
জনপ্রিয় ট্রাভেল ভ্লগার রুহি চেনাত। কিছুদিন আগে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম দ্বীপ ত্রিস্টান দ্য কুনার উদ্দেশ্যে এক কঠিন সমুদ্রযাত্রায় বের হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই অভিযানের কথা জানাতে গিয়ে তিনি লেখেন, এই জাহাজ তাদের বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গম দ্বীপে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই যাত্রাটি ৭৫ দিনের কঠিন কষ্ট ও জীবনের ঝুঁকিতে ভরা এক অভিজ্ঞতায় রূপ নিতে চলেছে।
তাঁর এই ভ্রমণের সবচেয়ে ভয়ের বিষয় ছিল, যাত্রীদের মধ্যে কেউ একজন হান্টাভাইরাস নামের একটি মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাসে আক্রান্ত। জাহাজে ওঠার পর মানুষ অসুস্থ হবে, মারা যাবে এবং পুরো বিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। এমন একটি চরম অনিশ্চিত ও ভয়ের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
শুধু এই আতঙ্কই নয়, শারীরিক কষ্টও ছিল অনেক। বিমানযাত্রার ক্লান্তি, ভাইরাসের ভয়, লম্বা সময়ের এই অনিশ্চিত কোয়ারেন্টাইন, নিজ দেশ তুরস্কের মিডিয়ার নানা অপ্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। সব মিলিয়ে রুহি চেনাত জানান, এই অভিযান থেকে ফিরে আসার পর তাঁর চুল পাকাতে শুরু করেছে এবং এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মানসিক চাপের ভ্রমণ।
.
প্রশ্ন হলো, রুহি চেনাতের মতো এমন চরম মানসিক চাপ বা ভয়ের মুখে পড়লে কি মানুষের মাথার চুল আসলেই পেকে যেতে পারে? আর পাকা চুল কি আবার আগের মতো কালো করা যায়?
.পাকা চুল আবার কালো হতে পারে, বলছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা.
মানসিক চাপ কীভাবে চুল পেকে যাওয়ার কারণ হয়?
অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে মানুষের চুল অকালেই পেকে যেতে পারে। এটি শরীরের ভেতরে নানা প্রক্রিয়ায় ঘটে। তবে এই চাপ সরাসরি চুলের ওপর প্রভাব ফেলে না। বরং চুলের গোড়ায় থাকা ফলিকল বা কোষগুলোর ওপর প্রভাব ফেলে। ত্বকের নিচে থাকা ছোট এই অংশটিই প্রতিটি চুলকে ধরে রাখে। অনেক সময় কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ার পরেও এই ফলিকলগুলো আবার সচল হতে পারে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ ও শরীরে স্ট্রেস হরমোন তৈরি হওয়ার কারণে চুলের গোড়ার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া বদলে যেতে পারে। ফলে কিছু চুল সাদা বা ধূসর হয়ে যায়।
আমাদের শরীরের সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র বা চাপের সময় কাজ করা স্নায়ু থেকেও চুলের গোড়ায় সংকেত পৌঁছাতে পারে। ইঁদুরের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র মানসিক চাপের কারণে এই স্নায়ুগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং নরএপিনেফ্রিন নামের একটি হরমোন ছড়ায়। এই হরমোনটি চুলের গোড়ায় মেলানিন তৈরি কমিয়ে দেয়। মেলানিন হলো সেই উপাদান, যা চুলকে স্বাভাবিক কালো রং দেয়। মেলানিন কমে গেলেই চুল সাদা বা ধূসর হয়ে যায়। তবে এই গবেষণায় দেখা গেছে, কর্টিকোস্টেরন নামের হরমোনটি চুল পাকাতে সরাসরি দায়ী নয়।
তুরস্কের তরুণদের ওপর করা অন্য একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের বংশগত বা জিনগত কারণ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কারণে চুল পেকে যেতে পারে। শরীরে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল ও সুরক্ষাকারী অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের ভারসাম্য নষ্ট হলে এই সমস্যা তৈরি হয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অতিরিক্ত মদপান এবং দীর্ঘস্থায়ী নানা রোগের কারণে এমনটি হতে পারে। হয়তো এই কারণেই রুহি চেনাতের চুল পেকে গিয়েছিল।
.যে যুগে লম্বা চুল রাখা অপরাধ ছিল.
সাধারণত চুল যেভাবে পেকে যায়
বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত ৩০ বা ৪০ বছর বয়সে বেশির ভাগ মানুষের চুল পাকতে শুরু করে। এটি মূলত নির্ভর করে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পারিবারিক ইতিহাসের ওপর। আমাদের জিনের নির্দেশেই চুলের গোড়ায় মেলানিন তৈরি হয়, যা চুলকে কালো রাখে। পরিবারে অল্প বয়সে চুল পেকে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে অন্যদেরও এমন ঝুঁকি থাকে। আর মানসিক চাপ এই প্রক্রিয়াকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
মাথার প্রতিটি চুল কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপের মধ্য দিয়ে বাড়ে। বৃদ্ধি পাওয়া, বিশ্রামে যাওয়া এবং পুরোনো চুল ঝরে নতুন চুল গজানো। এভাবে নতুন চুল গজানোর চক্রটি ৭ থেকে ১৫ বার চলার পর চুলের গোড়ায় মেলানিন তৈরি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখনই চুল ধূসর বা সাদা হয়ে যায়। যেহেতু মাথার সব চুল একসময়ে এই চক্র পার করে না, তাই প্রথমে কিছু পাকা চুল দেখা যায়। যাকে মিশ্র রঙের চুল বলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব চুলই সাদা হয়ে যায়।
চুল পাকা কি স্থায়ী?
মানসিক চাপের কারণে চুল পাকলে তা আবার আগের রঙে ফিরবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, চাপ কমে গেলে চুলের গোড়ায় আবার মেলানিন তৈরি হতে পারে এবং চুল স্বাভাবিক রঙে ফিরতে পারে। তবে ইঁদুরের ওপর চালানো অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চাপ কমার পরও লোমগুলো আর আগের রঙে ফিরে আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ
পাকা চুল জোর করে কালো করার কোনো নিশ্চিত চিকিৎসা নেই। তবে কয়েকটা বিষয় মেনে চললে উপকার পাওয়া যায়। প্রথমে মানসিক চাপ কমানো। এরপর খাবারে পর্যাপ্ত ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রাখা। সঙ্গে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না, জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করানো যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত মানসিক চাপে এক রাতে মাথার চুল পেকে যাওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়। তবে সময়ের সঙ্গে চুল পাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
.আনাসের চুল
ঠিকানা: উত্তরা, ঢাকা ১২৩০