছায়া পড়েছে। চারপাশে টিনের ঘর। মাথার ওপর উড়ছে বাবার কিনে দেওয়া বেলুন দুটি। এই উঠানেই এখন মুনতাহার দিন কাটে।

খেলনা আর খেলাধুলার এই জগতে বাবার স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। মুনতাহা ছিল বাবার খুব আদরের। মেয়ের ছোট ছোট আবদার রাখতেন আলিফ। মুনতাহার খুব পছন্দ চিকেন ফ্রাই। কোনো দিন ভালো করে পড়াশোনা করলে বাবাকে চিকেন ফ্রাই আনতে বলত। বাবা বাইরে থেকে নিয়ে আসতেন। মেয়ের আনন্দেই আনন্দ খুঁজতেন তিনি।

.সীমান্তে অপরাধ খুঁজতে গিয়েই সন্ত্রাসীদের নিশানা হন সাংবাদিক আলিফ.

সেই বাবা এখন নেই। তবে তাঁর কিনে দেওয়া খেলনা আর বেলুনগুলো রয়ে গেছে। মুনতাহার ছোট্ট পৃথিবীজুড়ে এখনো সেসব নিয়েই ব্যস্ততা।

মুনতাহার মা খাদিজা আক্তার। তিনি গারো সম্প্রদায়ের নারী। আলিফের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থেকে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তাঁর নাম রাখা হয় খাদিজা আক্তার। আগে তাঁর নাম ছিল আনন্দিতা সাংমা। বাড়িতে অতিথি আসায় পানি, চা ও বিস্কুট এনে দিলেন তিনি। মায়ের সঙ্গে আপ্যায়নের দায়িত্ব যেন নিয়েছে ছোট্ট মুনতাহাও। ছোট ছোট হাতে বিস্কুট নিয়ে বারবার এগিয়ে আসছিল। খাওয়ার জন্য দিচ্ছিল। তার এই ব্যস্ততা দেখে বোঝার উপায় নেই, মাত্র কয়েক দিন আগে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে এই পরিবারে।

স্বামীর কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন এই নারী। মুনতাহা তখন মায়ের পাশে বসে নির্বাক দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মা কথা বলছেন, সে শুনছে। একপর্যায়ে মা কেঁদে উঠলে মুনতাহা তাঁর আরও কাছে চলে এল। নিজের ছোট্ট গালটি মায়ের গালের সঙ্গে লাগিয়ে রইল। মায়ের কান্নার কারণ কতটা বুঝতে পারছে, তা জানা নেই। তবে মায়ের কাছ থেকে সরছিল না সে।

.

খেলনা আর খেলাধুলার এই জগতে বাবার স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। মুনতাহা ছিল বাবার খুব আদরের। মেয়ের ছোট ছোট আবদার রাখতেন আলিফ। মুনতাহার খুব পছন্দ চিকেন ফ্রাই। কোনো দিন ভালো করে পড়াশোনা করলে বাবাকে চিকেন ফ্রাই আনতে বলত। বাবা বাইরে থেকে নিয়ে আসতেন। মেয়ের আনন্দেই আনন্দ খুঁজতেন তিনি।

.

মুনতাহার ছোট ভাই আয়ান ফকির সাফওয়ানের বয়স মাত্র দেড় বছর। বাড়ির জীর্ণ ঘরের বিছানায় শুয়ে ছিল সে। বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার মতো বয়স তারও হয়নি। বাবা কীভাবে কোলে নিতেন, কতটা আদর করতেন, বড় হয়ে সেসব স্মৃতি হয়তো তার মনে থাকবে না।

দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে এখন দিশাহারা এই মা। স্বামীর মৃত্যুর আগে থেকেই সংসারে আর্থিক টানাটানি ছিল। সাংবাদিকতা করে আলিফ যা আয় করতেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর সংসারের কথা ভেবে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা।

খাদিজা নার্সিং পড়েছেন। ঢাকায় গিয়ে চাকরির চেষ্টা করার কথা ছিল তাঁর। আগামী নভেম্বর থেকে সেখানে থাকার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। তাঁদের ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে আলিফের শাশুড়ি ৪০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন।

.

মায়ের এসব দুশ্চিন্তার কিছুই বোঝে না চার বছরের মুনতাহা। সে এখনো খেলনা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ির সামনে উড়তে থাকা বেলুন দুটি দেখিয়ে জানাচ্ছে, বাবা কিনে দিয়েছেন। বাবা কোথায়, সে প্রশ্নের উত্তরও তার জানা, ‘স্কাই হয়ে গেছে।’

.

কিন্তু ঢাকায় যাওয়ার আগেই গুলিতে প্রাণ হারালেন আলিফ। বদলে গেল পরিবারটির সব পরিকল্পনা। যে টাকা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরুর কথা ছিল, ঋণের সেই ৪০ হাজার টাকাই এখন সংসার চালানোর ভরসা।

এই টাকা শেষ হলে কীভাবে সংসার চলবে, তা জানেন না খাদিজা। দুই শিশুর খাবার, চিকিৎসা, পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাবেন, সেই চিন্তাও তাঁকে তাড়া করছে। যে মানুষটির সঙ্গে সংসার গড়েছেন, সন্তানদের বড় করার স্বপ্ন দেখেছেন, তিনি আর নেই। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের দায়িত্ব এখন তাঁর একার কাঁধে।

মায়ের এসব দুশ্চিন্তার কিছুই বোঝে না চার বছরের মুনতাহা। সে এখনো খেলনা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ির সামনে উড়তে থাকা বেলুন দুটি দেখিয়ে জানাচ্ছে, বাবা কিনে দিয়েছেন। বাবা কোথায়, সে প্রশ্নের উত্তরও তার জানা, ‘স্কাই হয়ে গেছে।’

Facebook Comments Box


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd
error: Content is protected !!