
দুজন মানুষের মধ্যে ঝগড়া, বিরোধ কিংবা মতবিরোধ। একপর্যায়ে একজন অন্যজনকে গালাগাল করতে শুরু করলেন। কিন্তু সেই গালিতে টেনে আনা হলো এমন একজন নারীকে, যিনি ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। তিনি হলেন প্রতিপক্ষের মা। কখনো বোন, কখনো পরিবারের অন্য কোনো নারী সদস্যও হয়ে ওঠেন গালির লক্ষ্যবস্তু।ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্ক-বিতর্ক—অন্যকে অপমান বা মানসিকভাবে আঘাত করতে মা-বোনকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালির ব্যবহার প্রায়ই দেখা যায়। এ ধরনের গালি শুধু পুরুষেরাই দেন না, নারীদের মুখেও শোনা যায়।সম্প্রতি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পরীমণিকে ঘিরে একটি ঘটনা আবারও বিষয়টি আলোচনায় এনেছে। গত ৫ নভেম্বর একটি মামলায় আত্মসমর্পণ করতে আদালতে গিয়ে এক সাংবাদিকের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান তিনি। এ সময় ওই সাংবাদিকের মাকে জড়িয়ে প্রকাশ্যে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং তাকে হত্যার হুমকিও দেন।ঘটনাটি নতুন করে সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিরোধ যখন দুজন মানুষের মধ্যে, তখন অপমানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন তাদের পরিবারের নারীরা কেন? এটি কি নিছক ভাষার অভ্যাস, নাকি এর পেছনে রয়েছে নারীকে ঘিরে সমাজের দীর্ঘদিনের কিছু ধারণা?ভাষা ও সমাজে নারীর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মা-বোনকে নিয়ে প্রচলিত গালিগুলো কেবল অশালীন শব্দের ব্যবহার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যৌনতা, ক্ষমতা এবং পরিবারের সম্মানের সঙ্গে নারীর মর্যাদাকে যুক্ত করে দেখার প্রবণতা।দেশে দেশে গালিতে নারীর উপস্থিতিকাউকে অপমান করতে তার পরিবারের নারী সদস্যদের টেনে আনার প্রবণতা শুধু বাংলা ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতেও এ ধরনের গালির প্রচলন রয়েছে।২০২৪ সালে বিহেভিয়ার রিসার্চ মেথডস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বিভিন্ন ভাষায় প্রচলিত গালি ও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ শব্দ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, যৌনতা, যৌনাঙ্গ ও যৌন পরিচয়কে কেন্দ্র করে তৈরি শব্দের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।বিশ্বের ১৭টি দেশের ১৩টি ভাষার ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের গালি ও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ শব্দ সংগ্রহ করেন গবেষকেরা।গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন ভাষায় বহুল ব্যবহৃত অপমানসূচক শব্দের মধ্যে নারীর যৌনাঙ্গ নির্দেশক শব্দ, নারীর যৌন আচরণকে হেয় করার শব্দ এবং যৌনক্রিয়াসংক্রান্ত গালি রয়েছে। কয়েকটি ভাষায় কারও মাকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি দেওয়া এবং জন্মপরিচয়কে অপমানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণও পাওয়া গেছে।পুরুষের যৌনাঙ্গকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন ভাষায় গালি রয়েছে। তবে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম।অর্থাৎ, যৌনতা ও নারীকে কেন্দ্র করে অপমানসূচক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা কোনো একটি সমাজ বা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।যে মা শ্রদ্ধার প্রতীক, গালিতে তিনিই কেন?বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মাকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার আসনে রাখা হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতিতেও এর ব্যতিক্রম নেই।২০১৫ সালে জার্নাল অব এথনোলজি অ্যান্ড ফোকলোরিস্টিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলা লোকসংস্কৃতিতে ‘মা’ শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।গবেষকেরা দেখিয়েছেন, বাংলা সংস্কৃতিতে ‘মা’ শব্দটি শুধু জন্মদাত্রীকে বোঝায় না। পরিবারের অন্য নারী সদস্যদেরও মা বলে সম্বোধন করা হয়। আবার বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসে এমন দেবীদেরও ‘মা’ বলা হয়, যারা অশুভ শক্তি, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, সাপ ও রোগব্যাধি থেকে মানুষকে রক্ষা করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এমনকি ১৯৪৭ সালের আগে বাংলা ভূখণ্ডকেও ‘মা’ হিসেবে অভিহিত করা হতো বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ রয়েছে।অন্য ধর্মেও মায়ের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখা যায়। ইসলাম ধর্মে মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনে মায়ের কষ্টের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, খ্রিষ্টধর্মে যিশুখ্রিষ্টের মা মেরিকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। তিনি মাতৃত্ব ও পবিত্রতার প্রতীক।অর্থাৎ, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মাতৃত্বকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে সমাজে মাকে এত সম্মান করা হয়, সেই সমাজেই কাউকে অপমান করতে তার মাকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি দেওয়া হয় কেন?ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, এর পেছনে বড় একটি কারণ হলো সমাজে মায়ের উচ্চ মর্যাদা।তিনি বলেন, বিভিন্ন সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মাকে সম্মানের জায়গায় রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই মাকেই যখন যৌনতা ও সতীত্বের ধারণা দিয়ে বিচার করা হয়, তখন তাকে অসম্মান করার মাধ্যমে তাঁর সন্তানকেও হেয় করার সুযোগ তৈরি হয়।জোবাইদা নাসরীনের মতে, মাকে সম্মানের উচ্চ অবস্থান থেকে নামিয়ে এনে সন্তানকে অপমান করার চেষ্টা করা হয়। কারণ, এ ধরনের আক্রমণ একজন মানুষকে গভীরভাবে আঘাত করতে পারে।তিনি বলেন, সমাজ দীর্ঘদিন ধরে এই বৈপরীত্য লালন করে আসছে। অথচ কোনো ধর্মেই মাকে নিয়ে গালাগালিকে সহিংসতা বা অন্যকে আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয় না।গালির সঙ্গে নারীর যৌনতার সম্পর্ক কী?মা-বোনকে নিয়ে প্রচলিত অনেক গালি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে যৌনতাকে অপমানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কখনো নারীর যৌন আচরণকে হেয় করা হয়, কখনো যৌন সহিংসতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। কিন্তু এসব গালির লক্ষ্য প্রায়ই সেই নারী নন, বরং তার পরিবারের অন্য কোনো সদস্য।অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীনের মতে, ঐতিহাসিকভাবে নারীর যৌনতাকে কেন্দ্র করে তাকে ভালো বা খারাপ হিসেবে বিচার করার প্রবণতা রয়েছে। ভিক্টোরীয় যুগের নৈতিকতার ধারণা এবং তারও আগের সামাজিক মূল্যবোধে এই প্রবণতার উপস্থিতি দেখা যায়।তিনি বলেন, নারীর সতীত্ব ও যৌন আচরণকে তার নৈতিক চরিত্রের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণেই মায়ের যৌনতাকে আক্রমণ করাকে অত্যন্ত অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়।তবে বাংলা ভাষায় এ ধরনের গালির প্রচলন ঠিক কখন শুরু হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে জানান তিনি। তার মতে, বিভিন্ন ভাষায় নারীর শরীর ও যৌনতাকে কেন্দ্র করে অপমানসূচক শব্দ রয়েছে। এসব শব্দ শুধু কাউকে হেয় করতেই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিপীড়নের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হকও মনে করেন, মা-বোনকে নিয়ে গালি দেওয়ার পেছনে অন্যকে গভীরভাবে আঘাত করার উদ্দেশ্য কাজ করে।তিনি বলেন, এ ধরনের গালি মানুষের মনে তীব্র আঘাত করে বলেই তা ব্যবহার করা হয়। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে যে ভাষার প্রচলন রয়েছে, মানুষ অন্যকে আঘাত করতে সেই ভাষাই ব্যবহার করে। তার মতে, সমাজে নারীদের নিয়ে কটূক্তি ও বিদ্রূপকে অনেক সময় স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়।অভ্যাস, নাকি নারীবিদ্বেষ?অনেকেই অভ্যাসবশত মা-বোনকে নিয়ে গালি দেন। এসব শব্দের আক্ষরিক অর্থ নিয়েও হয়তো তারা ভাবেন না। কিন্তু অভ্যাসের বশে ব্যবহার করলেও এ ধরনের গালিকে কি নারীবিদ্বেষী আচরণ বলা যায়?অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, মানুষ অভ্যাসবশত এসব গালি ব্যবহার করলেও এর মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি অসম্মান ও নারীবিদ্বেষী মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটে।তিনি বলেন, সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কিছু আচরণ মানুষ অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু সেই অভ্যাসের মধ্য দিয়েই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বারবার প্রকাশ পায়।তার মতে, মা-বোনকে নিয়ে গালাগালি লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার রাজনীতির একটি হাতিয়ার। নারীকে হেয় করা কিংবা দমিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের ভাষা ব্যবহৃত হতে পারে।অধ্যাপক তানিয়া হকও মনে করেন, সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অসম্মানজনক ভাষার চর্চা চলতে থাকায় মানুষ অনেক সময় এর প্রভাব নিয়ে ভাবেন না। অন্যকে সম্মান করার চর্চা যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত না হলে প্রচলিত অপমানসূচক ভাষাই মানুষ বারবার ব্যবহার করেন।নারীরাও কেন একই গালি দেন?মা-বোনকে নিয়ে গালাগালির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের ভাষা শুধু পুরুষেরাই ব্যবহার করেন না। নারীদের মধ্যেও এর প্রচলন রয়েছে। কিন্তু একজন নারীও কেন অন্য একজনের মাকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি দেন?বিশ্লেষকদের মতে, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা শুধু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নারী-পুরুষ উভয়েই একই সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠেন। ফলে সমাজে প্রচলিত ভাষা ও আচরণ উভয়েই শিখে থাকেন।অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীনের মতে, একজন নারী যখন অন্যের মাকে নিয়ে গালি দেন, তখন তিনিও সমাজ থেকে শেখা সেই ভাষাই ব্যবহার করেন।এর পেছনে আরেকটি মনোভাবও কাজ করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘পুরুষেরা যদি এ ধরনের গালি দিতে পারেন, তাহলে নারীরা কেন পারবেন না’—এমন ধারণা থেকেও কেউ একই ভাষা ব্যবহার করতে পারেন।তবে এতে গালির মধ্যে থাকা পুরুষতান্ত্রিক ধারণার কোনো পরিবর্তন হয় না। বরং একই ধরনের ভাষার চর্চা অব্যাহত থাকে।অধ্যাপক তানিয়া হকও বলেন, নারী ও পুরুষ উভয়েই সমাজে প্রচলিত একই অপমানসূচক শব্দ ব্যবহার করছেন। কিন্তু সেই ভাষার মাধ্যমে নারীদেরই যে হেয় করা হচ্ছে, তা অনেক সময় খেয়াল করা হয় না।অর্থাৎ, সমাজে নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণ যখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন নারীরাও অজান্তে সেই একই ভাষার চর্চায় অংশ নেন।এএম
ঠিকানা: উত্তরা, ঢাকা ১২৩০