
গরুর দুধ একসময় ‘আদর্শ খাবার’ বা ‘সম্পূর্ণ খাবার’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কারণ, এতে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি১২, রিবোফ্লাভিন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। শিশুদের বৃদ্ধি, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে দীর্ঘদিন ধরে দুধ পানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে দুধকে সবার জন্য সম্পূর্ণ আদর্শ বা সম্পূর্ণ ক্ষতিকর—কোনোটিই বলা যায় না। এটি নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
কারও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি থাকতে পারে। আবার কারও জন্য দুধ হতে পারে পুষ্টির ভালো উৎস। গবেষণায় দুধ পানের সঙ্গে হাড় ভাঙার ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সুইডেনের একটি বড় গবেষণায় এমন যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। তবে এটি কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক প্রমাণ করে না। বিষয়টি বুঝতে দুধের উপকারিতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি—দুই দিকই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দুধে উচ্চমানের প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকায় একে দীর্ঘদিন ‘সম্পূর্ণ খাবার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের বৃদ্ধি ও হাড়ের গঠনে দুধের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে আধুনিক গবেষণায় দুধের উপকারিতা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা শুরু হয়েছে। বড় আকারের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের প্রভাব সব ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কিছু ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া যায়, কিছু ক্ষেত্রে ফলাফল নিরপেক্ষ, আবার কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকিও উঠে এসেছে।
হার্ভার্ডের পুষ্টিবিদ ওয়াল্টার উইলেট ও ডেভিড লুডউইগ তাঁদের গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন তিন কাপ দুধ পানের প্রচলিত সুপারিশের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, সুস্থ থাকতে সবার জন্য এতটা দুধ পান অপরিহার্য নয়।
বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের কিছু সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে। • হাড় ও ক্যালসিয়াম: দুধে থাকা ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন হাড়ের গঠন ও স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। তবে বেশি দুধ খেলেই হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমবে, এমন শক্ত প্রমাণ নেই। • কোলোরেক্টাল ক্যানসার: দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে দুধে থাকা ক্যালসিয়াম এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। • হৃদরোগ ও স্ট্রোক: গবেষণায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দই ও পনিরের মতো গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবারের ক্ষেত্রে কিছু সম্ভাব্য উপকারও দেখা গেছে। • টাইপ ২ ডায়াবেটিস: কিছু গবেষণায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, বিশেষ করে দইয়ের সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। • ওজন নিয়ন্ত্রণ: দুধের প্রোটিন পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। তবে শুধু দুধ পান করলেই ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন নয়।
দুধ সবার শরীরে একইভাবে সহনীয় নয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি শারীরিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। আবার কিছু রোগের সঙ্গে দুধ পানের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে। • ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স: দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার অনেক মানুষের শরীরে ল্যাকটেজ এনজাইমের কার্যকারিতা বয়স বাড়ার সঙ্গে কমে যায়। ফলে দুধের ল্যাকটোজ বা প্রাকৃতিক শর্করা হজমে সমস্যা হয়। পেটে গ্যাস, ফাঁপা ভাব, ব্যথা ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। • দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি: বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে গরুর দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি দেখা যায়। এটি ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থেকে আলাদা একটি সমস্যা।
• প্রোস্টেট ক্যানসার: কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় বেশি পরিমাণে দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে গবেষণার ফল এখনো চূড়ান্ত নয়। • ব্রণ: কিছু গবেষণায় দুধ, বিশেষ করে কম চর্বিযুক্ত বা স্কিমড দুধ পানের সঙ্গে ব্রণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং সরাসরি কারণ-ফলাফলও নিশ্চিত হয়নি। • হরমোন ও আইজিএফ-১: দুধে প্রাকৃতিক হরমোন ও ইনসুলিনের মতো গ্রোথ ফ্যাক্টর বা আইজিএফ-১ থাকে। দুধ পান করলে শরীরে আইজিএফ-১-এর মাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। ক্যানসারের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা থাকলেও দুধ পান সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। • স্যাচুরেটেড ফ্যাট: পূর্ণচর্বিযুক্ত দুধে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে। তাই যাঁদের হৃদ্রোগ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের দুধের ধরন ও পরিমাণ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
দুধ পানের পরিমাণ নির্ধারণে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখা যেতে পারে। • যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি নেই, তাঁরা সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে দুধ পান করতে পারেন। • শিশু ও কিশোরদের জন্য দুধ ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস হতে পারে। তবে বয়স অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি।
• প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দুধ অপরিহার্য নয়। ক্যালসিয়াম অন্যান্য খাবার থেকেও পাওয়া যায়। যেমন পাতাজাতীয় শাক, তিল, বাদাম, টফু এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ দুধ। • ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা হলে ল্যাকটোজমুক্ত দুধ, দই ও কিছু ধরনের পনির বিকল্প হতে পারে। সয়া, বাদাম ও ওট থেকে তৈরি উদ্ভিজ্জ পানীয়ও ব্যবহার করা যায়। তবে এগুলোর পুষ্টিমান এক নয়। তাই ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ পণ্য বেছে নেওয়া ভালো। • অর্গানিক বা এ২ দুধ কিছু মানুষের কাছে তুলনামূলক সহনীয় মনে হতে পারে। তবে সাধারণ দুধের তুলনায় এগুলোর বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত সুবিধা রয়েছে, এমন শক্তিশালী প্রমাণ এখনো নেই।
২০১৪ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী বিএমজেতে সুইডিশ গবেষক কার্ল মিকায়েলসন ও তাঁর দলের একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। এতে দুধ পানের সঙ্গে মৃত্যুহার ও হাড় ভাঙার ঝুঁকির সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষণায় ৬১ হাজারের বেশি নারী ও ৪৫ হাজারের বেশি পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়: • যেসব নারী প্রতিদিন তিন গ্লাস বা তার বেশি দুধ পান করতেন, তাঁদের মৃত্যুহার দিনে এক গ্লাসের কম দুধ পান করা নারীদের তুলনায় বেশি ছিল। তাঁদের হাড় ভাঙার, বিশেষ করে হিপ ফ্র্যাকচারের ঝুঁকিও বেশি দেখা যায়। • পুরুষদের ক্ষেত্রেও বেশি দুধ পানের সঙ্গে মৃত্যুহার বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে হাড় ভাঙার ঝুঁকির সঙ্গে তেমন শক্ত সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। • দুধের বিপরীতে দই ও অন্যান্য গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে মৃত্যুহার ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমার সম্পর্ক দেখা গিয়েছিল। তবে গবেষকেরা নিজেরাই সতর্ক করে বলেছেন, এটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। তাই দুধ পানই মৃত্যুহার বা হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়িয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অন্য খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত বিষয়ও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সুইডিশ গবেষকেরা দুধ পানের সঙ্গে পাওয়া এই যোগসূত্রের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে ডি-গ্যালাকটোজের কথা উল্লেখ করেছেন।
দুধে থাকা ল্যাকটোজ বা দুধের শর্করা হজমের সময় ভেঙে গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজ তৈরি হয়। এক গ্লাস দুধে থাকা ল্যাকটোজ থেকে প্রায় ৫ গ্রাম গ্যালাকটোজ পাওয়া যেতে পারে।
প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন বেশি মাত্রায় ডি-গ্যালাকটোজ প্রয়োগ করলে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বাড়তে পারে। এসব পরিবর্তন প্রাণীর শরীরে বার্ধক্যজনিত কিছু লক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষকদের ধারণা, দুধ থেকে পাওয়া গ্যালাকটোজের সঙ্গে মানুষের শরীরেও এ ধরনের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। মানুষের শরীরে দুধের গ্যালাকটোজ একইভাবে বার্ধক্য, হাড় ক্ষয় বা মৃত্যুহার বাড়ায়—এমন প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অন্যদিকে, দই ও পনিরের মতো গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবারে ল্যাকটোজের পরিমাণ সাধারণত কম থাকে। গাঁজন প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটোজের একটি অংশ ভেঙে ফেলে। এ কারণে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকা অনেক মানুষ দুধের তুলনায় দই বা কিছু ধরনের পনির সহজে হজম করতে পারেন।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের প্রধান শর্করা হলো ল্যাকটোজ। এটি হজম করার জন্য ল্যাকটেজ নামের একটি এনজাইম প্রয়োজন। ক্ষুদ্রান্ত্রের কোষে তৈরি এই এনজাইম ল্যাকটোজকে ভেঙে গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজে পরিণত করে। পরে শরীর এই সরল শর্করা শোষণ করতে পারে।
কিন্তু যাঁদের শরীরে পর্যাপ্ত ল্যাকটেজ তৈরি হয় না, তাঁদের ক্ষেত্রে ল্যাকটোজ পুরোপুরি হজম হয় না। অপাচ্য ল্যাকটোজ বৃহদান্ত্রে পৌঁছালে সেখানকার ব্যাকটেরিয়া তা গাঁজন করে। এর ফলে গ্যাস তৈরি হয় এবং পেট ফাঁপা, ব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের প্রধান কারণ জিনগত। অনেক মানুষের ক্ষেত্রে শৈশবের পর স্বাভাবিকভাবেই ল্যাকটেজ এনজাইমের উৎপাদন কমে যায়। এটি নিজে কোনো রোগ নয়, বরং মানুষের স্বাভাবিক জৈবিক বৈশিষ্ট্যের একটি ধরন। তবে অন্ত্রের কিছু রোগ বা সংক্রমণের কারণেও সাময়িকভাবে ল্যাকটেজের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলেই সব ধরনের দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিতে হবে, এমন নয়। ব্যক্তিভেদে সহনীয় পরিমাণ আলাদা হতে পারে। ল্যাকটোজমুক্ত দুধ, দই ও কিছু ধরনের পনির খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ঠিকানা: উত্তরা, ঢাকা ১২৩০