লাইটার পিস্তল’ দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব: জনমনে চরম আতঙ্ক
রাজধানীর উত্তরায় গ্যাং কালচারের নতুন এক উপদ্বব হিসেবে হাজির হয়েছে হুবহু আসল অস্ত্রের মতো দেখতে ‘গ্যাস পিস্তল লাইটার’। বিভিন্ন শপিং মল বা অনলাইনে সহজে পাওয়া যাওয়া এই লাইটারগুলো ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে ও ছিনতাই করছে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। দেখতে একদম সত্যি কারের পিস্তলের মতো হওয়ায় সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং উত্তরা জুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র আতঙ্ক।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের পার্ক, মাঠ ও তুলনামূলক নির্জন রাস্তায় সন্ধ্যার পর দলবদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়ায় এই কিশোররা। এদের কোমরে বা পকেটে গোঁজা থাকে চকচকে পিস্তল। প্রথম দেখায় যে কেউ এটিকে আসল আগ্নেয়াস্ত্র ভেবে ভুল করবেন। সামান্য কথা কাটাকাটি বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই গ্যাংয়ের সদস্যরা পকেট থেকে পিস্তল বের করে প্রতিপক্ষ বা সাধারণ পথচারীদের দিকে তাক করছে।
গত সপ্তাহে উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের গলিতে এই লাইটার পিস্তলের মুখে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন: গত বৃহস্পতিবার অফিস শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে ৯টা বেজে যায়। উত্তরা ৫ নম্বরের একটা গলিতে ঢোকার পর হঠাৎ দুটো মোটরসাইকেলে ৪ জন কিশোর আমার পথ রোধ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন তার কোমর থেকে একটা কালো রঙের পিস্তল বের করে সরাসরি আমার বুকে ঠেকায়। পিস্তলটার লোড করার সাউন্ড আর মেটালের বডি দেখে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম ওটা আসল আগ্নেয়াস্ত্র।
ওরা আমার সাথে থাকা ল্যাপটপ ব্যাগ, মোবাইল আর মানিব্যাগ কেড়ে নেয়। চিৎকার করলে গুলি করে দেবে বলে হুমকি দেয়। পরে পুলিশ যখন ওদের মধ্য থেকে একজনকে ধরে, তখন জানতে পারি ওটা আসলে পিস্তল আকৃতির একটা গ্যাস লাইটার ছিল। কিন্তু ওই অন্ধকারের মধ্যে বুক লক্ষ্য করে যখন কেউ ওটা ধরে, তখন বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে ওটা খেলনা নাকি আসল। আমি এখনও ওই ট্রমা থেকে বের হতে পারছি না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই উন্নত মানের গ্যাস পিস্তল লাইটারগুলোর ওজন, ধাতব তৈরি বডি এবং স্লাইড টানার আওয়াজ আসল পিস্তলের (যেমন গ্লক বা নাইন এমএম) মতোই। শুধু তাই নয়, এগুলোর ট্রিগার চাপলে কোনো গুলি বের হয় না, বরং নজেল দিয়ে তীব্র গ্যাস শিখা (আগুন) বের হয়। দূর থেকে বা রাতের অন্ধকারে সাধারণ মানুষের পক্ষে এটি যে লাইটার তা বোঝার কোনো উপায় থাকে না। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে অপরাধীরা।
এই বিষয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তারেক আহমেদ বেগ। তিনি বলেন:
অস্ত্র আসল নাকি নকল সেটি বড় বিষয় নয়; অপরাধ করার উদ্দেশ্যে হুবহু অস্ত্রের মতো দেখতে কোনো বস্তু ব্যবহার করে কাউকে ভয় দেখানো, জিম্মি করা বা আতঙ্ক সৃষ্টি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা উন্নত মানের যে গ্যাস পিস্তল লাইটারগুলো ব্যবহার করছে, তা দিয়ে তারা সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ও ভীতি তৈরি করছে। আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি।
তিনি আরও জানান, উত্তরার প্রতিটি সেক্টরে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এই ধরনের লাইটারসহ বেশ কয়েকজন কিশোরকে আমরা আইনের আওতায় এনেছি। একই সাথে, যেসব দোকান বা অনলাইন পেজে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ লাইটার বিক্রি করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। উত্তরাকে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারী মুক্ত করতে আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উত্তরার সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু কিশোরদের ধরা নয়, বরং এই ধরণের বিভ্রান্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ লাইটার যারা অবাধে বাজারে বিক্রি করছে বা আমদানি করছে, তাদের উৎসগুলো বন্ধ করা হোক। একই সাথে, সন্তানদের আচরণ ও তারা সাথে কী বহন করছে সে বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান ।
এলেন বিশ্বাস
ঠিকানা: উত্তরা, ঢাকা ১২৩০