
সার্বিয়ায় গত রোববার অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক পার্লামেন্ট নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত দল স্টুডেন্ট লিস্টের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। নেতৃত্বহীন ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ ও তাঁর দল ইতিমধ্যে পরাজয় মেনে নিয়েছে। এখন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কাকে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অন্তত চারজনের নাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছে। স্টুডেন্ট লিস্টের বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের তালিকায় থাকা কয়েকজন উল্লেখযোগ্য প্রার্থীকে নিয়ে আলোচনা করা যাক।
.
সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর দেজান সোসকিচ
৫৯ বছর বয়সী দেজান সোসকিচ হচ্ছেন অর্থনীতিবিদ এবং বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অনুষদের অধ্যাপক। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইনগত কিছু সংশোধনী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করছে—এই অভিযোগে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি বছরের পর বছর ধরে ভুচিচের সরকারের একজন সোচ্চার সমালোচক।
সোসকিচ ভুচিচের অধীনে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রায়ই সমালোচনা করেছেন। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতার সূচকে সার্বিয়ার অবস্থান ও নিম্নমুখী অবস্থানের দিকে নির্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, বলকান অঞ্চলের এই দেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বেশি বিস্তৃত এবং তা দেশি–বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ভুচিচ ও তাঁর সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টি দুর্নীতির এসব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে এসেছে।
সোসকিচ মনে করেন, সতর্ক ও বিচক্ষণ সরকারি অর্থব্যবস্থা মজুরি ও পেনশন স্থায়ীভাবে বৃদ্ধির পথে স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি করবে।
.
সরকারপন্থী গণমাধ্যমগুলো গভর্নর হিসেবে সোসকিচের সময়কালের সমালোচনা করেছে এবং তাঁর মেয়াদে দিনারের অবমূল্যায়ন ঘটানোর জন্য তাঁকে দায়ী করেছে। সোসকিচ এই অবমূল্যায়নকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা না বলে তৎকালীন বাধ্যবাধকতামূলক মুদ্রানীতি সংশোধনের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন।
তা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রচারের সময় রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সোসকিচ দিনারের বিনিময় হার সংশোধন বা দুর্বল করার প্রস্তাব করেছিলেন, যাতে বিদেশি মুদ্রায় অভ্যন্তরীণ পণ্যগুলো সস্তা হয়। তিনি বিকল্প একটি প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে স্থির ও শক্তিশালী বিনিময় হার বজায় রাখা।
.
* প্রধান প্রার্থী সর্দানোভিচ বলেছেন, নতুন সরকারকে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
* প্রচারের সময় রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করতে দিনারের মান কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন সোসকিচ।
* বিশ্লেষক ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো সাইচিচকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অন্যতম সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে।
.
কার্ডিওলজিস্ট ও অধ্যাপক ইলিজা সর্দানোভিচ
৫৫ বছর বয়সী ইলিজা সর্দানোভিচ প্র্যাকটিসিং কার্ডিওলজিস্ট। তিনি নোভি সাদ বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা অনুষদের অধ্যাপক এবং একজন সাইক্লিস্ট। সেপ্টেম্বরে ভোটের তালিকা চূড়ান্ত হলে তিনি ছাত্র আন্দোলনের প্রধান প্রার্থী হন।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভের সময় সর্দানোভিচের প্রকাশ্য রাজনীতিতে আগমন ঘটে। তিনি প্রায়ই বিভিন্ন সভা–সমাবেশে বক্তৃতা করতেন। চিকিৎসক হিসেবে তিনি উত্তর ভোজভোদিনা প্রদেশজুড়ে আন্দোলনের ‘সংবিধানের রক্ষক’ (গার্ডিয়ানস অব দ্য কনস্টিটিউশন) বাইসাইকেল ট্যুরে অংশ নিয়েছিলেন।
সর্দানোভিচ ‘নাগরিকদের সেবায় এবং সব রোগীর সমতার ভিত্তিতে’ একটি বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচার চালান। বেলগ্রেডভিত্তিক ফনেট নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সর্দানোভিচ বলেন, তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো ‘একটি সুন্দর সার্বিয়া গড়ে তোলা, অন্য কোনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
প্রচারের সময় ভুচিচের দেওয়া টেলিভিশন বিতর্কের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সর্দানোভিচ।
.
ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা গতকাল মঙ্গলবার এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, সর্দানোভিচের সঙ্গে টেলিফোনে তাঁর ‘ভালো’ আলাপ হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিলম্ব না করে একটি নতুন সরকার গঠন করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
সর্দানোভিচের কিছু নীতি আগের সরকারের নীতির থেকে খুব একটা আলাদা নয়। তিনি স্টুডেন্ট লিস্টের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জোর দিয়ে বলেন, ২০০৮ সালে সার্বিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করা কসোভো এখনো দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রচারের সময় তিনি আরও বলেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বর্তমানে কোনো অগ্রাধিকার নয়। নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক মনোযোগ থাকতে হবে দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার এবং জাতীয় ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ ওপর।
.
সাবেক বাস্কেটবল তারকা দেজান বোদিরোগা
৫৩ বছর বয়সী দেজান বোদিরোগা যুগোস্লাভ জাতীয় বাস্কেটবল দলের সাবেক অধিনায়ক এবং ইউরোলিগের বর্তমান সভাপতি, ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বক্তা।
দেজান গত রোববারের নির্বাচনকে ‘ছিনতাই হয়ে যাওয়া একটি দেশকে ফিরিয়ে আনার’ সংগ্রাম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রাজনীতিতে পা রাখাটা বাস্কেটবল-পাগল এই দেশের মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা দেজানের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। তিনি ১৯৯৮ ও ২০০২ সালে পরপর ফিবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের স্বর্ণপদক জয় করেন। ১৯৯৬ সালের আটলান্টা গেমসে তত্কালীন যুগোস্লাভ দলকে অলিম্পিক রৌপ্যপদক এনে দেওয়া দলেও ছিলেন। পরে ২০০৭ সালে খেলোয়াড় হিসেবে অবসর গ্রহণের পর ক্রীড়া প্রশাসনে যুক্ত হয়েছেন। ২০২২ সালে ইউরোলিগের সভাপতি হন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারের সময় দেজান শিক্ষার্থীদের সমাবেশে হাজির হয়েছিলেন এবং গ্রামীণ এলাকাগুলোতে উন্মুক্ত লোকনৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন। ভক্তরা ১৯৯০-এর দশকের একটি স্লোগান দিয়ে তাঁকে করতালি দিতেন—‘আমাদের নিজস্ব ঈশ্বর আছেন, তাঁর নাম দেজান বোদিরোগা।’
.
রসায়নের অধ্যাপক রাদোমির সাইচিচ
৬৪ বছর বয়সী রাদোমির সাইচিচ জৈব রসায়নের অধ্যাপক। তিনি সার্বিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টসের (এসএএনইউ) সদস্য। ভুচিচ পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ার পর স্টুডেন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে মঞ্চে উঠে রোববারের ফলাফলকে ‘নাগরিকদের বিজয়’ হিসেবে অভিবাদন জানিয়ে শিক্ষার্থীদের এই নির্বাচনী জয়ের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন সাইচিচ।
সাইচিচ মেডিসিনাল কেমিস্ট্রির বিশেষজ্ঞ। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় কেমোথেরাপি চিকিৎসা এবং অ্যান্টিভাইরাল থেরাপির সংশ্লেষণ, যার মধ্যে পাস্তুর ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যৌথভাবে কোভিডের ওপর একটি বিশেষ প্রকল্পও রয়েছে।
উত্তর সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরে ২০২৪ সালে একটি রেলওয়ে স্টেশনের ক্যানোপি ধসে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন সাইচিচ। ভুচিচের পদত্যাগ দাবি করে ২৪ জন শিক্ষাবিদের সঙ্গে একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করার পর তিনি সরকারপন্থী ট্যাবলয়েডগুলোর নিশানায় পরিণত হন।
.
২০২৬ সালের মে মাসে সাইচিচ সংস্কৃতিমন্ত্রী নিকোলা সেলাকোভিচের উপস্থিতির প্রতিবাদ জানাতে এসএএনইউ গ্যালারির একটি প্রদর্শনী থেকে বেরিয়ে যান।
প্রচারের সময় সাইচিচ জনতাকে বলেছিলেন, সার্বিয়া ‘ভেতর থেকে দখল করা হয়েছে’ এবং তিনি ছাত্র আন্দোলনের জন্য ‘নিজের জীবনও’ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত বলে জানান।
সাইচিচ কসোভোকে ‘সাময়িকভাবে দখলকৃত ভূখণ্ড’ হিসেবে মনে করেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক জোরদার করাকে সমর্থন করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো এই চিকিৎসককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে।
ঠিকানা: উত্তরা, ঢাকা ১২৩০