
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত যৌন নিপীড়নসহ যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদী আজহারী। একই সঙ্গে অভিযোগের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা কিংবা একপাক্ষিক বয়ানের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা এবং প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মব তৈরি করার বিরোধিতা করেছেন তিনি।বাংলাদেশ কওমী ছাত্র ফোরাম আয়োজিত ‘শিক্ষাঙ্গনে যৌন নিপীড়ন, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা: ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু, সংকট, বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কওমী ছাত্র ফোরামের সভাপতি মাওলানা জামিল সিদ্দিকী।মাওলানা আশরাফ মাহদী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপরাধ সংঘটিত হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা একপাক্ষিক বয়ানের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা এবং প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মব তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে অভিযোগ ও জনমতের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলেও পরবর্তী তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। সুতরাং অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি, দায়িত্বশীলতার ঘাটতি এবং কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা দূর করাও জরুরি।কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের দায়িত্বশীলদের সাম্প্রতিক উদ্যোগের প্রশংসা করে মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বে অবহেলা এবং জবাবদিহির সংকট দূর করতে বোর্ডগুলোর উদ্যোগ ইতিবাচক। অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।মাদরাসা ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব থেকে পরিচালিত কোনো প্রচারণার ফাঁদে না পড়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু মহল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন ও প্রকৃত অপরাধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। এ ধরনের বয়ানের বিপরীতে আমাদের অবস্থান হতে হবে তথ্যনির্ভর।ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠী, ইন্টারসেক্স এবং ট্রান্সজেন্ডার—এই তিনটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। হিজড়া একটি স্বীকৃত জনগোষ্ঠী এবং ট্রান্সজেন্ডার মূলত ব্যক্তির জেন্ডার আইডেন্টিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পরিচয়। ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সার্জারি করানো আবশ্যক নয়। বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় সমাজে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।তিনি আরও বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের প্রশ্নে ট্রান্সজেন্ডার বিশ্বব্যাপী যে বিতর্ক তৈরি করেছে, তা বাংলাদেশেও বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। বিশেষত সমকামিতা ও জেন্ডার আইডেন্টিটিকে ঘিরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বয়ান, প্রচারণা এবং মতাদর্শিক উদ্যোগ সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।আলোচনায় কানাডার ২০১৭ সালের Bill C-16-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেইস স্টাডি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। কানাডার এই আইনে Canadian Human Rights Act-এ Gender Identity ও Gender Expression-কে বৈষম্য নিষিদ্ধের ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি Criminal Code-এর Hate Propaganda ও Sentencing-সংক্রান্ত বিধানেও সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন আনা হয়।এ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ও টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জর্ডান পিটারসেনের এক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রের আইনগত ক্ষমতার সীমারেখা কোথায়, এ প্রশ্নের মীমাংসা জরুরি। মানবাধিকারের পশ্চিমা ধারণা যেন নাগরিকের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ধারণের ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি না করে, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ঠিকানা: উত্তরা, ঢাকা ১২৩০